চট্টগ্রাম, সোমবার, ২৫ মে ২০২০ , ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন মোগল স্থাপত্য ‘কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ’

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ৪:২৮ : অপরাহ্ণ

বারআউলিয়ার পুণ্যভূমি খ্যাত চট্টগ্রামে পুরাতাত্তি্বক কিছু স্মৃতিচিহ্ন আছে মসজিদকে ঘিরে। ২০০ থেকে ৭০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যের এসব স্মারকও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার পথে। ঐতিহ্যবাহী এমনই এক মসজিদ হচ্ছে  চট্টগ্রাম নগরীর জামাল খানে অবস্থিত ঐতিহাসিক কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ

কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ
চট্টগ্রামের অতীত ইতিহাসের ঐতিহ্যের সাথে শহরের সবচাইতে প্রাচীন সমজিদ কদম মোবারক মসজিদের নাম মিশে আছে।কদম মোবারক মসজিদ তার অতীত এতিহ্যকে ধারণ করে আজো টিকে আছে।  ধর্মীয় তীর্থ কেন্দ্র হিসেবে কদম মোবারক মসজিদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সেই আদিকাল থেকেই।

মোঘল শাসক নবাব ইয়াছিন খাঁন কর্তৃক এই মসজিদ নির্মিত হয়। কদম মোবারক মসজিদ মোঘল স্থাপত্য শিল্পের এক ঐতিহাসিক নির্দশন হিসেবে আজো টিকে আছে।  এই মসজিদের গঠন, অবকাঠামো, নির্মাণ শৈলী, কারুকার্য্য এখনো সবাইকে আকৃষ্ট করে।

মোঘল শাসকরা যখন চট্টগ্রামকে মগ এবং পর্তুগীজদের হাত থেকে মুক্ত করেন তখন এখানে মোঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত পর এখানে ইসলাম ধর্ম প্রচার এবং প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং তাদের বিজয়ের নির্দশন স্বরূপ বহুমসজিদ নির্মাণ করেন।

তেমনি একজন ধর্মভীরু মোঘল শাসক নবাব ইয়াছিন খাঁন এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার এবং প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজস্ব খরচে চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ কেন্দ্র চেরাগীর পাহাড় (মোমিনরোড) এলাকায় ১৭১৯ সালের দিকে এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

১৭৯৯ থেকে ১৮০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার বছরে মসজিদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। মসজিদটি নির্মাণকালে মোঘল স্থাপত্য শৈল্পিক চেতনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। কদম মোবারক মসজিদের নির্মাণ শৈলী এখনো দর্শনার্থীদেরকে আকৃষ্ট করে।

কদম মোবারক মসজিদে মোঘল শাসকদের রুচির বহিঃ প্রকাশ ঘটেছে। সমতল ভূমি থেকে অনুচ্ছ পাহাড়ের মাঝখানে উত্তর-দক্ষিণে লম্বাকৃতির এই মসজিদে পাঁচটি বিশাল আকৃতির গম্বুজ রয়েছে। বড় একটি গম্বুজের উভয় পার্শ্বে দুটি করে চারটি গম্বুজের অবস্থান। এই গম্বুজগুলো চার কোন বিশিষ্ট। মসজিদের সামনের দেয়ালের মাঝখানের দরজার দুপাশে দুটি সরুমিনার রয়েছে।

মসজিদের পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি খিলান দেয়া দরজা। মাঝখানের দরজাটির আকার অন্যদুটি দরজার তুলনায় বড়।

দরজাগুলো সোজা ভিতরে পশ্চিমে দেয়ালে আছে তিনটি মেহরাব। মেহরাবগুলোর সংলগ্ন স্থানটুকু অপূর্ব সুন্দর কারুকার্য্যময় লতাগুলোর নক্শা ও সুন্দর হস্তাক্ষরে আরবী ভাষায় উত্কীর্ণ লিপি এখনো রয়েছে।

মসজিদের উত্তর পার্শ্বের একটি কক্ষে পাথরের উপর মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স.) এর পায়ের ছাপ বিশিষ্ট কদম রয়েছে। তার পাশে আরেকটি পায়ের ছাপ বিদ্যামান যা নাকি বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) এর বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কদমের ছাপদ্বয় মোঘল আমল থেকেই এখানে এভাবে সংরক্ষিত আছে।

এক পদচিহ্ন বরাবরে বাংলায় লেখা রয়েছে: ‘সরওয়ারে কায়েনাত হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম–এর কদম মোবারক’। অপর পদচিহ্ন বরাবরে লেখারয়েছে : ‘হযরত গাউসুল আজম আব্দুল কাদের জিলানী (র.) এর কদম মোবারক’।

মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা নবাব ইয়াছিন খান কদমের ছাপদ্বয় সুদূর আরব দেশ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়।

বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন সংস্কার ও সমপ্রসারণ কর্মকাণ্ডের ফলে মসজিদের কিছুটা আধুনিকতার ছাপ পড়লেও মসজিদটির মূল অবকাঠামো মোঘল স্থাপত্যের অনুপম সৌন্দর্য্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

এই মসজিদ যখন নির্মাণ করা হয়েছিল তখন ৫ কাতারের ১০০ জন মুসল্লী একসঙ্গে নামাজ আদাল করতে পারত। বর্তমানে মসজিদটি সমপ্রসারণ করায় এখানে একসাথে এক হাজার মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেন।

বৃটিশ শাসনামলে চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদ বৃটিশ সেনাদের দখলে চলে গেলে এবং সেখানে বৃটিশ সৈন্যদের গোলা বারুদের গুদাম তৈরি করায় তখন এখানকার মুঘলমানরা কদম মোবারক মসজিদে নামাজ আদায় করতেন।

পুনশ্চ: চট্টগ্রামের প্রথম ও শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিটিজি টাইমসে ”শুক্রবারের বিশেষ প্রতিবেদন” এ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় মসজিদ গুলোর উপর বিশেষ প্রতিবেদন। আপনি ও লিখতে পারেন আপনার পাশের ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় মসজিদ নিয়ে। ছবি সহ লিখা পাঠাবেন আমাদের মেইলে। 

আরো… 

Print Friendly and PDF

———