চট্টগ্রাম, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ , ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সমুদ্রের ঢেউ হবে বিপুল জ্বালানির উৎস

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১২:৫৪ : অপরাহ্ণ

লেখক- ফজলুর রহমান

পর্তুগালের আন্দ্রেয়াস হেগার একটি তোয়ালে ঝাঁকিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে ঢেউ তোয়ালেজুড়ে ছড়িয়ে গেল। এ ক্ষেত্রে ঝাঁকানোর ফলে সৃষ্টি হওয়া শক্তি স্থানান্তরিত হলো। আন্দ্রেয়াস মনে করিয়ে দিলেন যে ঢেউ আসলে এমন এক শক্তি, যা স্থানান্তরিত হয়।

কিন্তু তোয়ালের মধ্যে ঢেউয়ের সঙ্গে পানির ঢেউয়ের মিল কোথায়? মিল অবশ্যই আছে। তোয়ালে হোক অথবা পানি, ঢেউ কিন্তু ভর নয়। শুধুই শক্তি, যা স্থানান্তর করা হয়। সৈকতে ঢেউয়ের সেই চরিত্র বোঝা যায় না। এ ক্ষেত্রে পানি আসলে শুধু পরিবহনের মাধ্যম।

সার্ফাররা যখন তাঁদের বোর্ডের ওপর অপেক্ষা করেন, এটা অনেকটা সে রকম। পানির অণুও সেভাবে খুব কম নড়াচড়া করে। ঢেউ অবশ্য আরো দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে।

সমুদ্রে ঢেউ সৃষ্টিকারী এ শক্তি কোথা থেকে আসে? জোয়ার-ভাটা অবশ্যই এর অন্যতম কারণ। চাঁদের প্রভাবে সমুদ্রের পানি সব সময় চলমান অবস্থায় থাকে। চাঁদের অভিকর্ষের ফলে জোয়ার ও ভাটা হয়। তখন ঢেউয়েরও সৃষ্টি হয়।

তবে মূলত বাতাসের সাহায্যেই ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। বাতাসের শক্তি ও তার স্থায়িত্ব এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বাতাসই পানির অণুগুলোকে গতিশীল করে তোলে। ঠিক হেয়ার ড্রাইয়ার যেভাবে কৃত্রিম বাতাস সৃষ্টি করে ঢেউয়ের জন্ম দিতে পারে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ডয়চে ভেলে’র প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মহাসাগরের মধ্যে সৃষ্টি হওয়ার পর ঢেউ প্রায়ই সারা দিন ধরে কয়েক’শ কিলোমিটার যাত্রা করে উপকূলের দিকে ধেয়ে যায়। দীর্ঘ ও চ্যাপ্টা পানির ঢেউ ছোট ও উঁচু ঢেউয়ের তুলনায় আরো দ্রুত এগিয়ে যায়। কারণ সেগুলো নিজস্ব শক্তিতেই রাশ টানতে পারে। ঢেউয়ের মধ্যে পানির অণু চক্রাকার হয়ে ঘুরতে থাকে।

এ চক্রাকার ঘূর্ণন পানির আরো গভীরেও চলতে থাকে। পানি যত গভীর হয়, অণুগুলোর কক্ষপথ ততই ছোট হতে থাকে। ঘূর্ণমান পানির কণাগুলো যখন সমুদ্রের তলদেশে মাটির ওপর আছড়ে পড়ে, তখন তাদের গতি থমকে যায়। এর প্রভাবও টের পাওয়া যায়। তখন শ্যালো ওয়াটার ওয়েভ সৃষ্টি হয়। সার্ফিংয়ের উপযুক্ত ঢেউও আসলে শ্যালো ওয়াটার ওয়েভ।

নিচের পানির অণু সমুদ্রের তলদেশে থমকে গেলেই সেই অবস্থা সৃষ্টি হয়। ওই সময় ওপরের কণাগুলো বিনা বাধায় ঘুরতে থাকে। এর ফলে লাগামহীন পানির অণুগুলো আরো বেশি ওপরের দিকে ধেয়ে যায়। সার্ফিংয়ের উপযুক্ত ঢেউ তখন সমুদ্রতীরে এসে ভেঙে পড়ে। সার্ফারদের জন্য সেটা হলো আদর্শ অবস্থা।

তবে আদর্শ ঢেউ কিন্তু সময় মেনে চলে না। সে কারণে আন্দ্রেয়াস হেগার সন্ধ্যাবেলায়ও পানির ওপর কেরামতি দেখাতে থাকেন। আর এইসব কারিকুরি থেকেই আসছে নতুন জ্বালানি শক্তির আইডিয়া।

আমরা জানি, বাতাস, সূর্যের আলো ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি আহরণ এখন আর কষ্টকল্পিত কোনো ব্যাপার নয়। এবার স্পেনের আটলান্টিক উপকূলের ছোট গ্রাম মুট্টিকুতে সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ তৈরির প্রকল্প চালু হয়েছে।

ওই গ্রামে পাঁচ হাজার মানুষের বাস। সমুদ্রতট, মাছ ধরার ট্রলার, শখের প্রমোদতরি অর্থাৎ ইয়ট—সব মিলিয়ে ছবির মতো এক নিসর্গ। কেউ যদি হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হয়, সে ভাবতেই পারবে না যে এ রকম একটা ছোট গাঁয়ে আছে অতি আধুনিক এক বিদ্যুৎ প্রকল্প।

সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করছে এই ওয়েভ জেনারেটর প্ল্যান্ট। গত জুলাইয়ে চালু হয়েছে এ প্রকল্প। প্রায় ৬০০ বাসিন্দাকে সরবরাহ করা হচ্ছে এ বিদ্যুৎ।

সমুদ্রের পারে বসানো আছে কংক্রিটের এক স্থাপনা, তাতে মোট ১৬টি খোলা কুঠুরি। জেনারেটরের সঙ্গে লাগানো আছে টার্বাইন। সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউ যখন এসে আছড়ে পড়ে, বাতাস ঢুকে যায় সবেগে ওই শূন্য কুঠুরিগুলোতে। বাতাস ওপরে উঠে যায়। তার শক্তিতে টার্বাইনগুলো ঘুরতে থাকে। তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

কিছু পরীক্ষামূলক প্রকল্পে এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়েছে মুট্টিকুর এ ওয়েভ এনার্জি প্ল্যান্টটিই। টার্বাইনগুলো সরবরাহ করেছে জার্মান একটি কম্পানির স্কটিশ অঙ্গ সংস্থা।

প্রকল্পের বাকি অংশ তৈরি করেছে স্থানীয় বাস্ক কম্পানি। প্রায় সাত মিলিয়ন ইউরো ব্যয় হয়েছে মুট্টিকুর এ প্রকল্পে।

বাস্ক অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কম্পানি ইভের প্রধান হাভিয়ের মার্কেস বলেছেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষেত্রে মুট্টিকু একমাত্র মডেল প্রকল্প হয়ে থাকবে না। আমরা বাস্ক অঞ্চলের সমুদ্রের ঢেউয়ের একটা অ্যাটলাস তৈরি করেছি।

কোন জায়গার ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা বেশি তার হিসাব করে নিয়েছি আমরা। আমরা মনে করছি, এ প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা বাস্ক অঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারব।’

সমুদ্রের ঢেউ বেশির ভাগ মানুষেরই মন ভালো করে দেয়। অনেকে সেই পানিতে গা ভাসাতে ভালোবাসেন। কেউ বা করেন সার্ফিং। কিন্তু পদার্থবিদ্যার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঢেউয়ের সংজ্ঞায় আমরা জ্বালানি শক্তির নতুন উৎসও পাচ্ছি।

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার,চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

Print Friendly and PDF

———