চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২০ , ২৬শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পাঁচ শ বছরের পুরোনো সীতাকুণ্ডের হাম্মাদিয়া মসজিদ

প্রকাশ: ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ৪:১৯ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ছোট কুমিরা ইউনিয়নের মসজিদ্দা গ্রামে অবস্থিত হাম্মাদিয়ার মসজিদ সুলতানী আমলে নির্মিত প্রাচীন মসজিদ।এটাকে চট্টগ্রাম জেলার এখনও বর্তমান মসজিদগুলোর মাঝে দ্বিতীয় প্রাচীন মসজিদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে গোলািপ রঙের এক গম্বুজের হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ। এলাকার লোকজনের কাছে ‘গায়েবি’ মসজিদ নামে পরিচিত।

২০১২ সালে প্রকাশিত ইটারনাল চিটাগাং বইয়ে হাম্মাদিয়া মসজিদকে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় প্রাচীন মসজিদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, হাম্মাদিয়া দিঘির পশ্চিম পারে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে অবস্থিত এ মসজিদ।সরকারিভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় অনন্য এটি এখন ক্ষতির মুখে।

পঞ্চাশ-এক’শ কিংবা দু’শ-তিন’শ নয়; অনেকটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের হামিদিয়া বা হাম্মাদিয়া মসজিদটি পৌনে ৫’শ বছরের প্রাচীন সুলতানী যুগের ঐতিহাসিক নিদর্শন।

বাংলার শেষ হোসেন শাহী বংশের সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৫৩৩-১৫৩৮) সময় তৎকালীন চাটিগ্রাম বা চাটগাঁও বন্দর শহরের ১২-১৩ মাইল উত্তর-পশ্চিমে ৭নং কুমিরা ইউনিয়নের মসজিদিয়া গ্রামে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদ স্থাপনের পর গ্রামের নামকরণ হয় মসজিদিয়া, স্থানীয়ভাবে উচ্চারিত বিকৃত নাম মসজিদ্দা।

এর অনতিদূরে (আধমাইল পূর্বে) চট্টগ্রামের পর্বতশ্রেণী ও রেলপথ, প্রায় একই দূরত্বে পশ্চিমে সন্দ্বীপ চ্যানেল ও বঙ্গোপসাগর। মসজিদের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক।

মসজিদটি ১০.৩৭ একর বিশিষ্ট একটি দীঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত, পাশে গড়ে উঠেছে একটি কবরস্থান। দীঘিটি হাম্মাদিয়া দীঘি নামে সুপরিচিত।

চট্টগ্রামের প্রাচীন মসজিদের যেগুলি এখনও বর্তমান, তার মধ্যে এটি দ্বিতীয়। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্যে হাটহাজারীর ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট ফকিরের মসজিদ প্রাচীনতম, এর নির্মাণকাল ১৪৭৪-৮১ খ্রি., সুলতান শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের সময় (১৪৭৪-১৪৮১)।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুল করিমের মতে ‘হাটহাজারীর ফকিরের মসজিদ এবং কুমিরার হাম্মাদের মসজিদের স্থাপত্যরীতি একই, প্রভেদ এই যে, হাটহাজারী মসজিদ বড় এবং কুমিরার মসজিদ ছোট। –সুলতানী আমলে কুমিরা থেকে হাটহাজারী পর্যন্ত একটি রাজপথ ছিল। এই দুইটি মসজিদ এই রাস্তার দুই প্রান্তে অবস্থিত ছিল। সুতরাং বলা যায় যে, কুমিরা মসজিদের নির্মাতা প্রকৌশলীরা হাটহাজারী মসজিদের স্থাপত্য শিল্পের দ্বারা প্রভাবিত হয়।

মসজিদটির ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থান সত্বেও দীর্ঘকাল ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের অগোচরে থেকে যায়।

১৯৬৬ সালে ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম (১৯২৮-২০০৭) সড়কপথে ঢাকা যাবার পথে মসজিদটি তাঁর নজরে আসে ও মসজিদে স্থাপিত শিলালিপির পাঠোদ্ধারপূর্বক এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষণাপত্রে প্রকাশ করেন।

‘মসজিদটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি বর্গাকার ইমারত (বাইরের দিকে এর প্রতি বাহু ৬.৩৪ মিটার) এবং এর বাইরের চার কোণায় আছে চারটি সংযুক্ত চোঙ্গাকৃতির গোলাকার বুরুজ।

রয়েছে মেহরাবের বাইরের দিকে একটি গোলাকৃতির বৃহৎমিনার ও এর উপরে স্থাপিত ক্ষুদ্রাকৃতির বুরুজ। চতুর্পাশের মিনারগুলোর ব্যাস সমান হলেও মেহরাবের বাইরের মিনারটির ব্যাস বেশি। মসজিদের দেয়াল পৌনে ৪ হাত পুরু এবং তা পলেস্তার (আগে নিশ্চয়ই তা ছিল না) ও চুনকাম করা।

‘মসজিদের পূর্ব দেওয়ালে তিনটি খিলান দরজা এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালের প্রত্যেকটির মাঝে একটি করে জানালা আছে। প্রতিটি দরজার বাইরে ও ভেতরে রয়েছে দুটি সূঁচ্যগ্র পাথরে খিলান-ফ্রেম এবং দু’য়ের মধ্যে আছে টোলের মত খিলান ছাদ।

‘মসজিদের ভিতরে উত্তর এবং দক্ষিণ উভয় দেওয়ালেই একটি করে বড় কুলুঙ্গী আছে। এগুলো দেয়া হয় জিনিষপত্র রাখা ও বাতি জ্বালানোর কাজে ব্যবহারের জন্য।

‘আদিতে উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দেয়ালের জানালাগুলোতে পোড়ামাটির ফলক ছিল। কিন্তু বর্তমানে এগুলোর পরিবর্তে লোহার গ্রিল বসানো হয়েছে।

মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি পাথরের মেহরাব আছে মধ্যবর্তী প্রধান মেহরাব পার্শ্ববর্তী মেহরাবের চেয়ে আকারে বড়। ‘মধ্যবর্তী এবং ডান দিকের মেহরাব একটি সম্পূর্ণ পাথরের কাঠামোতে (Frame) তৈরি, বামদিকের মেহরাব শুধু ইটের তৈরি।

মূলতঃ হয়ত এটিও পাথরের কাঠামো ছিল।

উল্লেখ্য, প্রধান মেহরাবের কাঠামোতে (দুই পাশে) পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উৎকীর্ণ করা আছে, সুরা আল ইমরান- ৩য় পারা। আয়াতটি নিম্নরূপ- ‘শাহেদাল্লাহু আন্‌হু লাইলাহা ইল্লা হুয়া, ওয়ালমালায়েকাতু ওয়া উলুল ইল্‌মে ক্বায়েমান বিলকিশ্‌তে, লাইলাহা ইল্লা হুয়াল আজিজুল হাকিম।’ অর্থ- আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই।

ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও স্বাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ্‌ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। মেহরাবের বাঁ দিকে উৎকীর্ণ আয়োতের নীচের দিকে পাঠযোগ্য কিন্তু ডান দিকে অ-পাঠযোগ্য-অস্পষ্ট।

প্রধান মেহরাবের উপরের অংশে কলেমা শাহাদাত এবং নীচে কলেমা ত্যৈয়বা- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাছুলুল্লাহ’ উৎকীর্ণ, তবে শেষের কলেমাটি পরবর্তীতে খোদিত বলে মনে হয়।

মসজিদের ‘মধ্যবর্তী এবং ডানদিকের খিলানের কুলুঙ্গীর (Alcove) ভিতরে শৃঙ্খল এবং ঘন্টা খোদাই করা হয়েছে, ঘণ্টা আয়তাকৃতির, বাংলাদেশের সুলতানী আমলের অন্যান্য অনেক মসজিদের ন্যায় গোলাকার নয়।

উল্লেখ্য , সুলতানী আমলের মসজিদ স্থাপত্যগুলোর অলংকরণের মধ্যে পোড়ামাটির নকশা, মিনা করা টালি এবং পাথরে খোদাই করা নকশা দেখতে পাওয়া যায়। এই সময়কার স্থাপত্য-ইমারতের গায়ের অলংকণশৈলীর অধিকাংশই প্রকৃতি থেকে নেয়া।

এছাড়া লক্ষ্যনীয় সাধারণ অলংকরণশৈলী, তন্মধ্যে সুক্ষ্ম ইটের নকশা, লতাপাতা, পদ্মফুল ঝুলন্ত প্রদীপ ও ঘন্টা-শিকলের নকশা। আদিতে হাম্মাদিয়া মসজিদের মেহরাবের অলংকরণাদিতে প্রকৃতিগত রং দেয়া থাকলেও বিভিন্ন সময় মসজিদ কমিটির লোকেরা ইচ্ছেমত নানান রঙে রঞ্জিত করেছে, তদুপরি বর্তমানে এতে লাল, সবুজ, নীল, কলমা রং দেখে বুঝবার উপায় নেই এর আদি রূপ ও রং।

এ মসজিদের নির্মাণ বৈশিষ্ট্য এমনই যে, তা কেবল সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করেনি, বর্ষাপ্রবণ বাংলাদেশে ভারী বর্ষণ থেকেও অনিন্দ্যসুন্দর এই ইমারতকে রক্ষা করছে। ছোটপান্ডুয়া মসজিদ, আদিনা মসজিদ, দরসবাড়ি মসজিদ, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও বাঘা মসজিদে এসব অলংকরণ দৃশ্যমান।

মসজিদিয়া গ্রামের এই মসজিদটির কোণগুলো মজবুত করার জন্যে যে বরুজ সংযোজন করা হয়েছে তা বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। এক বুরুজ থেকে অন্য বরুজ পর্যন্ত টানা ছাদ প্রায় ধনুকের মত বাঁকা এবং বাংলায় প্রচলিত কুঁড়েঘরের অনুকরণে তৈরি, যাতে বৃষ্টির পানি তাৎক্ষণিকভাবে নিচে গড়িয়ে পড়তে পারে।

‘মসজিদটির ছাদ ক্রমানুযায়ী বক্রাকারে তৈরি এবং এর উপরে স্থাপন করা হয়েছে কন্দাকৃতির একটি বড় গম্বুজ। এ গম্বুজটির মূল চারদিকে চারটি স্কুইঞ্চের সাহায্যে নির্মিত অষ্টভূজের উপর স্থাপিত। মসজিদের সামনের দিকের দেয়ালে দরজার উপর পাথরে খোদাইকরা আরবী তুঘরা হরফের এক খানা লিপি রয়েছে।

‘পাথরখানি কাল (black basalt) এবং ইহার মাপ ২’-৪” *১’-২” এবং এতে দুই লাইন লেখা রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত শিলার অধিকাংশ লিখা নষ্ট হয়েছে। মনে হয় কোন দুষ্কৃতকারী ইচ্ছে করেই লেখাগুলো নষ্ট করে দিয়েছে।

মসজিদের নাম হামিদিয়া মসজিদ। চট্টগ্রামের স্থানীয় লোকেরা বলেন হাম্মাদিয়া বা হাম্মাইদ্যা মসজিদ। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রকাশ হামিদ খাঁ ছিলেন ‘চাটিগ্রাম’ শাসনকর্তা। তিনিই এই মসজিদের নির্মাতা আর তাঁর নামেই নামকরণ হামিদিয়া মসজিদ। কিন্তু নামটি বিকৃতিপ্রাপ্ত হয়ে হাম্মাদিয়া- হাম্মাইদ্যা- হার্মাইদ্যা প্রভৃতি নামে পরিচিত লাভ করে। খোদ গ্রামের নাম বিকৃতিপূর্বক মসজিদিয়া হয়েছে মসজিদ্দা। চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদে স্থান-নাম বিকৃতির উদাহরণ নেহায়েত কম নয়।

পৌনে পাঁচ শ’ বছরের প্রাচীন এই মসজিদ বারে বারে অপরিকল্পিতভাবে সংস্কার, চুন-রঙ লাগানোসহ সম্প্রসারণের কবলে পড়েছে। প্রতিবারেই হাতুড়ি-শাবলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। মসজিদটি এত প্রাচীন ও গৌরবময় ইতিহাসের নিদর্শন যে স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকেই অবগত নন। তার ভ্রমণে মসজিদ কমপ্লেক্সের (ঈদগাহ, হেফজখানা, মক্তব, এতিমখানা, কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও কবরস্থান) প্রবেশপথের বড় বড় করে লেখা-‘মসজিদটি মোগল যুগের নিদর্শন।’

পুনশ্চ: চট্টগ্রামের প্রথম ও শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিটিজি টাইমসে ”শুক্রবারের বিশেষ প্রতিবেদন” এ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ গুলোর উপর বিশেষ প্রতিবেদন। আপনি ও লিখতে পারেন আপনার পাশের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ নিয়ে। ছবি সহ লিখা পাঠাবেন আমাদের মেইলে। 

আরো… 

Print Friendly and PDF

———