চট্টগ্রাম, রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ , ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ভারতের নাগরিকত্ব আইন

আরেকটি রোহিঙ্গা-সঙ্কট সৃষ্টি আশঙ্কা বাংলাদেশের

নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ৮:১৫ : অপরাহ্ণ

ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে নয়া দিল্লির সম্পর্কে টানাপড়েন জন্ম দিয়েছে। ফলে আরেকটি রোহিঙ্গা সঙ্কট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের ভারত সফর বাতিলের তালিকায় সর্বশেষ যোগ হন উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। গত সপ্তাহে তার ভারত সফর করার কথা ছিল। তার এক মাস আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ভারত সফর বাতিল করলে ঢাকা ও নয়া দিল্লির মধ্যে সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২৯ ডিসেম্বর সীমান্ত এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ এবং ৪০০-এর বেশি অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীর ভারত থেকে ফিরে আসা ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে আশঙ্কা প্রবল করে তোলে।

সিএএ নিয়ে আশঙ্কার যৌক্তিক কারণ হলো গত আগস্টে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) প্রকাশের পর দেখা যায় এ রাজ্যের ২০ লাখের বাংলাভাষী মানুষের নাম তালিকায় স্থান পায়নি। এদের ভাগ্য এখন আপিল আদালতে ঝুলছে। চূড়ান্তভাবে যারা বাদ পড়বে তাদের স্থান আপাতত হবে আটককেন্দ্রে।

গত ডিসেম্বরে ভারতের পার্লামেন্ট সিএএ পাস করে। এতে ভারতজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হয়। যা এখন পর্যন্ত ২৫ জনের বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে।

এই আইনে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখা, পার্সি, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের জন্য সহজে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিধান রাখা হয়। বলা হয় যে মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের জন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু কোন মুসলিমকে এই আইনে সুবিধা দেয়া হয়নি। এমন কি মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমান, শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু তামিলদের জন্যও এই ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন ভারতের ২০ কোটির বেশি মুসলমানকে ক্ষুব্ধ করেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের মন্ত্রীদের একের পর এক ভারত সফর বাতিল দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়নের ইংগিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার।

তিনি এই পত্রিকাকে বলেন, বিতর্কিত আইনটি ভারতীয় মুসলমানদের গভীরভাবে আতংকিত করেছে। তারা এখন কারাগারে আটক থাকার ভয়ে আছে। এর ফলে বাংলাদেশমুখি জনস্রোত তৈরি হতে পারে। এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে ১২ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ভারতের এসব লোক বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথায় যাবে?

বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে সিএএ একটি খাঁড়ার মতো বাংলাদেশের মাথার উপর ঝুলে আছে। যেকোন সময় এটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে।

বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সারোয়ার মাহমুদ অবশ্য এই আশঙ্কাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাকে যে আশ্বাস দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে মাহমুদ মনে করেন যে ভারতের এনআরসি বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

এরপরও তিনি বলেন, আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।

ভারতের ক্ষমতাধর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য আরো আশঙ্কার কারণ। তিনি বলেছেন যে সারা দেশে এনআরসি করে অবৈধ অভিবাসীদের ছুঁড়ে ফেলা হবে। তিনি এদেরকে উইপোকা হিসেবে অভিহিত করেন।

বাংলাদেশ স্বারাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, সম্প্রতি ভারত লোকজনকে বহিষ্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনী তা প্রতিহত করেছে। এরপর তিনি বলেন যে গত বছর ভারতে অবৈধভাবে পারি জমানো ৪৪৫ বাংলাদেশী ফেরত এসেছে।

অন্য কর্মকর্তারা বলছেন যে গত নভেম্বর থেকে বাংলাদেশমুখি অভিবাসন বেড়েছে।

গত ২৯ ডিসেম্বর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সীমান্তের ১ কিলোমিটার মধ্যে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশ দেয়। এতে প্রায় এক কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১ জানুয়ারি এই বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হয়।

হোসেন মনে করেন, দিল্লির কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে। আরেকটি উদ্বাস্তু সঙ্কট সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন তিনি।

ভারতের ইস্যুটি রোহিঙ্গার মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। আবার ভারতীয় মুসলমানরা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করার পাশাপাশি বাংলাদেশী হিন্দুরা নগরিকত্বের লোভে ভারতে পারি জমাতে পারে।

Print Friendly and PDF

———