চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২০ , ২৫ আষাঢ়, ১৪২৭

অস্ট্রেলিয়ার দাবানল: বিপদাপন্ন বিপুল প্রাণী কিভাবে বাঁচবে?

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ৭ জানুয়ারি, ২০২০ ১১:৫২ : পূর্বাহ্ণ

এক নারী তার নিজের জামা খুলে এক কোয়ালাকে বাঁচাতে গেছে।অন্য একজন তার নিজের খাবার পানি কাঙ্গারুকে পান করাচ্ছে। আরেকজন কৃষক মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করা পশু প্রাণীদের যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিতে গুলি করে মেলে ফেলছে। আগুনে পুড়ে ক্যাঙ্গারুর দেহ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আহত প্রাণীরা জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মানুষ দেখলেই জড়িয়ে ধরছে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। দমকলকর্মীদের দেয়া পানি জীব-জন্তুরা খাচ্ছে। এই রকম হৃদয় বিদারক ছবি এখন অস্ট্রেলিয়ার দাবানলাক্রান্ত বনাঞ্চলের প্রতিদিনের চিত্র।

অস্ট্রেলিয়ার বিশাল অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই দাবানল। এখন পর্যন্ত ৫০ কোটির বেশি প্রাণী মারা পড়েছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৮০ মিলিয়ন স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি এবং সরীসৃপ নিখোঁজ হয়ে গেছে।আগুনের গ্রাসে পুড়ে ছাই হয়েছে হাজার হাজার বিপন্ন প্রজাতির কোয়ালা। ধারণা করা হচ্ছে, নিউ সাউথ ওয়েলসের মধ্য-দক্ষিণ উপকূলবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় আট হাজার কোয়ালার মৃত্যু হয় এই দাবানলে। এই অঞ্চলের প্রাণীসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ হলো কোয়ালা। এই সংখ্যা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলবর্তী অঞ্চলে দাবানলের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে ক্যাঙ্গারুরা। বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য প্রাণী পুড়ে মরে গেছে। কাকাতুয়াসহ অনেক প্রজাতির পাখি মরে গাছের নিচে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বিপুল পরিমাণ প্রাণীর মৃত্যুর খবর নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। এরইমধ্যে পুড়ে গেছে প্রায় ৬ মিলিয়ন হেক্টর বন।

দেশটির প্রাণী উদ্ধারকর্মী ট্র্যাসি বার্জেস বলেছেন, চিকিৎসার জন্য যে পরিমাণ পশু-প্রাণী আনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, আমাদের চিকিৎসা কেন্দ্রে ততো বেশি প্রাণী আসেনি। কারণ সেখানে বেশিরভাগই মারা গেছে। আমাদের উদ্বেগ হচ্ছে সেগুলো (পশু-প্রাণী) আমাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে আসছে না। মূলত কারণ সেগুলো আর জীবিত নেই। খোলা চিঠিতে ১৩টি সংগঠনের স্ট্যান্ড আপ ফর ন্যাশার নামের একটি জোট সতর্ক করে বলেছে, এই দাবানলের প্রভাব হচ্ছে মারাত্মক ও চলমান। এই প্রাণহানির পরিমাণ সম্ভবত কখনওই জানা যাবে না। তবে এটা নিশ্চিতভাবে কোটি কোটি হবে।

দাবানল হচ্ছে বনভূমি বা গ্রামীণ এলাকার বনাঞ্চলে সংঘটিত একটি অনিয়ন্ত্রিত আগুন। প্রখর সূর্যের তাপে ও অধিক ঘনত্বের কারনে বনের তাপমাত্রা অত্যাধিক বেড়ে যায়। তখন মরা গাছের ঘর্ষনে একটি আগুনের ফুলকির সৃষ্টি হয়। ঘন পাহাড়িয়া অঞ্চলে দাবানল হবার ঘটনা তুলনামূলক বেশি। উষ্ণ তাপক-শিখা ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে থাকে আর পোড়াতে থাকে বন। উঁচু গাছের ক্যানপির আগুন অনায়াসে উড়তে থাকে যত্রতত্র। এসব আগুন নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। যতক্ষণ খুশি আপন মনে জ্বলতে থাকে আগুন। দাবানলকে অল্পকথায় ‘অপ্রতিরোধ্য’ ও ‘সর্বগ্রাসী’ শব্দ দিয়ে বর্ণনা করার চেষ্টা করা যেতে পারে। এটি

যে অঞ্চলকে অতিক্রম করে যায়, আক্ষরিক অর্থেই সেখানে কোনোকিছু অবশিষ্ট থাকে না।

প্রাকৃতিকভাবে সাধারণত দুটি উপায়ে দাবানল শুরু হতে পারে; (১) যদি কোনো শুষ্ক বনভূমির উপর বজ্রপাত হয়, (২) কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত লাভা অথবা বিভিন্ন পদার্থের জ্বলন্ত টুকরা থেকে। এরপর সেটি পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুসারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সাম্প্রতিককালে মানবসৃষ্ট কারণেই দাবানল বেশি ঘটে থাকে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে ৮৪% ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণে দাবানল সংঘটিত হয়ে থাকে।

একমাত্র মানুষকেই বলা হয়েছে প্রয়োজনে পুরো পশু সাবাড় করা যাবে, তবে বিনা প্রয়োজনে পশুপাখিকে বিরক্ত করাও পাপ। এসব মানুষ ভুলে যায় হয়তো। তবে পশুরা মনে রাখে, এখনো বিশ্বাসে আশ্রয় মানে। অস্ট্রেলিয়ায় চলমান হৃদয় বিদারক ঘটনার মধ্যেও একটুখানি স্বস্তির খবর হলো ৯০ হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণীকে উদ্ধার ও চিকিৎসা দিয়েছেন একটি পরিবার। এ কাজের জন্য বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে তারা। অস্ট্রেলীয় টেলিভিশন উপস্থাপক স্টিভ আরউইন মূলত বন্যপ্রাণীর সেবা করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পরও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে তার পরিবার। স্টিভের মেয়ে বিন্দি আরউইন ও পরিবারের অন্যরা মিলে অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ দাবানলে বহু বন্যপ্রাণীর জীবন বাঁচিয়েছেন এবং চিকিৎসা দিয়েছেন। সে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৯০ হাজারেরও বেশি। আরউইন পরিবার পরিচালিত ওয়াইল্ডলাইফ হাসপাতালের ৯০ হাজারতম রোগী ছিল ওলি নামের একটি প্লাটিপাস। স্টিভ আরউইনের সন্তান রবার্ট আরউইন গত বৃহস্পতিবার এক ইন্সট্রাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ দাবানলে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ও বণ্যপ্রাণীদের জন্য আমার হৃদয় কাঁদছে।’

আসলেই মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ব থাকলে তা সকল সৃষ্টিকেই আকর্ষণ করে। কারণ, মানুষ সৃষ্টির সেরা, অন্য প্রাণীদের আইডল। আর অন্যরা কেবল সৃষ্টি, ফলোয়ার। আমরা দেখতে পাচ্ছি, অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে বিপন্ন প্রাণীরা মানুষের মাঝে মানুষ পেলেই কোলে ওঠে যাচ্ছে। চুমু খাচ্ছে। জড়িয়ে ধরছে। পাশে বসে থাকছে। ওদের দেয়া খাবার আর পানি খাচ্ছে।

আগুনের আবিষ্কার মানব সভ্যতার বড় অর্জন। তবে এই মহাশক্তি আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারও প্রয়োজন। কারণ, আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তার ক্ষমতার আসল রূপটি দেখা যায়। এটি তখন পরিণত হয় এক ভয়াবহ দানবে। ‘কোড রেড’ (চূড়ান্ত সতর্কতা) জারি করে অস্ট্রেলিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চলে দমকল বিভাগ জনগণকে সর্তক করে ঘোষণা করছে, ‘‘দয়া করে আপনারা এলাকা খালি করে অন্যত্র যান। আগুন ছড়ালে কাউকে আর বাঁচানো যাবে না।’ মানুষ না হয় ঠিকানা বদলাতে পারবে, কিন্তু বিপদাপন্ন বিপুল প্রাণী কিভাবে বাচঁবে?

লেখক- ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Print Friendly and PDF

———