চট্টগ্রাম, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ , ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

গ্যালিলিও থেকে লি…

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১:৪১ : অপরাহ্ণ

লেখক- ফজলুর রহমান

চীনের ফুডান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের এক অধ্যাপকের কথাটি যেন বারুদ। লি ওয়েনল্যাংকে শ্রদ্ধা জানাতে একটা ভাস্কর্য তৈরির পরামর্শ তিনি উহান কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। যে ভাস্কর্যটার নাম দিতে বলেছেন- ‘গুজব বিক্রেতা’।

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েবোর এক ব্যবহারকারী ‘বীর’ ডাক্তার লি ওয়েনল্যাংয়ের মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে লিখেছেন -‘যদি পারো, মুখ খোলো। ছড়াও কিছু উত্তাপ; যত কমই হোক, ছড়াও কিছু আলো। যেমনি করে অন্ধকারে আলো জ্বালে জোনাকি। মশালের জন্যে কেন মিছে অপেক্ষা হে? মশাল যদি না-ই জ্বলে, আমি নিজেই হবো আলো।’

চীনের উহান থেকে যে ভাইরাস এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বহু দেশে, বিশ্ববাসীর মনে ধরিয়েছে ভয়, যে ভাইরাসের সংক্রমণে এরই মধ্যে ছয় সপ্তাহেরও কম সময়ে ঝরেছে ছয়শর বেশি প্রাণ, ডাক্তার লি সেই ভাইরাসের প্রথম খবর দিয়েছিলেন।

সেটা ডিসেম্বরের শেষ দিকে। ৩৪ বছরের এই তরুণ ডাক্তার সন্দেহ করেছিলেন, রহস্যময় এক ভাইরাস বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। এরপর ব্লগে লিখেছিলেন দুশ্চিন্তার কথা। সতীর্থ ডাক্তারসহ সকলের জন্য সেটা ছিল তার সতর্কবার্তা।

কিন্তু উহান কেন্দ্রীয় হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি। উল্টো ডাক্তার লি’কে ডেকে ধমক দিয়েছিল। উহান হাসপাতালেই কর্মরত ছিলেন তিনি।

গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ৩ জানুয়ারি তাকে আটকও করে পুলিশ। কঠোর চাপের মুখে তাকে বাধ্য হয়ে সই করতে হয়েছিল এই মর্মে যে, তিনি আইনভঙ্গ করেছেন এবং সামাজিক শৃঙ্খলায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটিয়েছেন।

অবশেষে সত্য ঠিকই প্রকাশিত। বেইজিংয়ের জন্য পুরো বিষয়টা হয়ে গেল বুমেরাং। গত ৭ জানুয়ারি উহানের একটি মাছবাজার থেকে অসুস্থ এক রোগীর শরীরে ধরা পড়ে নতুন করোনা ভাইরাস। এরপর উহানে তো নয়, কোথাও আর গোপন রইল না প্রাণঘাতী ভাইরাসের মরণ-ছোবলের খবর।

এমনকি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির গণমাধ্যম পিপল’স ডেইলিও এটা টের পাচ্ছে। পত্রিকাটির বিদেশ সংস্করণের ওয়েবো অ্যাকাউন্টে লেখা হয়েছে, ‘ওরা তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। তোমার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। ওপারে ভালো থেকো, ডাক্তার লি।’

এখন পর্যন্ত শুধু চীনেই মারা গেছে ৬৫০ জন। এদের মধ্যে একজন ডাক্তার লি। চীনের সাধারণ মানুষ যাকে এখন বীরের খেতাব দিচ্ছে। সারাবিশ্বেও ছড়াচ্ছে তাঁর বীরত্বের কথা।

চীনের বাইরে ফিলিপাইনে ও হংকংয়ে একজন করে মারা গেছেন। শুধু চীনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬ হাজারের বেশি লোক। অন্তত ২৬ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাস।

গ্যালিলিও থেকে লি। আবারো প্রমাণিত সবকিছুই গুজব হয় না। কোনো কোনো সন্দেহ সত্যিও হয়।

পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম বুদ্ধিমান বিজ্ঞানী গ্যালিলিও। তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ তার গুণের চর্চা করছে আর সাথে পাচ্ছে অফুরন্ত প্রেরণা। বিজ্ঞান আর ধর্মের বিরোধপূর্ণ এক সমাজে জন্মে অসম সাহসিকতায় তিনি বিজ্ঞানকে বেছে নিয়েছিলেন।

১৬৩৩ সালের ২২শে জুন মহান বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চ শাস্তি প্রদান করেছিলো। গ্যালিলিওর অপরাধ ছিল তিনি সত্য প্রচার করেছিলেন। সত্য প্রচারের জন্য বৃদ্ধ এক বিজ্ঞানীকে এমন শাস্তি পেতে হয়েছে। জীবনের শেষের দশটি বছর তাকে সহ্য করতে হয়েছে অত্যাচারের স্টিম-রোল। এই দিনেই তিনি যাজকদের সামনে, পোপদের সামনে তার হলফনামা পাঠ করেছিলেন। যেটি ছিল তার উপর জোর করে পড়ানো। তার প্রচার করা সত্যকে ‘ভুল’ বলার জন্য বাধ্য করা হয়। সত্যটাকে মিথ্যা বলাতে বাধ্য করা হয়।

তখনকার সময়ে সৌরজগৎ নিয়ে যে মতবাদ সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছিল তা হল টলেমী প্রদত্ত পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বমডেল। তখনকার সময়ে আরেকটা মতবাদ অল্প পরিসরে প্রচলিত ছিল আর তা হল কোপার্নিকাসের মডেল। কোপার্নিকাসের মডেলে সূর্য কেন্দ্রিক সৌরজগতের কথা বলা আছে। কিন্তু ধর্মীয় বইতে তার কথার সাথে কথা মিলে না বলে সেটি বেশিরভাগ কেউ মেনে নেয় নি। আবার অপরদিকে টলেমীর মডেল চার্চ মেনে নিয়েছিল। মেনে নিয়েছিল তার কারণ টলেমীর মডেল তারকা স্তরের পরে ফাঁকা জায়গার প্রস্তাব ছিল।

আর এই ফাঁকা জায়গাতে স্বর্গ ও নরকের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা পাওয়া যায়। এখানে একটি কথা বলতেই হয়- টলেমীর মডেল ছিল অত্যন্ত জটিল। অনেক কিছুই তা ব্যাখ্যা করতে পারত না। তারপরও সেটা মেনে নিয়েছিল সবাই। কারণ আর কিছু না, টলেমীর মডেল মতে পৃথিবী হল সৌরজগতের কেন্দ্রে। তাই এত গ্রহণযোগ্যতা। কোপার্নিকাসের মডেলে ছিল সূর্য কেন্দ্রিক মডেলের কথা। সূর্যই বিশ্বের কেন্দ্রে। যা হেলিওসেন্ট্রিজম নামে পরিচিত।

গ্যালিলিও এসবকে পাশ কাটিয়ে নিজেই শুরু করলেন পরীক্ষা। বানিয়ে নিলেন দূরবীক্ষণ যন্ত্র। দেখতে লাগলেন রাজ্যের সব জিনিস। চাঁদ, সূর্য, মঙ্গল আরও কত কি। এক সময় তিনি দেখলেন বৃহস্পতি গ্রহের চারটি গ্রহ তারা বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। অবাক কাহিনী! সব কিছুই যে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরার কথা। কিন্তু এখন তো নিজের চোখেই দেখা গেল যে সব কিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে না। মেনে নিয়ে প্রচার করলেন কোপার্নিকাসের মডেল।

ক্ষুব্ধ হয়ে গেলেন চার্চ। প্রথম দিকে একটু সতর্ক করে দিয়েছিলেন, আর যেন এমন না করে। কিন্তু ওই যে সত্যের জন্য জীবনবাজি। জীবনকে বাজি রেখেই তিনি সত্য প্রচার করলেন।

ফল স্বরূপ এই বৃদ্ধ বয়সে তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে। এই সময় তিনি দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলেন। অনিরাপদ অবস্থায় সূর্য পর্যবেক্ষণের জন্য সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি প্রভাব ফেলেছে খুব। এই অন্ধ অবস্থায়ই মেনে নিতে হয়েছে সব। তিনি থাকতেন ইটালির ফ্লোরেন্সে।

বিচার হবে রোমে। সেই রোমে যাবার পর্যন্ত শক্তি ছিল না। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে এমন ধর্মদ্রোহিতা মূলক কথা বলেছে বলে তাকে পেতে হয়েছে শাস্তি। কাঠগড়ায় হাঁটু গেড়ে, মাথা নিচু করে চাইতে হয়েছে ক্ষমা, পড়তে হয়েছে হলফনামা।
তাদেরই লিখা হলফনামা। “আমি গ্যালিলিও…. বিচারকদের সামনে দাড়িয়ে, মাথা নিচু করে বলছি যে…. আমি প্রচার করেছিলাম সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্র… এটি মিথ্যা। পৃথিবীই হল সৌরজগতের কেন্দ্র।… পৃথিবী ঘুরছে সেটা মিথ্যা বরং পৃথিবী স্থির, সবকিছুই পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে।… আমি স্বজ্ঞানে স্বশরীরে এমন বলছি। আমার অপরাধের জন্য আমাকে যা শাস্তি দেয়া হবে তা আমি মাথা পেতে নেবো।”

গ্যালিলিওর সত্যই অবশেষে প্রতিষ্ঠিত। করোনা ভাইরাস নামের গুজবও অবশেষে সত্যি হলো। সত্যি মনে করে সতর্ক হলে কিছু প্রাণ বাঁচানো যেত হয়তো। হয়তো বেঁচে যেতে পারতেন লিও। কিন্তু একজন ওয়েবো ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ভালো মানুষ বেশিদিন বাঁচে না। শয়তানেরা বাঁচে হাজার বছর।’

লেখক- ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Print Friendly and PDF

———