চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২০ , ২৫ আষাঢ়, ১৪২৭

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নতুন বাজি সৌর ‘ভূপ্রকৌশল ধারণা’

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ১১:৫৭ : পূর্বাহ্ণ

লেখক- ফজলুর রহমান

জলবায়ৃ পরিবর্তন জনিত বিপদ মোকাবেলায় সরব সারা দুনিয়া। ঘনিয়ে আসা এই বিপদরোধে নেয়া হচ্ছে নানান পদক্ষেপ। চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এরইমাঝে নতুন বাজি হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে ‘ভূপ্রকৌশল ধারণা’।

এই ধারণাটি একটু খতিয়ে দেখা যাক। এখানে প্রথমত, কার্বন ডাই-অক্সাইডকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, সৌরশক্তি প্রতিফলনের ব্যবস্থা রাখা, যেন পৃথিবী দ্বিতীয়বার উত্তপ্ত না হয়। পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার ভেতর কেমন করে ঢোকা যায়। একে বলা হচ্ছে ভূপ্রকৌশল।

সোলার জিও ইঞ্জিনিয়ারিং বা সৌর ভূপ্রকৌশল একটি নতুন ধারণা। গবেষকরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এই নতুন ধরনের গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন। এটি যেমন বিপুল সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র, তেমনি এর ঝুঁকিও আছে।

ধরা যাক, সাগর থেকে পানি তুলে নিচ্ছেন কেউ। অনেক পানি। ধরা যাক, কয়েক শ বিলিয়ন টন। এবার পুরো পানিটুকু জমে কয়েক ট্রিলিয়ন টন তুষার হয়ে গেল। এভাবে অ্যান্টার্কটিকার একটি অংশকে তুষারে পরিণত করা হলো। যেন বরফের ওপর আরেকটি বরফের চাদর।

একটি গবেষকদলের হিসাবে, এভাবে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলা ঠেকানো যাবে। আর বাঁচানো যাবে সাংহাইয়ের মতো শহর অথবা ডুবে যাওয়া থেকে বেঁচে যাবে নিউ ইয়র্ক। কারণ এই গবেষকরা বলছেন, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে গেলে পানির উচ্চতা বাড়বে তিন মিটারের বেশি।

গবেষকদের একজন বায়ুমন্ডল বিজ্ঞানী মার্ক লরেন্স। তিনি বলেন, ‘পিআইকের গবেষকরা সেটাই করছেন যেটা গবেষকরা বরাবরই করে থাকেন, গেডাঙ্কেন এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তার পরীক্ষা।’

পদার্থবিদ জেসিকা স্ট্রেফলার বলেন, ‘নানা রকমের উদ্যোগ নিয়ে আমরা ভাবছি। একদিকে গাছ লাগিয়ে বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড কমানোর চেষ্টা করছি; অন্যদিকে কারিগরি উদ্যোগ নিয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড সরাসরি বায়ুমন্ডল থেকে বের করে নিয়ে আসা। যেমন কৃত্রিম গাছ লাগানো। তবে কার্বন ডাই-অক্সাইডেরও প্রয়োজন আছে। একেও ভূতাত্ত্বিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।’

সমস্যা হলো-কোথায় রাখা হবে কার্বন ডাই-অক্সাইড? একটা উপায় হলো-একে মাটির নিচে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পাইলট আকারে কিছু প্রকল্পও করা হয়েছে। কিন্তু ভাবনার বিষয়ও আছে। জেসিকা বলেন, ‘যে ঝুঁকির কথা সবাই ভাবছে তা হলো-কার্বন ডাই-অক্সাইড আবার বেরিয়ে আসতে পারে। যদি বেরিয়ে আসেও তার পরিমাণ হবে অনেক কম, যা খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বায়ুমন্ডলের ওপর।’

সৌর ভূপ্রকৌশলে নানা ধারণা নিয়ে কাজ করা হয়। সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়টি হলো, বাতাসে এমন কিছু কণা ছড়িয়ে দেওয়া যা সূর্যরশ্মিকে প্রতিফলিত করে আবার মহাকাশে পাঠিয়ে দেবে। যেমন সালফারের কণা।’

মার্ক লরেন্স বলেন, ‘স্ট্রাটোস্ফিয়ারে যদি পর্যাপ্ত কণা ছাড়া যায় তাহলে এগুলো এর তাপমাত্রাও পর্যাপ্ত পরিমাণে বদলে দিতে পারে। ধরুন ২ ডিগ্রি, তাহলে বায়ুমন্ডলের রংই বদলে যাবে। আমরা এমনটা দেখেছি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর, খুবই অদ্ভুত রং যেমন ম্যাজেন্টা বা কমলা রঙের সূর্যাস্ত। এমনকি আকাশ আরো সাদা হয়ে উঠতে পারে, নীল কমে যেতে পারে। এমন পরিবর্তনগুলো হয়তো তখন চোখে ধরা পড়বে। তবে মনে রাখতে হবে, এর প্রভাব শুধু আমাদের ওপর নয় আরো অনেক জীবের ওপর পড়তে পারে, বিশেষ করে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সঙ্গে জীবনপ্রক্রিয়া জড়িত যেসব পোকামাকড় আছে সেগুলোর।’

সৌর ভূপ্রকৌশলের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাবে। তবে একই সময় কোনো কোনো এলাকা আরো অনেক শুষ্ক হয়ে যাবে। আর এটি বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে এই গবেষকদের কাছে এখনো সব কিছু চিন্তায় সীমাবদ্ধ। এখনো কোনো পরীক্ষা করা হয়নি।

ডয়চে ভেলেতে এই নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সৌর ভূপ্রকৌশল আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে তা বুঝতে এখনো অনেক গবেষণা দরকার।

কিন্তু বেশ আশাবাদী গবেষকরা। যদি তা সফল হয় এরপর তা আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার হাতিয়ার হয়েও উঠতে পারে।

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Print Friendly and PDF

———