চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ , ৯ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

নবম-দশমে ২০২২ থেকে উঠে যাচ্ছে বিভাগ

প্রকাশ: ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ৯:০৪ : পূর্বাহ্ণ

এত দিন নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগ বেছে নিয়েছে। কিন্তু নবম-দশম শ্রেণিতে এই বিভাগ বিভাজন আর থাকছে না। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত যেমন শিক্ষার্থীরা সব বিষয় পড়ে, তেমনি আগামীতে নবম-দশমেও পড়বে সব বিষয়ই।

তবে একাদশ-দ্বাদশে এই বিভাজন থাকবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে চালু থাকা পাঠক্রমের আলোকে দেশে চালু হচ্ছে এ গুচ্ছভিত্তিক কারিকুলাম। এতে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তরে সব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে পারবে। এ ছাড়া দুই বছর মেয়াদি হবে প্রাক-প্রাথমিক স্তর।

পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারিক কার্যক্রমের ওপর জোর দিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নের পরিমাণ বাড়ানো হবে।  ২০২১ সাল থেকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পাঠ্যক্রমে এই পরিবর্তন আনা হবে।

তবে শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞরা নবম-দশমে বিভাগ বিভাজন তুলে দেওয়াকে সাধুবাদ জানালেও সতর্ক না থাকলে হিতে বিপরীত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে কয়েক শিক্ষক বলছেন, বিভাগ বিভাজন তুলে দিলে এই স্তরের শিক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ নিলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

এনসিটিবি জানিয়েছে, নতুন পাঠ্যক্রম নিয়ে পুরোদমে কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কারিকুলাম উন্নয়ন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দফায় দফায় কর্মশালা করা হয়েছে। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক এক বছর থাকলেও ২০২১ সাল থেকে দুই বছর করা হচ্ছে। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তা চূড়ান্ত হবে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। এরপর ২০২১ সালে প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিশুরা নতুন কারিকুলামে তাদের পাঠ্যবই হাতে পাবে।

২০২২ সালে প্রাথমিকের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের সপ্তম, নবম এবং উচ্চ মাধ্যমিকের একাদশ শ্রেণির পাঠ্যবই হাতে পাবে শিক্ষার্থীরা। আবার ২০২৩ সালে পঞ্চম, অষ্টম, দশম এবং দ্বাদশ শ্রেণির নতুন কারিকুলামের পাঠ্যবই হাতে পাবে শিক্ষার্থীরা। আগামী বছর পর্যন্ত বিদ্যমান শিক্ষাক্রমের পাঠ্যই পড়বে শিক্ষার্থীরা।

কারিকুলাম পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে নবম-দশম শ্রেণিতে। এই স্তরে বিভাগ বিভাজন তুলে দিয়ে গুচ্ছ পদ্ধতি চালু হবে। ফলে এ স্তরে বিজ্ঞান, মানবিক বা বাণিজ্য নামে কোনো বিভাগ থাকবে না। সবাইকে সব বিষয় পড়তে হবে। এতে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তরে সব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করবে।

রাজধানীর নামী স্কুল ভিকারুনন্নিসা নূনের এক শিক্ষক জানান, নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকলে উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে বিজ্ঞান বিভাগ নিলে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়বে শিক্ষার্থীরা। কারণ বর্তমানে নবম-দশম শ্রেণিতে কিছুটা হলেও বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু রপ্ত করে তারা। এরপরও একাদশে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞান বিভাগ দুর্বোধ্য মনে হয়। আর এই স্তরে যে সিলেবাস রয়েছে, তাও অনেক বড়। এতে কিছুটা দুর্বল শিক্ষার্থীরা এইচএসসিতে খারাপ ফল করতে পারে।

নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘নতুন কারিকুলাম নিয়ে কাজ চলছে। সে অনুযায়ী বইও পরিবর্তন করা হবে। আগামী ২০২১ সাল থেকেই শিশুরা নতুন কারিকুলামের বই হাতে পাওয়া শুরু করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সব শ্রেণির পাঠ্যবই পরিবর্তন হয়ে যাবে। কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।’

জানা গেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়েও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পাঠ্যবইয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থা, জঙ্গিবাদ, নিরাপত্তা বিষয়গুলো যুক্ত করা হবে। শ্রেণিকক্ষে পড়ার পাশাপাশি কাজটি করে দেখানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। যুক্ত থাকবে খেলাধুলাও। এছাড়া পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা ও নম্বরও কমিয়ে আনা হবে। বাড়ানো হবে শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়নের পরিমাণও।

এদিকে বর্তমানে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু রয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম তৈরি করা হচ্ছে দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ধরে; যা শুরু হবে শিশুর চার বছর বয়স থেকে। এর মধ্যে চার থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিকের একটি স্তর (সম্ভাব্য নাম কেজি-১) এবং পাঁচ বছর থেকে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত আরেকটি স্তর (সম্ভাব্য নাম কেজি-২) হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে ২০১৬ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যদের নিয়ে একই বছরের ২৫-২৬ নভেম্বর কক্সবাজারে দুদিনের আবাসিক কর্মশালা হয়। এতে শিক্ষাবিদরা বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। সেই সুপারিশমালা বাস্তবায়নে কয়েকটি সাব-কমিটিও গঠন করা হয়।

শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা সাব-কমিটি ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর ৮ দফা প্রস্তাব করে। প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ পাঠ্যবইয়ের কিছু বিষয় বাধ্যতামূলক এবং কিছু বিষয় ঐচ্ছিক রাখা। এ ছাড়া বর্তমানে চালু থাকা তিন বিভাগের প্রায় সব বিষয় সব শিক্ষার্থীই যেন পড়তে পারে, সেভাবে কারিকুলাম প্রস্তুত করার প্রস্তাব করা হয়।

এ বিষয়ে শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘দশম শ্রেণি পর্যন্ত সবাইকে একই বিষয় পড়ানোর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বিষয় নির্ধারণে সতর্ক থাকতে হবে, অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে কতটুকু পড়ানো হবে। অন্যথায় হিতে বিপরীত হতে পারে।’ -দেশ রূপান্তর

Print Friendly and PDF

———