চট্টগ্রাম, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২০ , ২৮শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ভারত থেকে আসা রোহিঙ্গা পরিবার কোয়ারেন্টাইনে

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা প্রতিরোধে সতর্কতা, লক ডাউনের দাবি

আমান উল্লাহ কবির, টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি প্রকাশ: ২৩ মার্চ, ২০২০ ১১:৩২ : অপরাহ্ণ

কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফে ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবিরে করোনা প্রতিরোধে সতর্কতা গ্রহণ করা হলেও প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল। অনেক রোহিঙ্গা এ বিষয়ে পুরোপুরি অবগত নই। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা গাদাগাদি করে অবস্থান করায় এবং এখনো অবাধে চলাফেরা করায় মারাত্নক ঝুঁকিতে রয়েছে দেশীয় স্থানীয়রা। এদিকে ভারত থেকে আসা ৪ সদস্যের এক রোহিঙ্গা পরিবারকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়েছে ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয়দের দাবি কিছুদিনের জন্য হলেও ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের যাতায়ত বন্ধ রেখে লক ডাউন করা সেই সাথে বাইরে অবস্থানরত দেশি বিদেশী এনজিও কর্মীদের ক্যাম্পে অবাধ যাতায়ত বন্ধ রাখাও জরুরী। তবে প্রশাসনের পক্ষে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়েছে বলে দাবী করেছেন।

সোমবার দুপুরে সরেজমিন ও সংশ্লিষ্টদের সাথে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জানা গেছে, ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাস সম্মন্ধে জেনেছে রোহিঙ্গারা। তবে এজন্য কি কি সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে এ বিষয়ে তারা পুরোপুরি অবগত নই। এরোগ প্রতিরোধে নামাজ-দোয়া পড়ে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা রাখছেন তারা। দেশীয় লোকজন ও কতিপয় এনজিও কর্মীদের মুখে মাস্ক দেখা গেলেও কোন রোহিঙ্গাদের মুখে কোন মাস্ক দেখা যায়নি। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝিরা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ক্যাম্প ইনচার্জ ও এনজিও প্রতিনিধিদের সাথে সভা করা হয়েছে। এসভায় করোনা ভাইরাস বিষয়ে ইংরেজী, বার্মিজ ভাষায় সতর্কতামুলক লিপলেট বিতরণ, প্রতিটি ব্লকের রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে সচেতনতা বিষয়ক বার্তা পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা তাদের স্বাভাবিক চলাফেরা, আড্ডা এখনো আগের মতো চালিয়ে যাচ্ছে। যখন খুশি রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বের হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিক হিসেবে কাজে যোগ দিচ্ছে শতশত রোহিঙ্গা। এ ছাড়া ক্যাম্পে কর্মরত দেশি-বিদেশি সংস্থার লোকজনও অনায়াসে আগমন প্রস্থান করছে ক্যাম্পে।

এছাড়া সাধারন রোহিঙ্গাদের সচেতন করতে মাইকিং করতে দেখা গেছে। তবে এ মাইকিং শুধুমাত্র প্রধান ও অভ্যন্তরিণ সড়কে করা হয়েছে। অনেক সাধারন রোহিঙ্গা এখনো পরিপূর্ণ সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করছেনা। তবে অনেকে ভয়ভীতির মধ্যে রয়েছেন।

করোনা ভাইরাস চিহ্নিত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহন, মাস্ক ও জীবানু নাশক হ্যান্ড ওয়াশ সরবরাহের দাবী জানিয়েছেন।

নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প (নং-২৬) এর হেড মাঝি বজলুর রহমান জানান, সোমবার সকালের দিকে ক্যাম্প ইনচার্জ লিপলেট দিয়েছেন এবং করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে ঘরে ঘরে সচেতনতা সৃষ্টির তাগাদা দেন।

ডিপুটি চেয়ারম্যান রশিদা বেগম জানান, করোনা ভাইরাসের নাম শুনার পর থেকে বেশ আতঙ্কে রয়েছি। করোনা প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

হোয়াইক্যং মডেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারি জানান, কয়েক লাখ রোহিঙ্গাদের কারণে আমরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছি। কারণ রোহিঙ্গারা এখনো অবাধ চলাফেরা অব্যাহত রেখেছে। সরকার এখনো ক্যাম্পকে লক ডাউন করেনি। খোদা না করুক তাদের মধ্যে কেউ যদি করোনায় আক্রান্ত হয় তাহলে তাদের পাশাপাশি আমরা স্থানীয়রাও বেশ আক্রান্ত হতে পারি। তাই দ্রুত রোহিঙ্গা ক্যাম্প লক ডাউন করার দাবী জানাচ্ছি।

এসিএফের বিভাগী পরিচালক মোহাম্মদ মাহাদী জানান, ইতিমধ্যে বিভিন্ন ক্যাম্পের পুষ্টি কেন্দ্রে থার্মো প্লাস দিয়ে করোনা লক্ষনের সনাক্ত করা হচ্ছে। যাদের জ্বর অস্বাভাবিক তাদেরকে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে প্রেরনের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে ভবিষ্যতে কেউ করোনা আক্রান্ত হলে তাদেরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ক্যাম্প ইনচার্জ আবদুল হান্নান জানান, সরকারের নির্দেশনা মতো করোনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গারা অনেক সচেতন হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সাইফ বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে চোরাই পথে মিয়ানমারে আসা যাওয়া করতে না পারে সে জন্য বিজিবি ও কোস্টগার্ড কে টহল জোরদার করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওদের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। শুধুমাত্র স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করে যাবে। আপাতত বাকি কাজগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। বড় ধরনের কোন ঘটনা ঘটলে বিকল্প হিসেবে কেরুনতলী প্রত্যাবাসন কেন্দ্র ব্যবহার করা হবে।

শরনার্থী ত্রান ও প্রত্যাবাসন কমিশন সুত্রে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৪৭টি করোনাভাইরাস আইসোলেশন বেড রেডি করা আছে। প্রয়োজন হলে আরো ১৫০ শয্যার বেড প্রাথমিকভাবে প্রাক প্রস্তুতি করে রাখা হয়েছে। তবে ক্যাম্পে এখনো পর্যন্ত কোনো করোনাভাইরাস জীবাণু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি। এরপরও রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র গুলো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে কাজ করছে।

এদিকে ভারত থেকে আসা ৪ সদস্যের এক রোহিঙ্গা পরিবারকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়েছে ক্যাম্প ইনচার্জ। পরিবারটি ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে খুলনা হয়ে সড়ক পথে সোমবার ভোর পাঁচটায় লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প (নং ২৪) ই ব্লকে শ্বাশুর মোস্তাক আহম্মদের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিল।

বিষয়টি জানাজানি হলে দুপুর ১২ টার দিকে পার্শ্ববর্তী রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ইনচার্জ আব্দুল হান্নানকে অবগত করলে তাদের কে হেফাজতে নিয়ে আসা হয়। তারা হলেন মোঃ ছাদেক (২৫), স্ত্রী হোসনে আরা (২৩), ছেলে পারভেজ ( ৩) ও মেয়ে সাজেদা (১০ মাস)।

সুত্রে জানা যায়, রোববার রাতে ভারতের হায়দারাবাদ হতে অবৈধভাবে বাংলাদেশের খুলনা সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করে। সেখান থেকে সড়ক পথে ২৩ মার্চ (সোমবার) ভোরের দিকে লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প (নং ২৪) ই ব্লকের বসবাসকারী শ্বাশুর মোস্তাক আহম্মদের বাড়ীতে গোপনে আশ্রয় নেয়। একপর্যায়ে বিষয়টি আশপাশে চাওর হলে ব্লক মাঝি বিষয়টি ক্যাম্প ইনচার্জকে অবহিত করেন। তিনি তাৎক্ষনিক ভাবে উক্ত রোহিঙ্গা পরিবারটিকে ইউএনএইচসিআর এর মাধ্যমে আইওএম হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনের জন্য প্রেরন করেছে ।

সিআইসি আব্দুল হান্নান সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ৪ সদস্যের এক রোহিঙ্গা পরিবারকে ইউএনএইচসিআর এর মাধ্যমে বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প (নং-৭) আইওএম হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনের জন্য প্রেরন করা হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের অবৈধ যাতায়াত টেকনাফকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তিনি আরো বলেন, বিদেশ ফেরতদের কোয়ারান্টাইন নিশ্চিত করতে গিয়ে অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে এরা রোহিঙ্গা। তাই উদ্বেগ বাড়ছে এখানে।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এর নেতৃত্বে আইন-শৃংখলা বাহিনীর একটি দল বাহারছড়া ইউনিয়নে মারিশবনিয়ার সৌদি ফেরত মৌলভী মোহাম্মদ শফির পুত্র সালামত উল্লাহর বাড়ি গমন করেন এবং হোম কোয়ারান্টাইন না মানায় তাকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ১৮৬০ সালের ফৌজদারী দন্ডবিধির ২৭০ ধারায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এ দন্ডাদেশ প্রদান ও দুবাই ফেরত বাহারছড়া মাথাভাঙ্গার কবির আহমদের পুত্র আবু তাহের ও সুলতান আহমদের পুত্র আব্দুল হামিদকে সতর্ক করা হয়।

এদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হতে বাঁচতে বিদেশ ফেরতদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার প্রশাসনিক নির্দেশ থাকলেও অনেকে নির্দেশনাকে অমান্য করে তথ্য গোপন করে বাড়ী ঘরে থাকার চেষ্টা করছে। তবে প্রশাসন সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। বিদেশ ফেরত কোন ব্যক্তি কোয়ারান্টাইনে না থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনীগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে।

Print Friendly and PDF

———