চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ , ২রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে কারা?

প্রকাশ: ১ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:৪২ : পূর্বাহ্ণ

শওকত ওসমান রবিবার সকালে এক কেজি দেশি পেঁয়াজ কেনেন ৭৫ টাকা দরে। রাতে বাসায় ফিরতেই তার স্ত্রী আরও কিছু পেঁয়াজ কিনে আনার জন্য বলেন। তিনি তখন একই দোকানে গিয়ে হাজির হন। কিন্তু দোকানদার প্রতি কেজি ৯০ টাকার নিচে বিক্রি করবেন না।

কারণ কী? দোকানি জানান, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। পাইকার তাকে জানিয়েছে কাল (সোমবার) পেঁয়াজের পাইকারি দাম হবে ৮৫ থেকে ৯০ টাকা।

এরপর শওকত ওসমান আরও কয়েকটি দোকান ঘুরে শেষমেশ ৮৫ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনে বাসায় ফেরেন।

দোকানির কথার প্রতিফলন বাজারে দেখা গেল পরদিন সোমবার সকালে। পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকার ওপর। সকালে ১০০ টাকা বিক্রি হলেও সন্ধ্যায় তা উঠে যায় ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। দাম আরও বাড়তে পারে বলে দোকানিরা বলে দিচ্ছেন ক্রেতাদের।

রাকিবুল ইসলাম নামে একজন বেসরকারি চাকুরে গতকাল সকালে পেঁয়াজ কেনেন ১০০ টাকা দরে। পাইকারদের উদ্ধৃতি দিয়ে তাকে দোকানি জানান, মঙ্গলবার (আজ) আরও বাড়বে পেঁয়াজের দাম।

গতকাল সন্ধ্যায় ফোনে কথা হয় মামুন নামে একজন দোকানির সঙ্গে। তিনি জানান, তার দোকানে যা ছিল তা ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি সন্ধ্যায় খিলক্ষেত বাজারে গিয়ে দেখেন ভারতীয় পেঁয়াজ ১১০ আর দেশি পেঁয়াজ ১২০ টাকা কেজি দাম চাইছেন বিক্রেতারা।

চকবাজারের বাসিন্দা নাসিরউদ্দীন সকালে খুচরা বাজার থেকে ১১০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ কিনেছেন। কোনো কোনো বিক্রেতা ১২০ টাকা কেজিও চাইছিলেন তার কাছে।

ভারত থেকে আমদানি বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক দিনে কেন কেজিপ্রতি ৩০-৪০ টাকা বেড়ে যাবে পেঁয়াজের দাম? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। আর ভারত না দিলেও মিয়ানমার, তুরস্ক বা অন্য দেশ থেকে আমদানি করা হবে। ইতিমধ্যে তুরস্ক থেকে বেশ কিছু পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবি ৪৫ টাকা কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করছে।

বিক্রেতাদের বক্তব্যে জানা যাচ্ছে মূলত পাইকারদের কারণে খুচরা পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা উঠে যায়। তারা খুচরা বিক্রেতা ও দোকানিদের ১০০ টাকার নিচে পেঁয়াজ না বেচতে পরামর্শ দিয়ে সতর্ক করেছে পেঁয়াজের দাম আরও বাড়বে।

খুচরা পেঁয়াজ বিক্রেতা হাসানুজ্জান। তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) পাইকারি বাজারে ৮৫-৯০ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। পাইকাররা ১০০ টাকার নিচে বেচতে নিষেধ করেছে। তারা জানিয়েছে দাম আরও বাড়বে, বেচার দরকার নাই। এ দামে পরে আর কিনতে পারব না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শ্যামবাজারের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী রুনা বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইলিয়াস দোহাই দেন আমদানিকারকদের। তিনি বলেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজ আগে থেকে সংকট। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় ঘাটতির পরিমাণ আরও বাড়বে, এমনটাই জানিয়েছে আমদানিকারকরা।

মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘আমরা আমদানিকারকদের কাছ থেকে প্রতিদিন পেঁয়াজ এনে বিক্রি করে। আজ (সোমবার) সকালে ৮০-৮৫ ধরে পাইকারি বিক্রি করেছি। কিন্তু যেখান থেকে কিনি সেখান থেকে জানিয়েছে আমাদেরই কিনতে হতে পারে ৯০ টাকা। আমরা কী করব বলেন? আমাদের কোনো হাত নেই দাম বাড়া-কমার ক্ষেত্রে।’

সরকারি ভাষ্যে পেঁয়াজের মজুদ থাকা, ইতোমধ্যে দুটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছে গেছে, তাহলে দাম কেন বাড়বে জানতে চাইলে ইলিয়াস বলেন, জাহাজ থেকে কন্টেইনার ঢাকায় পৌঁছাতে সময় লাগবে। প্রতিদিন যে পরিমাণ ভারত থেকে আসত সেটির অভাব তো পূরণ হবে না। আমরা কোনো মাল মজুদ রাখি না। কারণ কাঁচামাল ধরে রাখলে পচে যাবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আমদানিকারকদের সিন্ডিকেটেই দাম বাড়ছে। তারা ইচ্ছা করেই পেঁয়াজের সংকট সৃষ্টি করছে।

এদিকে, গতকাল বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন বলেছেন, ‘দেশীয় পেঁয়াজ ও আমদানিকৃত পেঁয়াজ মিলিয়ে মজুত সন্তোষজনক। মনে করি এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। যারা পেঁয়াজের বাজার দর বাড়ানোর চেষ্টা করছেন এর কোনো যুক্তি নেই। যারা মজুত করবেন এবং বাজারকে অস্থির করার চেষ্টা করবেন তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখানে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

তিনি বলেন, ‘দেশি পেঁয়াজের মজুদ যথেষ্ট রয়েছে। মজুত পরিস্থিতি জানতে ১০টি টিম পাঠাচ্ছি। যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে এসব টিম ১০টি জেলায় যাবে, যেখান থেকে বেশিরভাগ পেঁয়াজ আসে। এছাড়া বিভিন্ন স্থলবন্দর যেমন- বেনাপোল, বাংলাবান্ধাসহ বিভিন্ন বন্দরে আমাদের কর্মকর্তারা থাকবেন, তাদের কাজ হবে মনিটরিং করা। কারণ পেঁয়াজ পচনশীল দ্রব্য, সবাইকে এ মেসেজ দেয়। এটা রাখার দরকার নেই দ্রুত ছেড়ে দিতে হবে। কারণ পাইপলাইনে আমদানি করা পেঁয়াজ আছে। ফলে দেশের বাজারে জোগান সচল থাকবে।’

জাফর উদ্দীন বলেন, ‘টিসিবিকে আমরা নির্দেশ দিয়েছি এতদিন তারা ১৬টি ট্রাকে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এখন সেটা বাড়িয়ে ৩৫টি ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি করবে। আমরা সবসময় মনিটরিং করছি। আশা করছি, আগামীকাল (মঙ্গলবার) বা দ্রুত এর সুফল পাওয়া যাবে। আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত রয়েছে। ভোক্তা অধিকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ চারটি টিম কাজ করছে।’

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে যাতে পেঁয়াজ নিয়ে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আমরা কৃষি ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নিচ্ছি। আমাদের ঘাটতি খুব বেশি নয়। যেহেতু আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ কাজেই পেঁয়াজ, রসুন, আদা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পদক্ষেপ নিয়েছি। যাতে ভবিষ্যতে আমদানির দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়।’

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের খবরে একটু সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘আমরা বসে নেই। এ বিষয় নিয়ে আজ (সোমবার) সকালে বসেছিলাম। একটি ভালো খবর হলো, মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আনার যে প্রক্রিয়া ছিল সেটার দুটি জাহাজ এসে পৌঁছেছে নৌবন্দরে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি জাহাজের পেঁয়াজ গতকাল (রবিবার) খালাস হয়েছে। একটি জাহাজ আজ (সোমবার) খালাস হবে।’

মিয়ানমার থেকে দুটি চ্যানেলে পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা বর্ডার ট্রেড হিসেবে আসে টেকনাফ দিয়ে। এটা চলমান। একটা হলো ফরমাল চ্যানেলের মাধ্যমে নৌবন্দর দিয়ে। এছাড়া তুরস্ক ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আনার প্রক্রিয়া চলমান। আসতে যতটা সময় লাগতে পারে। তবে সময়টা আমি বলতে চাচ্ছি না। যেকোনো মুহূর্তে আসতে পারে।’

ভারত সরকার সম্প্রতি প্রতি মেট্রিক টন পেঁয়াজের মিনিমাম এক্সপোর্ট প্রাইজ (এমইপি) নির্ধারণ করে দেয়। আগে প্রতি মেট্রিক টন পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ২৫০ থেকে ৩০০ ডলার থাকলেও গত ১৩ সেপ্টেম্বর তা বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার পুননির্ধারণ করেছে ভারত। সর্বশেষ ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার পুরোপুরি পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে।- ঢাকাটাইমস

Print Friendly and PDF

———