চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ , ২রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বিপদ: চুরি হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতও!

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ৩ অক্টোবর, ২০১৯ ১২:০৬ : অপরাহ্ণ

লেখক- ফজলুর রহমান

“আমার প্রজন্ম বায়ুমন্ডল থেকে তোমাদের উৎপাদিত শত বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড ফুসফুসে ভরে নিচ্ছে। তোমাদের সংখ্যার হিসাব সে প্রজন্মকে বিবেচনায় নেয় এমন প্রযুক্তির ওপর ভর করে, যার অস্তিত্ব বলতে গেলে নেই।

কাজেই আমাদের কাছে, যাদের বাস করতে হয় নানাবিধ পরিণামের কথা ভেবে, তাদের কাছে ৫০ শতাংশ ঝুঁকি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

তোমাদের কী উদ্যম! তোমরা বলতে চাও, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিময়ের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং প্রযুক্তিগত কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান যথারীতি হয়ে যাবে।

নিঃসরণ আজ যে পর্যায়ে রয়েছে তার নিরিখে বলা যায়, কার্বন ডাই-অক্সাইডসংক্রান্ত বাজেটের অবশিষ্টাংশ সাড়ে আট বছরের কম সময়ে নিঃশেষিত হয়ে যাবে।

তোমরা আমাদের ব্যর্থ করে দিচ্ছ। কিন্তু তরুণসমাজ তোমাদের বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি বুঝে নিতে শুরু করেছে। সব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দৃষ্টি তোমাদের দিকে নিবদ্ধ।

তোমরা যদি আমাদের ব্যর্থ করে দিতেই সচেষ্ট থাকো, আমি বলছি, আমরা তোমাদের কখনো ক্ষমা করব না। পালাতে চাও! আমরা তোমাদের পালাতে দেব না।

এখানে এই মুহূর্তে আমরা দাগ টেনে দিলাম। বিশ্ব জাগছে। পরিবর্তন ঘনিয়ে আসছে—সে পরিবর্তন তোমাদের পছন্দ হোক বা না হোক।”

কথাগুলো বলেছেন সুইডেনের কিশোরী গ্রেটা থানবার্গ। জলবায়ুর পরিবর্তন রোধে যথাব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে একাই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি অভূতপূর্ব, অনন্য এক পদ্ধতিতে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিংসঘে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সে দৃশ্যও দেখেছে অনেকে। বিশ্বব্যাপী কিশোর-তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি।

মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী। কিন্তু যখন কোনো হল কিংবা সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন তখন উপস্থিত সবার চেয়ে পরিপক্ব হয়ে ওঠে তার হৃদয়। জলবায়ু ইস্যুতে তার শক্তিশালী উচ্চারণ আলোড়ন তুলেছে সারা বিশ্বে।

একাত্ম হয়েছে বিভিন্ন দেশের লাখো শিক্ষার্থী। গত বছরের আগস্টে একা একাই শুরু হয়েছিল তার আন্দোলন। বছর শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ২৫ জন কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানের সময় বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গ্রেটা থানবার্গ বলেন, ‘আমার এখানে থাকার কথা নয়।

আটলান্টিকের ওপারে আমার স্কুলে ফিরে যাওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘আপনাদের ফাঁকা বুলি আমার শৈশব চুরি করে নিয়েছে।’

গ্রেটা থানবার্গ বলেছেন, শৈশব চুরি হয়ে প্রাপ্ত বর্তমানের কথা।তবে আশংকা এই যে, এভাবে চলতে থাকলে চুরি হয়ে যাবে আমাদের ভবিষ্যতও।

কারণ আইপিসিসির প্রতিবেদন মতে, প্রতি বছর বাড়বে সাগরের পানি। আরো বেশি ভুগবে মানুষ।

পরিবেশবিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সেই দুর্ভোগের দিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন প্রতিবছরই একবার করে সাগরের পানির উচ্চতা বাড়বে এবং বিশ্বের অনেক উপকূলের মানুষ এর শিকার হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন রোধে মানুষ কোনো চেষ্টা করুক বা না করুক, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে এ প্রবণতা শুরু হয়ে যাবে। অথচ একসময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা খুব বেশি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটত ১০০ বছরে মাত্র একবার।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তসরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে এ সংস্থা। এর আগের দিন মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি আইপিসিসিতে পাস হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে গত এক বছরে এ নিয়ে তিনটি প্রতিবেদন প্রকাশ করল আইপিসিসি। এর আগের দুটি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, এ শতকের শেষ নাগাদ তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে মানুষ কিভাবে ওই পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াতে পারবে এবং ভূভাগের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের কেমন প্রভাব পড়তে পারে।

এবারের প্রতিবেদনে সাগর ও মেরু অ লের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।

সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দ্রুত বরফ গলে গিয়ে সাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রণেতাদের অন্যতম একজন ড. জ্যঁ পিয়েরে গাতুসো বলেন, ‘এ নীল গ্রহ এই মুহূর্তে চরম বিপদের মধ্যে আছে। বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন রকম দুর্ভোগ ধেয়ে আসছে এবং এর জন্য আমরাই দায়ী।’

১৯৭০ সাল থেকে বিশ্ব যে ক্রমাগত উত্তপ্ত হচ্ছে, এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত। আর এ বাড়তি উত্তাপের ৯০ শতাংশ শুষে নিচ্ছে সাগর। ১৯৯৩ সালের পর থেকে সাগরের তাপমাত্রা শোষণের হার দ্বিগুণ হয়েছে।

শিউরে ওঠার মতো আরো তথ্য আছে। ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১.১ মিটার পর্যন্ত বাড়বে। সব মিলিয়ে অচিরেই পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে, তাতে নিচু উপকূলীয় এলাকার ৭০ কোটি মানুষের আবাসস্থল বিপন্ন হবে।

প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা আশার কথাও শুনিয়েছেন। তবে সেই আশা বাস্তবায়নের জন্য গ্রিনহাউস নিঃসরণ রোধে মানবজাতিকে বড় ধরনের সাফল্যের পরিচয় দিতে হবে।

তাঁদের মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের হার যদি ৪৫ শতাংশ কমানো যায়, তবে মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিকুলকে বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন কিছু কিছু অ লের আবহাওয়ার সংকটময় অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তুলবে এবং উপকূলীয় অ লে বসবাসকারী মোটামুটি ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে আরও বেশি হুমকির মুখে ফেলবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। আমাদের দেশ এমনিতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মেগা শপিং সেন্টার।

আমাদের দেশের লাখ লাখ নাগরিক নানা সময়ে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দাবদাহ ও খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে আসছে। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অনেক অংশ ডুবে যাবে।

তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এরই মধ্যে অসময়ে অনাবৃষ্টি, বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়সহ অতি গরম আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে। যখন আবহাওয়া আরো উত্তপ্ত হবে তখন সমুদ্রের পানি আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠতে থাকবে। দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে অতিবাহিত হতে পারে।

এই গ্রহটিকে বাসযোগ্য রাখতে হলে বঙ্গোপসাগরের তীর থেকে আসা ডাক শুনতে হবে আটলান্টিকের ওপাড়কেও। পৃথিবীকে বানাতে হবে- ছোটদের, বড়দের, সকলের।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার কথাগুলো আজ কতই না প্রাসঙ্গিক! গ্রটা থানবার্গ-এর কন্ঠে যেন সুকান্তেরই সুর।“এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার।”

লেখকঃ ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

Print Friendly and PDF

———