চট্টগ্রাম, রোববার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ , ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দেশের পঞ্চম ধর্ম হিসেবে রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন পাচ্ছে ‘শিখ ধর্ম’

সাউথ এশিয়ান মনিটর প্রকাশ: ১১ নভেম্বর, ২০১৯ ৪:০৫ : অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে পঞ্চম ধর্ম হিসেবে রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন পেতে যাচ্ছে ‘শিখ ধর্ম’। গত জুলাইয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত একটি আবেদন করেছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় গুরুদুয়ারা ব্যবস্থাপনা কমিটি। শিগগিরই এ নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে আভাস পেয়েছেন তারা। ধর্মটির প্রবর্তক গুরু নানকের জন্মের ৫৫০তম বছরে এ নিবন্ধন অর্জনের সম্ভাবনায় উল্লসিত স্থানীয় শিখরা।

এদিকে, বাংলাদেশে শিখ ধর্মের নিবন্ধনপ্রাপ্তিকে মাইলফলক হিসেবে দেখছেন ব্যবস্থাপনা কমিটি সভাপতি পরেশ লাল বেগী। তিনি বলেন, “গুরু নানক শাহীজি হিন্দু ধর্মের কুংস্কার বিলোপে কাজ করেছেন। আমরা তার বাণী ধারণ করছি। এমনই একটা সময়ে রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছি যখন আমরা তার জন্মের ৫৫০ বর্ষপূর্তি পালন করছি। এটা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক।”

বাংলাদেশে বর্তমানে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিবন্ধিত চারটি ধর্ম হলো: ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান।

এদিকে শনিবার (৯ নভেম্বর) কার্তারপুর করিডোর ভারতীয় শিখদের জন্যে খুলে দিয়েছে পাকিস্তান। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তার নেতৃত্বে ভারতীয় শিখ প্রতিনিধি দল কার্তারপুর করিডোর দিয়ে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে অবস্থিত গুরুদুয়ারা কারতারপুর সাহিবে যান। ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ নভোজিৎ সিং সিধুও অনর্ভুক্ত ছিলেন এ দলে ।

এরপরও দেশ দুটির মধ্যে গুজব, সন্দেহ, উসকানি এবং উত্তেজনার কমতি নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এখানে নীরবে নিয়ম মেনে প্রতিদিন সকালে গুরুদুয়ারাগুলোতে চলে প্রার্থনা (জাপোজি সাহেব), শুক্রবার চলে কির্তন, গ্রন্থসাহেব পাঠ ও প্রার্থনা। সবশেষে ‘গুরু লঙ্গর’ বা সার্বজনীন সাধারণ ভোজনশালা। যেখানে এক কাতারে সামিল হন স্থানীয় কিংবা বিদেশি শিখ, হিন্দু ও অন্য ধর্মের মানুষ। যাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আরেক পিঠস্থান বলছেন পরেশ লাল বেগী। তিনি বলেন, “আমরা এখানে নিরব এবং নিরাপদ।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থিত ‘গুরুদুয়ারা নানকশাহী’ বাংলাদেশে শিখদের প্রাচীন গুরুদুয়ারা। আয়তনে বেশি বড় নয়, এক গম্বুজ বিশিষ্ট ছোট একটি স্থাপনা, সঙ্গে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা। নতুন করে বানানো আরও কয়েকটি ঘর। সব মিলিয়ে এটিই এখন তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়।

গত ১ নভেম্বর (শুক্রবার) ওখানে দিয়ে দেখা গেল গুরুদুয়ারা জুড়ে প্রায় ৪০০ অনুসারি, ভক্ত এবং দর্শকের উপস্থিতি। কির্তন, গ্রন্থসাহেব পাঠ এবং প্রার্থনার পরপরই মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে পরেশ লাল জানান, গুরু নানক শাহীর ৫৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনের (১৩-১৫ নভেম্বর) অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির কথা। বলেন, ১৩ নভেম্বর ভোর থেকে টানা ১৫ নভেম্বর বেলা ১১টা পর্যন্ত চলবে গুরু গ্রন্থসাহেবের অখণ্ড পাঠ। এর পরে চলবে কির্তন, বৃহত্তর লঙ্গর। এ উপলক্ষে ভারতের পাঞ্জাব থেকে যোগ দেবেন ৪৫ জন পুরোহিত ও অতিথি।

তিনি আরো জানান, প্রতিবছর কার্তিকের পূর্ণিমায় এ অনুষ্ঠানটির আয়োজন হয়ে থাকে। এবারও তাই হচ্ছে। তবে সবকিছু মিলিয়ে এ বছরের আয়োজনে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হতে যাচ্ছে।

ঢাকার বাংলাবাজারসহ তাদের মোট গুরুদুয়ারার সংখ্যা ৫টি। বাকি তিনটির দুইটি চট্টগ্রামে এবং একটি ময়মনসিংহে। পাঞ্জাব থেকে আসা পুরোহিত ও অতিথিরা ১৬ তারিখ যোগ দেবেন চট্টগ্রামের চকবাজার গুরুদুয়ারা ও পাহাড়তলী গুরুদুয়ারায়। ১৭ তারিখে তারা যাবেন বাংলাবাজারের গুরুদুয়ারা সঙ্গতটোলায় এবং ১৮ তারিখে ময়মনসিংহের নানক মন্দিরে।

এই পাঁচটি গুরুদুয়ারারই নিয়ন্ত্রণ ভারতের পাঞ্জাবস্থ সংস্থা ‘কারসেবা সারহালি’র হাতে। পুরোহিত-স্টাফদের সম্মানী-ভাতা এবং গুরুদুয়ারাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ২০০৪ সাল থেকে বহন করছে ওই সংস্থা। শুক্রবারের গুরু লঙ্গর স্থানীয়দের দান-অনুদানে চলছে এবং তা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গুরুদুয়ারাতেই।

পরেশ লাল জানান, ‘কারসেবা সারহালি’ থেকে মাস প্রতি খরচ আসে দুই লাখ টাকার মতো এবং গুরু লঙ্গরের জন্য প্রতি সপ্তাহে খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা।

তথ্যমতে, বাংলাদেশে শিখ জনগোষ্ঠির সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এদের বেশিরভাগের বসবাস ঢাকায়। এরপরও তাদের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়ে না কেন জানতে চাইলে পরেশ লাখ বেগী হেসে বলেন, আমাদের মধ্যেও দুইটা ভাগ আছে। একটা হলো ‘উদাসি’ এবং আরেকটা ‘আকালি’।

তিনি বলেন, দশম গুরু গোবিন্দ সিংয়ের অনুসারি এবং তাদের উত্তরসুরি যাদেরকে আজকে কেশ, দাড়ি, কাড়া, কংগ, ক্রিপান এবং পাগড়ি ধারণ করতে দেখি তারা হলেন ‘আকালি’।

আর ‘উদাসি’ প্রসঙ্গে পরেশ লাল বলেন, শিখ সম্প্রদায়ের যেসব পরিবারের ধারাবাহিকতা গুরু নানকের সময় থেকে চলে আসছে তারা ‘উদাসি’ এবং বাংলাদেশে যারা আছেন তারা সবাই এই ধারার। আমারাও ওই ‘উদাসী’ পন্থী। ঢাকার নবাবপুরের চিত্রা সিনেমা হলের পিছনের দিকে একটি গুরুদুয়ারা ছিল। আমার দাদা মোহন সিং ছিলেন ওই গুরুদুয়ারার প্রতিষ্ঠাতা। যদিও দখল-বেদখলে এখন আর সেটির অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ঢাকার রায়ের বাজার এলাকায়ও একটি ছিল। সেটারও অস্তিত্ব নেই।

প্রসঙ্গত, বাংলাবাজারের শ্রীসদাস লেনে গুরুদুয়ারা সঙ্গতটোলার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শিখ নবম গুরু তেগবাহাদুর। তিনি ১৬৬৬-৬৮ মেয়াদে ওই সঙ্গতটোলার দায়িত্বে ছিলেন। ওখানে বসেই তিনি খবর পান তার ছেলে সন্তান হয়েছে। ওই ছেলেই গুরু গোবিন্দ সিং। যিনি শিখদের দশম এবং শেষ গুরু এবং তিনিই দাবি করেন, তার পরবর্তীতে শিখ জনগোষ্ঠীর কোন গুরু আসবেন না। ‘গ্রন্থ সাহেব’ই গুরু হিসেবে বিবেচিত হবে।

Print Friendly and PDF

———