চট্টগ্রাম, সোমবার, ২৫ মে ২০২০ , ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

রাউজানে অতিথি পাখির কলকাকলি

এম বেলাল উদ্দিন, রাউজান (চট্টগ্রাম) থেকে প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ২:০৬ : অপরাহ্ণ

রাউজানে অতিথি পাখিলস্কর উজিরের দীঘি। রাউজানের ঐতিহ্যবাহী এ দীঘির পাশে গেলে যে কেউ এখন পাখির কলকাকলিতে মুগ্ধ হতে বাধ্য। বিশাল দীঘির জলে চোখ পড়লেই দেখা মিলবে হাজারো অতিথি পাখির। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দীঘির জলে বিচরণ করে কালো ডানা ও লালচে ধূসর বর্ণের ‘সরলী’ নামের এ পাখি।

কখনও জলে ভাসতে ভাসতে আবার কখনও দল বেঁধে উড়ছে দীঘির চারপাশে। একসঙ্গে ওঠানামা করতে গিয়ে পা আর পাখার ঝাপটায় চারদিকে ছিটকে পড়া পানিতে সৃষ্টি হচ্ছে এক অপরূপ দৃশ্য।

প্রতি বছর শীত মৌসুমে বিভিন্ন দেশ থেকে উঁড়ে আসতে শুরু করে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। অন্যান্য বছরের মত এবারও হাজার হাজার মাইল অতিক্রম করে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির ঝাঁক উঁড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে রাউজানের বড় বড় পুকুর দিঘিতে।

দলবদ্ধ পাখি এখন ঠাঁই নিয়েছে এখানকার জনকোলাহলমুক্ত পরিবেশে নির্ঝন এলাকার পুকুর দিঘিতে। ভিনদেশী এসব পাখির ঝাঁক দেখা যায়, নোয়াপাড়া ইউনিয়নের কর্তার দিঘি, কদলপুর ইউনিয়নের লষ্কর উজির দিঘিসহ উপজেলার বিভিন্নস্থানের বড় বড় জলাশয়ে।

ভিন দেশিয় পাখির ঝাঁক যেই এলাকায় নেমেছে, সেই এলাকাটি এখন কলকাকলিতে ভরে উঠেছে। কিচিমিচি শব্দ শুনে অনেকেই উঁকি মেরে দেখছে পাখির মুক্তবিচরণ।

কৌতুহলী অনেকেই কাছ থেকে দেখতে গেলেই ঝাঁক বেঁধে উড়াল দিচ্ছে আকাশের পানে। আতংকিত পাখির দল কিছুক্ষণের জন্য আকাশে উঁড়ে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখে নিচের দিকে। যখনই তারা নিরাপদ মনে করছে তখনই এসে পড়ছে আশ্রয় নেয়া সেই পুকুর দিঘিতে।

রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের লস্কর উজির দীঘিতে দেখা যায়, অতিথি পাখির বিপুল সমাগম। দূরদেশ থেকে আসা এসব অতিথি পাখি দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরাও। ইউনিয়নের শেষ সীমানায় হাফেজ বজলুর রহমান সড়কের পাশে অবস্থিত ৬০ একর আয়তনের বিশাল এই দীঘির উত্তর পাড়েই রয়েছে বিশাল এক বাগান।

রাউজানে অতিথি পাখিশীতের মৌসুম আসার পর থেকেই প্রতিদিন হাজারো অতিথি পাখি দল বেঁধে আসতে শুরু করে এখানে। কখনো এরা দীঘির পাড়ের বাগানে গাছে গাছে দল বেঁধে বসে থাকে। আবার কখনো দল বেঁধে উড়ে বেড়ায় দীঘির পানির ওপর দিয়ে। হাজার হাজার অতিথি পাখির কোলাহলে পুরো এলাকা এখন মুখরিত।

কদলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তসলিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মানুষজনকে অতিথি পাখি শিকার থেকে বিরত রাখার জন্য দীঘিটি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সার্বক্ষনিক নিরপত্তার জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্য আলী আকবর ও নাছির উদ্দিনকে দিয়ে কমিটি করে দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, শীতকালে লস্কর উজীর দিঘিতে অতিথি পাখি আসায় এলাকায় সৌন্দর্য উপভোগ করতে স্কুল কলেজ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও এলাকার লোকজন ঘুরতে আসে। শুধু রাউজানের নয় পাশ্ববর্তী উপজেলা ও চট্টগ্রাম শহর থেকেও দলবেধে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন দুর দেশ থেকে আসা বিভিন্ন প্রজাতীর অতিথি পাখি দেখতে।

অন্যদিকে লস্কর উজির দিঘীর উত্তর পাড়ে বাগানের মধ্যে বিনোদনের জন্যে আসা দর্শনার্থীর জন্য বসার পাকা বেঞ্চ নির্মাণ করে দিয়েছে কদলপুর ইউনিয়ন পরিষদ। ৩‘শ বছরের পুরনো লস্কর উজীর দিঘীতে অতিথি পাখির কোলাহল, দীঘির পাড়ে বাগান, দীঘির পূর্ব পাড়ে মসজিদ, পাকা ঘাট অপরুপ সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।

কদলপুর লস্কর উজির দীঘির পাশ্ববর্তীরা জানান, শীত আসার সাথে সাথে হাজার হাজার অতিথি পাখি দল বেঁধে লস্কর উজির দিঘীতে আসে। শীত শেষে আবার চলে যায়। এ দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিদিন রাউজানের বিভিন্ন এলাকা থেকে লস্কর উজির দীঘির পাড়ে ছুটে আসেন অনেক মানুষ।

আবার কেউ বলেন, এখানে যখন আমরা নামাজ পড়তে আসি তখনি এসব পাখির দৃশ্য আমাদের মনে আনন্দ দেয়। আমরা আনন্দ পাই কারণ এরকম দেশি-বিদেশি পাখির দৃশ্য কোথাও দেখা যায় না, যা এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি। এরকম একটি মনোরম দৃশ্য দেখতে অনেক সুন্দর আর ভালো লাগে। বিশেষ করে এই দিঘীটি পাখির একটি নিরাপদ আবাসস্থল, তা না দেখলে বিশ্বাসই করা যায়না।

নিরাপদ বলেই প্রতি বছর এই দিঘীতে অতিথি পাখিরা ছুটে আসেন। স্থানীয়রা আরো জানায়, কতৃপক্ষ যথাযথ উদ্যোগ নিলে কদলপুর লস্কর উজির দিঘী হতে পারে চট্টগ্রামের অন্যতম একটি পর্যটন স্পট।

অন্যদিকে উপজেলার গহিরা ইউনিয়নের কোতোয়ালী ঘোনা এলাকায় সুলতান নশরত বাদশার অতিথি পাখীর কিচিঁর মিচির শব্দে এলাকা মুখরিত হয়ে উঠেছে। এ দীঘি দেখে দর্শনার্থী ও এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে মোগল শাসনের কথা স্মরনীয় হয়ে উঠে।

সুলতান নসরত বাদশার দিঘির পাড়ের পাশ দিয়ে ইছাপুর সড়ক। দিঘির পশ্চিম পাশে হজরত মুফতি ছমিউদ্দিন শাহ ও হজরত আদল শাহার মাজার, পুর্বপাড়ে হজরত কানু মিয়াজির মাজার। ২৫ একর ২০ শতক আয়তনের নসরতা বাদশার দীঘির চার পাড়ে এলাকার বাসিন্দাদের কবরস্থান।

দক্ষিন পাড়ে সুবিশাল পাকা ঘাট পূর্ব পাড়ে দুটি পকা ঘাট, দীঘির পাড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সারি সারি বৃক্ষ। দিঘির দক্ষিন পাড়ে বিশাল পাকা ঘাটের ছাদে নির্মান করা হয়েছে ব্যবসায়ী জামাল গোলতাজ আশরফ সুন্নিয়া ফেরকানীয়া নরানী মাদ্রাসা।

এছাড়াও এ দীঘিতে মাছ চাষ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে দীঘির মালিকরা। জানা যায়, ২৭ ব্যক্তির মালিকানাধীন নসরত বাদশার দীঘিতে দীঘির মালিকেরা মিলে মাছ চাষ করে।

দীঘির মাছ বড় হলে প্রকাশ্যে নিলাম ডেকে মৎস্য ব্যবসায়ীদের কাছে মাছ বিক্রয় করে। মৎস্য চাষীরা নিলামে মাছ ক্রয় করে দীঘি থেকে জাল, বড়শী দিয়ে ও দীঘির পানি সেচের মাধ্যমে মাছ শিকার করে বিপুল পরিমান টাকা আয় করে।

নসরত বাদশার দিঘিতে বড় বড় সাইজের রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, চিতল, সইল সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। গত কয়েক বৎসর পুর্বে একবার নসরত বাদশার দিঘির মাছ ১৫ লাখ টাকায় নিলামে বিক্রয় করে। পরবর্তী পুনরায় মাছের চাষ করার পর দিঘির মাছ গহিরার সাইদুল আলম মনসুরের কাছে বিক্রয় করে ৯ লাখ টাকা দিয়ে।

এদিকে রেলপথ মন্ত্রনালয় সর্ম্পকিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবি এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি রাউজানে কোন অতিথি পাখী ও বন্য প্রাণী শিকার নিষিদ্ধ করায় রাউজান এখন অতিথি পাখীর অভয়ারন্য এলাকা হিসাবে গড়ে উঠেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগ বলেন, রাউজান উপজেলা অতিথি পাখীর অভয়ারন্য এলাকা। কেউ যেন পাখি শিকার এবং তাদের বিরক্ত না করে তার জন্যও রাউজান উপজেলা প্রশাসন, আইন শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা সর্বদা নজরদারীতে রেখেছে। এলাকার স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারদের অতিথি পাখীর নিরাপত্তা প্রদানের জন্য নিদের্শ দেওয়া হয়েছে।

পাখি নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের শীতের আবহওয়ার পরশ পেতে বহু দেশ থেকে ছুটে আসে পাখির দল। এসব পাখির মধ্যে দেখা যায়, শামুক ভাঙ্গা, লালশির, পাতারি হাঁস, কালো হাঁস, বালি হাঁস, মাঝলা বক, সরালী, ছোট সরালী, রাজ হাঁস, কানি বক, ধূসর বক, গো বক, সাদা বক, জলের কাদাখোঁচা পাখি, লেঞ্জা, কুন্তি হাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

সূত্র মতে পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এসব পাখির একটি অংশ বছরের একটি নিদিষ্ট সময়ে দেশে দেশে ছুটে বেড়ায়। মৌসুমী ভ্রমনে বের হওয়া এসব পাখির একটি সংখ্যা আমাদের দেশে আসে শীতের মৌসুমে। ওরা আশ্রয় নেয় গ্রামীণ বিভিন্ন খাল, বিল, পুকুর, দীঘির মত বড় বড় জলাশয়ে।

উল্লেখ্য যে, শুধু লস্কর উজির দীঘি ও নশরত বাদশার দীঘি নয় নোয়াপাড়ার কর্তার দীঘি, পশ্চিম গুজরার ইউনিয়ন, চিকদাইর ইউনিয়ন ও বিনাজুরী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার ফসলী জমিতে শীতের মৌসুমে অতিথি পাখীর ব্যাপক বিচরন দেখা যায়।

সিটিজি টাইমস/এম বেলাল উদ্দিন

Print Friendly and PDF

———