চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ , ২রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ফেনী নদীতে ভারতের ৩৪ অবৈধ পাম্প!

শুষ্ক মৌসুমে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ উত্তর ফটিকছড়িতে দেখা দেয় পানিশূন্যতা

করিম শাহ, রামগড় (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি প্রকাশ: ৮ অক্টোবর, ২০১৯ ১১:৪৩ : পূর্বাহ্ণ

২০১০ সালের জানুয়ারীতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের সচিব পর্যায়ে ভারতের ত্রিপুরা সাব্রুম পানীয়জল প্রকল্পের জন্য ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানির জোর দাবী করে আসছিলো ভারত যার প্রতিফলে গত শনিবার মানবিক দিক বিবেচনা করে দিল্লিতে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ।

কিন্তু ভারত সরকার ১৯৮২ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত খাগড়াছড়ির রামগড়ের লাচারিপাড়া থেকে মিরসসরাইয়ের অলিনগর সীমান্ত পয়েন্টে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিদ্যুৎ চালিত উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন প্রায় ৩৪টি লো-লিফট পাম্প দিয়ে ফেনী নদীর থেকে একতরফা ভাবে দৈনিক অর্ধশত কিউসেক (১ কিউসেক সমান সেকেন্ডে ২৮ লিটার প্রবাহ) পানি তুলে নিচ্ছে ভারত।

এতে করে খাগড়াছড়ির রামগড়, মাটিরাঙ্গা, চট্টগ্রামের উত্তর ফটিকছড়ির ভূজপুর ও মিরসরাইয়ের প্রায় সহস্রাধিক গ্রাম শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমিতে পরিণত হয় এবং ৭০ শতাংশ ফেনী নদীর পানি নির্বর মহুরী প্রজেক্টের সেচ কাজ মারাত্বক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এ নিয়ে ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতের এক তরফা পানি উত্তোলন বন্ধ ও নতুন পাম্প স্থাপন না করতে গুইমারা বিজিবি সেক্টরের (ভারপ্রাপ্ত) কমান্ডার লে. কর্ণেল জাহিদুর রশিদ পিএসসি এর নেতৃত্বে বিএসএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়া হয়েছিলো যাতে বিএসএফের পক্ষে নেতৃত্ব দেন ডিআইজি যাবদ সিং।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখাযায়, খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার লাচারীপাড়া ও ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমার বৈষ্ণবপুর সীমান্ত, রামগড় পৌরসভার বল্টুরামটিলা ও ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমার কাঁঠালছড়ি, রামগড়ের মহামনি ও ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমার দোলবাড়ী এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে দিয়ে বিদ্যুৎ চালিত প্রায় ৩৪টি লো-লিফট উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ৭-৮ ইি ব্যাসের পাইপ দিয়ে ফেনী নদীর পানি তুলে বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ করছে ভারত।

প্রতিটি পাম্প হাউস নদী থেকে ৪০ থেকে ৫০ গজ দূরত্বে স্থায়ীভাবে ঘর নির্মান করে স্থাপন করা হয়েছে। ফেনী নদীর পাড় কেটে ড্রেন করে সবুজ রঙ্গের বড় পাইপ বসিয়ে উপরে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। মানুষের নজর এড়াতে ঐ পাম্প হাউজের পাশে বসানো হয়েছে বিএসএফ ফাঁড়ি এবং পাম্প হাউজ কেন্দ্রিক নিয়মিত থাকছে বিএসএফের টহল। বাংলাদেশের বাধা উপেক্ষা করে বছরের পর বছর অবৈধভাবে পানি তুলে নিচ্ছে ভারত।

এদিকে তাঁদের একচেটিয়া পানি তুলায় শুস্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায় ফেনী নদী। ফলে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, রামগড়, চট্টগ্রামের মিরসরাই, ফেনীর ছাগলনাইয়া, পশুরাম, সোনাগাজী, মহুরী সেচ প্রকল্প সহ আশপাশের বিভন্ন উপজেলার ৮ থেকে ৯ লাখ হেক্টর ফসলি জমিতে শুস্ক মৌসুমে চাষাবাদের আওতায় আসার কথা থাকলেও নদীর পানি শূন্যতার কারনে অর্ধেক ফসলি জমিতে চাষ করা সম্ভব হয়না।

সূত্র মতে, ফেনী নদী ১১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এরমধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমার্ন্তে রয়েছে প্রায় ৭০ কিলোমিটার। গত ২০১২ সালের ৫ মার্চ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ পূর্বা লের চীফ ইঞ্জিনিয়ার মোঃ ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম সীমান্তবর্তী শহর দোলবাড়ী এলাকা পরিদর্শন করে। অন্যদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চীফ ইঞ্জিনিয়ার তপন লোদ এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলকে তাদের প্রকল্প বিষয়ে সরেজমিনে অবহিত করেন।

সর্বশেষ গত ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতের সাব্রুমে বিএসএফ ডিআইজি যাদব সিং এর সঙ্গে ফেনী নদীর পানি ব্যবস্থা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী খ ম জুলফিকার তারেক কে নিয়ে বৈঠক করেন গুইমারা বিজিবি সেক্টরের (ভারপ্রাপ্ত) কমান্ডার লে. কর্ণেল জাহিদুর রশিদ পিএসসি।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, আইন অনুযায়ী সীমান্ত থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কেন স্থাপনা নির্মান করা অবৈধ। সেখানে এসকল স্থাপনা নির্মান করে ভারত বিভিন্ন পয়েন্টে পানি উত্তোলন করছে আর এ বিষয়ে বিজিবি থেকে একতরফাভাবে পানি উত্তোলন বন্ধ ও নতুন করে ফেনী নদীতে ভারতের যে কোন ধরণের পাম্প হাউজ স্থাপন বন্ধ রাখাতে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়।

খাগড়াছড়ি পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, সীমান্ত আইন লংগন করে একতরফা ভারত অবৈধভাবে ভারত ফেনী নদীর পানি দিয়ে সাব্রুম শহরের চেস কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অংশে পাম্প স্থাপন করতে গেলে ভারতীয় সীমান্ত বাহীনি বিএসএফের যত আপত্তি। তিনি আরো বলেন, যেহেতু বাংলাদেশ মানবিক বিষয়টি বিবেচনা করে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি দিতে সমঝোতা স্বারকে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সেহেতু এরআগে অবৈধভাবে নির্মিত ৩৪টি পাম্প এবার প্রত্যাহর করা হোক।

উল্লেখ্য, ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ভারত এ নদীর উৎপত্তিস্থল তাঁদের দেশে বলে দাবি করছে। ভারতের তরফ থেকে বলা হয় এ নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা রাজ্যে অথচ অনুসন্ধান ও সরেজমিনে দেখা গেছে, এর উৎপত্তি মাটিরাঙ্গার ভগবানটিলায়। নদীর ১০৮ কিলোমিটারের কোন অংশ ভারতের অভ্যান্তরে প্রবেশ করেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্যা লের মানুষ প্রায় পাহাড়ের ছড়া, নদী-খাল, পাতাকৃপ উৎস থেকে পানি ব্যবহার করে জীবন ধারণ করে। ভারতের উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন পানির পাম্প বসিয়ে ফেনী নদী থেকে পানি উত্তোলনের ফলে বাংলাদেশের রামগড়, মাটিরাঙ্গা, উত্তর ফটিকছড়ি, ভূজপুর ও মিরসরাইসহ একধিক নদী শুকিয়ে যায় কমে যায় মহুরী নদীর পানির স্থর। ভারতের দীর্ঘ দিনের দাবিতে যেহেতু বাংলাদেশ ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি দিতে সম্মত হয়েছে তাই পূর্বে অবৈধভাবে স্থাপন করা ৩৪টি পাম্প প্রত্যাহর করে বাংলাদেশের নায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

তাই সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে প্রদক্ষেপ নিয়ে মাতামহুরী প্রজেক্টসহ পার্বত্যা লের মানুষ অপুরণীয় ক্ষতি রোধে ফেনী নদী থেকে ভারতে অবৈধভাবে উত্তোলনকৃত ৩৪টি পানির পাম্প বন্ধ করনের জোর দাবী জানিয়েছেন।

Print Friendly and PDF

———