চট্টগ্রাম, রোববার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ , ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পৃথিবী বাঁচাতে ‘স্কোপেক্স’: জলবায়ু নিয়ে জুয়া!

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১০:১৭ : পূর্বাহ্ণ

লেখক- ফজলুর রহমান

১৯৯১ সালে ফিলিপাইনে মাউন্ট পিনাটুবো আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এই অগ্ন্যুৎপাতের ফলে প্রায় ৭০০ মানুষের মৃত্যু হয় । এই ঘটনায় বাস্তুহারা হয় আরও অন্তত দুই লাখ মানুষ। তবে বিশাল এই অগ্ন্যুৎপাত বিজ্ঞানীদের একটি পরীক্ষায় খুব কাজে লাগে। সেবার আগ্নেয়গিরির ওই অগ্ন্যুৎপাতে বায়ুমন্ডলের স্ট্রেটোস্ফিয়ার স্তরে রাসায়নিক মেঘ ছড়িয়ে পড়েছিল।

মাউন্ট পিনাটুবো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে প্রায় ২ কোটি টন সালফার ডাইঅক্সাইড উদগীরণ হয়ে এই গ্রহের উপরিভাগে বেরিয়ে আসে। একপর্যায়ে সালফিউরিক এসিডের ফোঁটা ফোঁটা কণারূপে এগুলো পৃথিবীর চারপাশে ভেসে বেড়াতে থাকে। প্রায় এক বছর ধরে এমন পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল।

সালফিউরিক এসিডের ওই কণাগুলো ভাঙা আয়নার টুকরোর মতো কাজ করছিল। কারণ এগুলোতে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে উল্টোপথে ফিরে যাচ্ছিল। এর ফলে দেখা যায়, সেবার পৃথিবীর তাপমাত্রা দেড় বছরের জন্য অন্তত হাফ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গিয়েছিল।

গবেষকদের এই পর্যবেক্ষণ পৃথিবীর উষ্ণায়ন ঠেকাতে অনুপ্রেরণা জোগায়। অন্তত ১০০টি অ্যাকাডেমিক পেপারে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সালফিউরিক এসিডের কৃত্রিম মেঘ সৃষ্টি এবং এ থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ঘটনাটি উদাহরণ হিসেবে আনা হয়।

বিজ্ঞানীরা স্কোপেক্স পরিকল্পনাটিরও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন এই বিশাল প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে। Stratospheric Controlled Perturbation Experiment নামে এই ঐতিহাসিক প্রজেক্ট। সংক্ষেপে যাকে বলা হচ্ছে SCoPEx (স্কোপেক্স)।সূর্যের অতিরিক্ত রশ্মিকে পৃথিবীর বুকে পড়তে না দিয়ে বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে আবার মহাকাশেই ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমাতে পারে স্কোপেক্স।

পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা গত ১০০ বৎসরে ০.৫ সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবী পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা বাড়বে ১.৫-২.০ সেন্টিগ্রেড বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। ২১০০ সালের মধ্যে গড় তাপমাত্রা ১.৮ সেন্টিগ্রেড থেকে ৬.৩ সেন্টিগ্রেডের মতো বৃদ্ধি পেতে পারে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার বৃদ্ধির এই প্রবণতাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (Global Warming)। গ্রীন হাউস এফেক্ট তথা ওজোন স্তরের ক্ষয়ের কারণে পৃথিবীতে অতিরিক্ত সূর্য রশ্মির প্রবেশ হওয়ায় পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

তাই বহুদিন ধরে বিশ্ব উষ্ণায়ন রোখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, আন্তর্জাতিক সেচ্ছাসেবী সংস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সরকার। কিন্তু দ্রুত কার্যকর করা যাবে এমন কোনও পদক্ষেপ দেখতে পাওয়া যায়নি। এরইমাঝে কৃত্রিম উপায়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন কমাবার জন্য কয়েকবছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা।

পৃথিবীকে সুরক্ষা দেওয়ার এই প্রকল্পটি কোনো ছোটখাটো প্রকল্প নয়। এই প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এই মহৎ গবেষণায়, বিজ্ঞানীদের পাশে ব্ল্যাঙ্ক চেক নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন ৬৩ বছর বয়সী পৃথিবীর দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী এবং মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিলিয়নিয়ার বিল গেটস। সেবামূলক কাজে দানের অঙ্কে, যিনি ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় উঠে এসেছেন।

পৃথিবীর তাপমাত্রা কমিয়ে দেওয়ার এই স্কোপেক্স পরিকল্পনাটি সায়েন্স ফিকশন মনে হতে পারে। কিন্তু মাত্র এক দশকের মধ্যে সত্যি সত্যিই এই পরিকল্পনাটি পৃথিবীর পরিত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। পরিকল্পনাটি সফল হলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হবেন বিজ্ঞানীরা।

স্কোপেক্স কিভাবে কাজ করবে?

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৮০০ বিশাল আকারের আকাশযানে করে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বায়ুমন্ডলের ১২ মাইল ওপরে নিয়ে যাওয়া হবে কয়েক মিলিয়ন টন চক পাউডার। পরে এই পাউডার বায়ুম-লের স্ট্রেটোস্ফিয়ার স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

ভূ-পৃষ্ঠের ১০ মাইল ওপর থেকে ৬০ মাইল পর্যন্ত শূন্যস্থানকে বলা হয় স্ট্রেটোস্ফিয়ার। এই স্ট্রেটোস্ফিয়ারে ছড়িয়ে দেওয়া চক পাউডার বিশাল আকারের একটি সানশেড বা ছায়া তৈরি করবে, যা সূর্যের রশ্মিকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো আটকে দেবে। শুধু তাই নয়, বিশাল এই সানশেডে আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে আবারও মহাশূন্যে ফিরে যাবে।

প্রকল্পের কাজ হার্ভার্ডে
প্রকল্পটি নিয়ে কাজ করছেন আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। কয়েক মাস আগেই শুরু হয়েছে এর কার্যক্রম। শিগগিরই এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে গবেষক দলটি। প্রাথমিক পরীক্ষায় খরচ হবে প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার। এই প্রকল্পের প্রথম পরীক্ষায় ব্যবহার করা হবে অনেক উঁচুতে অবস্থান করতে সক্ষম একটি বেলুন। এই বেলুনে করে পৃথিবী থেকে ১২ মাইল ওপরে নিয়ে যাওয়া হবে দুই কেজি পরিমাণ ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের গুঁড়া বা চক পাউডার। আমেরিকার নিউ মেক্সিকোর একটি মরুভূমি অঞ্চল থেকে পরীক্ষাটি চালানো হবে।

বিজ্ঞানীরা ঠিক করেছেন, প্রথম বেলুনের সাহায্যে ২ কিলোগ্রাম ওজনের ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের গুঁড়ো বিশেষ পদ্ধতিতে স্প্রে করা হবে পৃথিবীর ওপরে থাকা বায়ুমন্ডলীয় স্তর স্ট্রেটোস্ফিয়ারে। ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের গুঁড়ো স্ট্রেটোস্ফিয়ারের এক মাইল দীর্ঘ এবং ১০০ গজ ব্যাসের এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে গিয়ে তৈরি করবে একটা সানশেড। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টাজুড়ে এই বেলুন থেকে চক পাউডারের কৃত্রিম মেঘ প্রবাহিত হবে। বেলুনের পাটাতনে থাকবে কিছু পর্যবেক্ষক সেন্সর। এই সেন্সরগুলো কৃত্রিম মেঘের সূর্যরশ্মি প্রতিফলন ক্ষমতা এবং পাতলা বায়ুস্তরে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে। যে সানশেডে বাধা পেয়ে বেশকিছু পরিমাণ সূর্যরশ্মি আবার মহাকাশে ফিরে যাবে। পৃথিবীর আদর্শ তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য যেটুকু সূর্যরশ্মি প্রবেশের প্রয়োজন ততটুকুই প্রবেশ করবে পৃথিবীতে।

ঝুঁকিও আছে
স্কোপেক্স নিয়ে নানা ঝুঁকিও আছে।বিশেষজ্ঞের একটি দল প্রকল্পের সম্ভাব্য সব ঝুঁকি খতিয়ে দেখছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কোপেক্স প্রকল্পের অন্যতম পরিচালক লিজি বার্নস বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা দারুণ আতঙ্কজনক। তবে এটা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করার জন্য।’ এই প্রকল্প স্থগিত হয়ে যাবে, যদি দেখা যায় যে এটি জলবায়ুতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আশংকা আছে যে, এটি খরা এবং হারিকেনের মতো বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সূচনা করে পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

মাউন্ট পিনাটুবো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে যে ,পরিমাণ কৃত্রিম মেঘের সঞ্চার হয়েছিল সেই পরিমাণ কৃত্রিম মেঘ যদি বিজ্ঞানীরা সৃষ্টি করতে চান তবে এটি সহজ ব্যাপার নয়। প্রথমত এ ধরনের কাজ অনেক ব্যয়বহুল হতে পারে। দ্বিতীয়ত জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেই এটি একটি ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। দেখা যাবে যে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে গিয়ে জলবায়ুর ওপর আরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে গেল।

স্কোপেক্স প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বড় ভয়টি হলো এটি বায়ুমন্ডলের ওজন স্তরকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এ ওজন স্তরই আমাদের সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। অতিবেগুনি রশ্মি মানবদেহের ডিএনএতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এবং ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।

জলবায়ু গবেষকরা এটাও ধারণা করছেন, এ ধরনের কৃত্রিম মেঘ মহাসাগর সঞ্চালন কিংবা জোয়ার-ভাটায় প্রভাব ফেলতে পারে। এই সঞ্চালন আমাদের আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না করলে কিংবা আশঙ্কাগুলো সত্যি হলে পৃথিবীতে চরম মাত্রায় জলবায়ু বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এর ফলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের কৃষিজমি, নিঃশেষ করে দিতে পারে পৃথিবীর প্রাণ-প্রকৃতি এবং পৃথিবীজুড়ে মহামারীও সৃষ্টি হতে পারে। এই ধ্বংসাত্মক ব্যাপার এখানেই থেমে থাকবে না। দেখা যাবে, সূর্যের আলো কমিয়ে দেওয়ার ফলে জলবায়ুতে যে পরিবর্তন হবে তা এক পক্ষকে লাভবান করবে এবং অন্য পক্ষের জন্য বিপদের কারণ হবে।

এই প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা হয়তো আমেরিকার বিস্তীর্ণ মিডওয়েস্ট অঞ্চলের কৃষকদের কৃষি কাজের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেবেন, কিন্তু একই সময়ে অন্য প্রান্তে যেমন আফ্রিকাজুড়ে দেখা দিতে পারে ধ্বংসাত্মক খরা। তাই পৃথিবীর একটি অংশে তাপমাত্রা কমাতে গিয়ে দেখা যাবে অন্য অংশের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। ফলে সমগ্র পৃথিবীর তাপমাত্রা কমানোর পরিকল্পনাটি ভেস্তে যেতে পারে। কারণ পৃথিবীর সব অঞ্চলের জলবায়ুই একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

আরেকটি ব্যাপার হলো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রায় কোনো পরিবর্তন হলে এটা পৃথিবীজুড়ে তাপমাত্রার সুষমবণ্টন ব্যবস্থাকেও বদলে দিতে পারে। এর ফলেও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

পালাক্রমে স্কোপেক্স বৃষ্টিপাতের ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ তাপমাত্রা জলপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাপের ফলেই পানি বাষ্প হয়ে ওপরে উঠে গিয়ে মেঘের সৃষ্টি করে, যা পরে বৃষ্টি হয়ে ভূ-পৃষ্ঠে ঝরে পড়ে। তাপমাত্রা পরিবর্তন এভাবে বৃষ্টির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।

স্কোপেক্সের মাধ্যমে বিশাল আকারের কেমিক্যাল ছায়া বৈশ্বিক আবহাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে তা আপাত অবস্থায় নির্ণয় করতে পারছেন না বিজ্ঞানীরা। জাতিসংঘের আয়োজনে প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়া পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেনোস প্যাজোর নিউ ইয়র্কে মার্কিন সরকারের জলবায়ু সম্পর্কিত একটি প্রকল্পে কাজ করছেন। স্কোপেক্স নিয়ে এক সতর্কবার্তায় প্যাজোর বলেন, ‘যদি আপনি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন এবং এটা যদি খারাপ ফল দিতে শুরু করে কিংবা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তবে এর মাধ্যমে অর্জিত উন্নতি এবং এর ক্ষতিকর ফলাফল সমান হয়ে যেতে পারে। এমনকি এই প্রকল্পটি মানবসভ্যতার কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়েও বেশি ভয়ংকররূপে আবির্ভূত হতে পারে।’

এই প্রযুক্তি বড় বড় যুদ্ধেরও কারণ হতে পারে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সন্দেহ প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। ডেকে আনতে পারে পারমাণবিক যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিও।

উদাহরণস্বরূপ চীনা সরকার এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত প্রযুক্তির বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। দেশের কৃষিজমিগুলোকে রক্ষা করার জন্য তারা তাদের মহাকাশ জ্ঞানের মাধ্যমে স্ট্রেটোস্ফিয়ারে কৃত্রিমভাবে ছায়া সৃষ্টি করার পরীক্ষা চালিয়েছে। তবে এ ঘটনার দুই বছর পর প্রতিবেশী দেশ ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত উধাও হয়ে গিয়েছিল। ফলে সেখানে তীব্র খরার জন্য দুর্ভিক্ষ এবং রোগ-বালাই মহামারী আকার ধারণ করেছিল। ভারতের এই করুণদশা চীনাদের কর্মকান্ডের ফলে হয়েছে এমনটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত না হলেও কোটি কোটি মানুষ তাদেরই দায়ী করেছে।

আরেকটি আতঙ্কের ব্যাপার হলো- স্ট্রেটোস্ফিয়ারে ছায়া তৈরির জন্য স্কোপেক্স নামের এ প্রকল্পটির খরচ ধনী দেশগুলোর কাছে খুব বেশি নয়। এই প্রকল্পে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে অনেক দেশই সক্ষম। ফলে এ প্রযুক্তি নিজেদের অন্যায় কাজেও ব্যবহার করতে পারে দেশগুলো। এটা কোনো দেশ যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে কিংবা ব্ল্যাকমেইল করার জন্যও ব্যবহার করতে পারে। ডেইলি মেইলের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যেমন করে রাশিয়া যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচন এবং সামাজিক মতামতে প্রভাব ফেলছে তেমনি করে এই স্কোপেক্স পদ্ধতি এক দেশ আরেক দেশের ক্ষতির জন্য ব্যবহার করতে পারে।

আশাবাদী হার্ভার্ড বিজ্ঞানীরা
সম্ভাব্য ক্ষতির ব্যাপারগুলো মাথায় রেখেই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, তারা তাদের উদ্ভাবনকে নিরাপদে পৃথিবীর কাজে লাগাতে পারবেন। গবেষক দলের অন্যতম নেতা এবং অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সের প্রফেসর ডেভিড কেইথ বলেছেন, ‘বায়ুমন্ডলে স্বল্প মাত্রায় প্রতিফলক ছায়া সৃষ্টি করার জন্য তাদের প্রকল্পটি অনেক নিরাপদ হবে। যেসব ভয়ংকর আশঙ্কার কথা ভাবা হচ্ছে সেসবের কোনো কিছুই হবে না ধনী দেশগুলোকে এ ধরনের প্রকল্পে এগিয়ে আসা উচিত। এই দেশগুলো মিলিতভাবে একটি ক্লাব তৈরি করতে পারে। এই ক্লাবে তারা অর্থায়ন করবে এবং একটি বৈশ্বিক বীমাব্যবস্থা চালু করবে। যার মাধ্যমে স্কোপেক্স প্রকল্পের মতো কোনো প্রকল্প যদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তবে দুর্বল দেশগুলোকে ক্লাবের তহবিল থেকে সাহায্য করা হবে।’
আরেকটি আশংকা এই যে, বায়ুমন্ডলের স্ট্রেটোস্ফিয়ার স্তরে ছায়া সৃষ্টির প্রকল্প রাজনীতিক এবং শিল্পপতিদের পরিবেশ দূষণে আরও বেশি মাত্রায় উৎসাহী করে তুলবে। তারা মনে করবে যেহেতু একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে তাদের আর কোনো দায় নেই।

আরও একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, তাপমাত্রা কমানোর এই বৈশ্বিক সিস্টেমের সুইচ কীভাবে অফ করা হবে? আর হঠাৎ করেই এটা যখন করা হবে তখন কী কী অপ্রত্যাশিত সমস্যার উদ্ভব হবে?

অনেক গবেষকের মতে, পৃথিবীকে বাঁচানোর এই মহাপ্রকল্প একটি বৈশ্বিক দুঃস্বপ্নের কারণ হতে পারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান জিওগ্রাফি বিষয়ের প্রফেসর এবং জলবায়ুবিষয়ক সরকারি প্রকল্পের সাবেক বিজ্ঞানী মাইক হিউম বলেন, ‘জলবায়ু সমস্যার ক্ষেত্রে আমাদের শিল্পকারখানাগুলো যেভাবে ভূমিকা রাখছে তার ক্ষতিপূরণের জন্য আমরা বিকল্প প্রযুক্তির ওপর ভরসা রাখতে পারি।এই পেঁচানো সমস্যা ‘তাপমাত্রা ঋণ’ ।এটি ক্রেডিট কার্ডের ঋণের মতো যা কখনই পরিশোধ করা যায় না। এটি একটি বিরাট জুয়া। এর চেয়ে এই-ই ভালো যে, কখনো ঋণের পাল্লায় না পড়া।’

এখনো স্কোপেক্স প্রজেক্ট কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষার নাম। প্রকল্পটি নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। নিশ্চিন্ত তো নয়ই। এখনো আশার আলো বলতে এই প্রজেক্টে জড়িয়ে থাকা দুটি নাম। যাদের ওপর ভরসা করা যায়। একটি বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি । অন্যটি অবশ্যই ডায়নামিক ও দানবীর বিল গেটস।

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার,চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

Print Friendly and PDF

———