চট্টগ্রাম, বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ , ৬ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ডিস্যালাইনেশন: উদ্বেগ বাড়ছে দ্রুত

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১:২৩ : অপরাহ্ণ

লেখক- ফজলুর রহমান

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একদল বিজ্ঞানী এমনটি ছাঁকনি তৈরি করেছেন যা দিয়ে সমুদ্রের পানি থেকে লবণ আলাদা করে ফেলা সম্ভব। গ্রাফিন দিয়ে তৈরি এই ছাঁকনি ব্যবহার করে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে মিষ্টি পানিতে পরিণত করা যাবে।

বলা হচ্ছে, বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা কারণ এই ছাঁকনিটি সারাবিশ্বে কোটি কোটি মানুষের পরিষ্কার খাবার পানির সঙ্কট দূর করতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবে। ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে সত্তর কোটির মতো মানুষের কাছে পান করার মতো নেই নিরাপদ পানি। জাতিসংঘ বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে এই মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১২০ কোটিরও বেশি।

ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক এই ছাঁকনিটি আবিষ্কার করেছেন। এই গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী বিজ্ঞানী রাহুল নায়ার বলেছেন, সারা বিশ্বে যে কোটি কোটি মানুষের কাছে খাবার পানি নেই, এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে তাদের সামনে সেই সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো। আমরা আশ্বস্ত করতে পারি যে আর কয়েক বছরের মধ্যেই এটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।

এই ছাঁকনিটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে গ্রাফিন অক্সাইড। বলা হচ্ছে, পানি থেকে লবণকে আলাদা করার জন্যে এই উপকরণটি অনেক বেশি কার্যকর।

ড. রাহুল নায়ারদেখিয়েছেন, অন্য একটি রাসায়নিক পদার্থ থেকে তৈরি গ্রাফিন অক্সাইড ব্যবহার করে তারা সমুদ্রের পানি থেকে লবণকে আলাদা করতে সফল হয়েছেন।

এই গ্রাফিনে আছে কার্বন এটমের একটি স্তর এবং এগুলো সাজানো আছে ষড়ভুজের আকৃতিতে। এর আছে অস্বাভাবিক কিছু বৈশিষ্ট্য। যেমন প্রসারিত করা যায় এরকম শক্তি এবং এটি বিদ্যুৎ পরিবাহী।

বলা হচ্ছে, এটি অলৌকিক এক বস্তু এবং ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এই গ্রাফিন হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে সমুদ্রের পানিকে লবণমুক্ত করা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু গ্রাফিনের ছাঁকনিটি হবে সহজলভ্য এবং সস্তা। এই সস্তার বাজারে সমুদ্রের পানি কতোটা ঠিক থাকে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

তবে এইএই মুহূর্তে আরেকটি জ্বলন্ত প্রশ্ন বিশ্বময় উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। তাও সমুদ্রের পানি সম্পর্কিত। সমুদ্রের পানি শোধন নিয়ে এই উদ্বেগ দ্রুতই বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

পানির জন্য ওমানের মানুষ নির্ভর করছে ডিস্যালাইনেশন প্লান্টের ওপর, যেখানে সাগরের নোনা জল শোধন করে পানীয় জল তৈরি হয়। ওমান ছাড়া অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিস্তীর্ণ এলাকা খটখটে রুক্ষ মরুভূমিতে ভর্তি। ফলে সমুদ্র থেকে সুপেয় পানি পাওয়া প্রায় মশা মারতে কামান দাগার মতো অবস্থা। বিপুল খরচ তো আছেই, পরিবেশের পক্ষেও তা অনুকূল নয়।

মাসকাটের দক্ষিণে সুর শহরের বাসিন্দাদের জন্য এবং বাণিজ্যিক কারণে প্রয়োজনীয় পানি আসছে বিশাল ডিস্যালাইনেশন প্লান্ট থেকে। এই প্লান্ট ছয় লাখ মানুষকে সুপেয় পানির জোগান দিচ্ছে। স্থানীয় এক বয়স্ক বাসিন্দা জানালেন, ‘আগে জীবন ছিল যন্ত্রণার। আমাদের কুয়ো ছিল, কিন্তু সেই কুয়োয় পানি আসত ট্রাকে করে। ১৯৯০ সালের পর থেকে পানি আসছে পাইপের মাধ্যমে। আর আমাদের পানির কোনো রেশনিং করতে হচ্ছে না।’

কিন্তু পানির এই সুবিধা পেতে গিয়ে প্রভূত পরিমাণে কার্বন নির্গমন করতে হচ্ছে, যা বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর বাইরে আরো একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। ডিস্যালাইনেশন প্লান্টগুলো ঘন লবণ পানি (ব্রাইন) উৎপন্ন করছে। এ ব্রাইন আরো একবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে সমুদ্রে।

গবেষকরা বলছেন, এমন ১৬ হাজার ডিস্যালাইনেশন প্লান্ট সারা পৃথিবীতে রোজ উৎপন্ন করছে টক্সিক স্লাজ বা বিষাক্ত কাদা। প্রতি এক লিটার স্বচ্ছ পানি পাওয়ার বিনিময়ে সমুদ্রে ফেলা হচ্ছে দেড় লিটার এমন বিষাক্ত লবণাক্ত কাদা। এই অতিরিক্ত লবণ সমুদ্রতীরবর্তী এলাকার পানির তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে এবং বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এর ফলে তৈরি হয় ‘ডেড জোন’ বা মৃত অঞ্চল।

এই অতিরিক্ত লবণাক্ত কাদা আরো বেশি টক্সিক হয়ে পড়ে সমুদ্রের পানিকে লবণহীন করার সময় ব্যবহৃত রাসায়নিকের কারণে। ওমানের প্রতিবেশী দেশগুলো বেশি পরিমাণে ব্রাইন উৎপন্ন করে। সৌদি আরব (২২ শতাংশ), সংযুক্ত আরব আমিরাত (২০ শতাংশ), কুয়েত ও কাতারের পরিমাণ এর চেয়ে কম। এই এলাকার উৎপাদিত সামগ্রিক ব্রাইনের পরিমাণ সারা বিশ্বের ৫৫ শতাংশ।

সুপেয় পানির অভাবে এখন সমুদ্রের পানির দিকে বেশি মাত্রায় অগ্রসর হচ্ছে মানবজাতি। নিত্যনতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এই পানিকে কব্জা করে ফেলছে ক্রমেই। সমুদ্রের পানি শোধনজনিত রাসায়নিকের ভয়াবহতা এরই মাঝে দৃশ্যমান। বলা হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধবে পানি নিয়ে। জলে-স্থলে পানি নিয়ে বিপুল কারবার সারাবিশ্বে। ফলে ভুল ব্যবহার, অপব্যবহার, অনধিকার ব্যবহার নিয়ে নানা উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। বিশ্বযুদ্ধের দামামা থামেনি। পানি প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে লাফিয়ে। তাই নিরাপদ রূপরেখায় এগিয়ে যাওয়া ছাড়া রক্ষা নাই।

লেখক- ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

Print Friendly and PDF

———