চট্টগ্রাম, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০ , ১৭ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মিরসরাইয়ে ৫শ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ‘ছুটি খাঁ মসজিদ’

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ৯:১৫ : পূর্বাহ্ণ

বারআউলিয়ার পুণ্যভূমি খ্যাত চট্টগ্রামে পুরাতাত্তি্বক কিছু স্মৃতিচিহ্ন আছে মসজিদকে ঘিরে। ২০০ থেকে ৭০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যের এসব স্মারকও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার পথে। ঐতিহ্যবাহী এমনই এক মসজিদ হচ্ছে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের ‘ছুটি খাঁ মসজিদ’। 

মিরসরাইয়ের ছুটি খাঁ মসজিদ‘ছুটি খাঁ মসজিদ’; গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহের আমলে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উত্তর চট্টগ্রামের শাসনকর্তা লস্কর পরাগল খাঁ ও তাঁর ছেলে ছুটি খাঁর আমলে তৈরি হয় এটি। প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে স্থান পেয়েছে মসজিদটি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন মহাসড়কের পশ্চিম পাশে স্থানীয় ছুটি খাঁ দিঘির পূর্ব পাড়ে মসজিদটির অবস্থান। উপজেলার জোরারগঞ্জ বাজার থেকে মাত্র ৫০০ গজ উত্তরে।

গবেষক আহমদ মমতাজের ‘মিরসরাইর ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহের আমলে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উত্তর চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন লস্কর পরাগল খাঁ। পরবর্তীতে তাঁর ছেলে ছুটি খাঁ। পরাগল খাঁর পিতা রাস্তি খাঁও গৌড়ের শাসনকর্তা রুকুনুদ্দীন বরবাক শাহের শাসনামলে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন। পরাগল খাঁ ও ছুটি খাঁর শাসনামলে চট্টগ্রামের শাসন কেন্দ্র ছিল পরাগলপুর। এ সময় এখানে বেশ কিছু দিঘি ও কয়েকটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

জানা গেছে, ছুটি খাঁ মসজিদের মূল নকশা বহুদিন পূর্বে ভেঙে পড়েছে। যা পরবর্তীতে নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়। তবে মূল মসজিদের বেশ কিছু ছোট বড় পাথর ও শিলালিপি দেখতে পাওয়া যায়। পুরনো মসজিদের কিছু নিদর্শন (ধ্বংসাবশেষ) প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর কর্তৃক সংরক্ষণ করা হয়েছে।

মসজিদের নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত পাথর ও শিলালিপি দেখে বিভিন্ন সময় প্রত্নতত্ত্বববিদরা ধারণা করেছেন, পঞ্চদশ শতাব্দীতে এ মসজিদ তৈরি করতে ভারতের রাজস্থান বা অন্যান্য প্রদেশ থেকে পাথর ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী আনা হয়েছে।

দেখা গেছে, কৃষ্ণবর্ণের নানা নকশা ও আকৃতির পাথরগুলো মসজিদ প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এখনো। মসজিদের ভেতরে একাধিক শিলালিপি রয়েছে। যার মধ্যে একটি শিলালিপিতে পবিত্র কোরআন শরীফের আয়াতুল কুরসি লেখা আছে।

ছুটি খাঁ মসজিদলিপি খোদিত পাথরের ব্লক দিয়ে নির্মিত ছিল। সেগুলো এখনো পড়ে আছে বর্তমান মসজিদের আঙিনায়। এসব লিপি তোগরা হরফে কোরআনের নানা আয়াত ও আরবি দোয়া। তবে ঐতিহাসিক মূল্যবিশিষ্ট কোনো লিপি পাওয়া যায়নি এখানে।

মিরসরাইয়ের ছুটি খাঁ মসজিদছুটি খাঁ কর্তৃক এ মসজিদ স্থাপন করা হয় ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে। তবে মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা পরাগল খাঁ নাকি ছুটি খাঁ, এর কোনো লিখিত সাক্ষ্য প্রমাণ নেই। নির্মাতা যেই হোন, মসজিদটি অদ্যাবধি ৫০০ বছর ধরে এ অঞ্চলের শাসক, পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা ও আরাকানি অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াকু সৈনিক ছুটি খাঁর স্মৃতি হিসেবে টিকে আছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি শুক্রবার ও ঈদের সময় বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয় মসজিদ ও মসজিদ প্রাঙ্গণে। শত শত মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন।

মসজিদ কমিটির কর্মকর্তারা জানান, ছুটি খাঁ মসজিদ দেশের একটি প্রাচীনতম স্থাপত্য। এটি সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময় সাধারণ নির্মাণ শ্রমিকদের দিয়ে মেরামতের কারণে এটির মূল নকশা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখনো সময় আছে এটি আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার।

জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মকসুদ আহম্মদ চৌধুরী বলেন, ‘এটি দেশের প্রত্নতত্ত্ব ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচিত পুরোপুরি বিনষ্ট হওয়ার পূর্বে এটিকে সংরক্ষণ করা।’

সিটিজি টাইমস/এম মাঈন উদ্দিন

পুনশ্চ: চট্টগ্রামের প্রথম ও শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিটিজি টাইমসে ”শুক্রবারের বিশেষ প্রতিবেদন” এ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় মসজিদ গুলোর উপর বিশেষ প্রতিবেদন। আপনি ও লিখতে পারেন আপনার পাশের ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় মসজিদ নিয়ে। ছবি সহ লিখা পাঠাবেন আমাদের মেইলে। 

আরো… 

Print Friendly and PDF

———