চট্টগ্রাম, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২০ , ২২শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বিশ্বজুড়ে আগামী প্রজন্মের সামনে অপুষ্টির হুমকি

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ২:০২ : অপরাহ্ণ

আগামী প্রজন্মকে দীর্ঘস্থায়ী রোগ (ক্রনিক ডিজিজ) থেকে রক্ষা করতে হলে গর্ভধারণের আগে গর্ভধারণকালে মায়ের অপুষ্টি দূর করতে হবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গর্ভধারণকালে অপুষ্টির শিকার হলে সেই মা অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেন ওই শিশু সারা জীবনে সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারে না 

এতো গেল মাতৃপুষ্টির কথা। ধরা যাক, মাতৃপুষ্টির চাহিদা মিটে গেল। কিন্তু এরপরও কি নিরাপদ পুষ্টিতে থাকবে পরবর্তী প্রজন্ম। সম্প্রতি ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন বড়ভাবে উত্তর দিচ্ছে,-‘না’।

প্রতিবেদনে যাওয়ার আগেই দেখে নিই অপুষ্টি কি? অপুষ্টি –(Malnutrition)  শাব্দিক অর্থে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি (undernutrition) ও বৃদ্ধি (overnutrition) দুটোকেই বুঝালেও পুষ্টির ঘাটতিজনিত অবস্থা বুঝাতেই অপুষ্টি শব্দটি সচরাচর ব্যবহৃত হয়। খাদ্যে এক বা একাধিক বিশেষ করে আমিষ উপাদান এর স্তল্পতা অর্থাৎ সুষম খাদ্য এর দীর্ঘ অভাবই অপুষ্টির অন্যতম কারণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী প্রজন্মের শিশুরা আজীবন ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। বায়ুদূষণজনিত রোগ বাড়বে। গণহারে শস্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় অপুষ্টিতে ভুগবে পুরো প্রজন্ম। এছাড়া ধারাবাহিক বন্যা দাবানলের কারণে মানসিক শারীরিক অসুস্থতায় ভুগবে মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গত ১৩ নভেম্বর ল্যানসেট প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে। ৪৩ পৃষ্ঠার ওই বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংকের মতো জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থাসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৩৫টি একাডেমিক প্রতিষ্ঠান জড়িত

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মধ্যে বেড়ে ওঠা, খাদ্য ঝুঁকি, সংক্রামক রোগ, বন্যা তীব্র তাপের কারণে আজ জন্ম নেয়া শিশুটি সারাজীবনের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে। গ্রিন হাউজ গ্যাস হ্রাসে সব দেশের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ ছাড়া সুস্থতা আয়ুস্কাল ক্ষয় হবে। এককথায় জলবায়ু পরিবর্তন পুরো এক প্রজন্মের স্বাস্থ্য নির্ধারণ করবে।

ল্যানসেট কর্তৃপক্ষ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যারিস চুক্তির পর স্বাস্থ্য খাতের বৈশ্বিক পরিস্থিতিল্যানসেট কাউন্টডাউনউদ্যোগের মাধ্যমে নজরদারি করে। নজরদারির সর্বশেষ তথ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, প্রাকশিল্পযুগে জন্ম নেয়া শিশুর চেয়ে আজকে জন্ম নেয়া শিশুটি ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপ অনুভব করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে শিশুকিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষের ওপর। সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নামাতে না পারলে আজ জন্ম নেয়া শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি আজীবন থাকবে। ১৯৬০ সাল থেকে দেখা যাচ্ছে, খাদ্য উৎপাদন কমছে, যা খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে রেখেছে। ফলে অপুষ্টির হার বাড়ছে। আগামীতে তা আরও বাড়বে

ল্যানসেট কাউন্টডাউনের নির্বাহী পরিচালক নিক ওয়াটস বলেন, আজকের শিশু বৈশ্বিকভাবে গড়ে ৭১ বছরের আয়ু নিয়ে পৃথিবীতে আসছে, অর্থাৎ তার আয়ুষ্কাল হবে ২০৯০ সাল পর্যন্ত। সময়ে শিশুরা ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রায় বড় হবে

বৈশ্বিকভাবে ৬৫ বছরে বা তার বেশি বয়সী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ১৯৯০ সালের চেয়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এলাকার কোনো কোনো দেশে তা ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। আফ্রিকার দেশগুলোয় ২৮ থেকে ৩১ শতাংশ বেড়েছে। তাপমাত্রা আর্দ্রতা বৃদ্ধি মানুষের কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। এতে মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ল্যানসেট বলছে, ২০১৮ সালে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিকভাবে হাজার ৫০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছিল

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলে বন্যা বাড়ছে। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে খরা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। খরা দীর্ঘায়িত হলে পয়োব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফসল কমে যায়। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়, অপুষ্টি বাড়ে। ল্যানসেট বলছে, গত ৩০ বছরে বিশ্বে শীতকালীন গম, চাল ভুট্টার মতো প্রয়োজনীয় শস্যের উৎপাদন অনেকাংশে কমে গেছে

এরই মধ্যে ইউনিসেফ তাদেরদ্যা স্টেট অব দ্যা ওয়ার্ল্ডস চিলড্রেন২০১৯শীর্ষক প্রতিবেদনে উদাহরণসহ জানিয়েছে, ভারতের মাত্র ২১ শতাংশ শিশুর খাদ্য তালিকায় সুষম খাবার রয়েছে। পুষ্টির অভাবে অধিকাংশ শিশুই নানা ধরনের জটিল রোগে ভোগে

সেই তালিকায় হাইপারটেনশন, কিডনির জটিল সমস্যাসহ প্রাপ্তবয়স্কদের আরও নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সেসব শিশু।পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজনের শরীরে ভিটামিন , প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের ভিটামিন বি১২ এর ঘাটতি দেখা যায়। রক্ত স্বল্পতায় ভোগে প্রতি পাঁচ জনে দুজন। মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টসের অভাবে রিকেটস, রাতকানা, অন্ধত্বের শিকার হতে হয় শিশুদের

ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ বা এর দক্ষিণ আফ্রিকার পরিবেশ পরিকল্পনা এবং জলবায়ু রক্ষা বিভাগের প্রধান সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, ‘‘মানব ইতিহাসের জন্য আগামী কয়েকটা বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়৷ আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি, আপনাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়েছি৷ এখন প্রতিটি দেশের সরকারের দায়িত্ব নিজেদের দায়িত্ব পালন করা৷আইপিসিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভয়াবহতা খুব দ্রুতই টের পাবে বিশ্ববাসী৷ গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক জেনিফার মর্গান বলেছেন, ‘‘বিজ্ঞানীরা অদূর ভবিষ্যতের জন্য যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেসব ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটতে শুরু করেছে৷

তাই বলতে হয়, অশুভ কিছু ঘটার আগেই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে বেঁচে থাকার উপযোগী বিশ্ব গঠনে অবহেলার অবকাশ নেই আমাদের আগামী প্রজন্ম একটা সুন্দর পৃথিবী পাক, সেজন্য আমাদের এখনই ভাবতে হবে 

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। 

Print Friendly and PDF

———