চট্টগ্রাম, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ , ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

৮০ ছুঁই ছুঁই পেঁয়াজের কেজি

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১১:৩০ : পূর্বাহ্ণ

ভারত রপ্তানি মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দর ৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। তবে কোথাও কোথাও গতকালও ৭০-৭৫ টাকা কেজি দরেও পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা গেছে। ভারতের নির্ধারিত দরে আমদানি করা পেঁয়াজ এখনো বাজারে না পৌঁছালেও আগের কেনা কম দামের পেঁয়াজের দর বাড়িয়ে দিয়েছেন সারা দেশের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। রাজধানীতে পেঁয়াজের পাইকারি বাজার শ্যামবাজার, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি বাজারে গতকাল পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

এদিকে, হঠাৎ করেই পেঁয়াজের দর বৃদ্ধি ও দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় গতকাল জরুরি সভা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের বিক্রয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। তাতে দেশের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে টিসিবির মাধ্যমে দ্রুত মিয়ানমার, তুরস্ক, মিসরসহ অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গত রাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বকশী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পেঁয়াজের বাজার দরের ঊর্ধ্বগতি রোধে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সভাপতিত্বে গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় তিনটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো হলো টিসিবি আজ সোমবার থেকে ন্যায্যমূল্যে ট্রাকসেলের মাধ্যমে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করবে। পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন এবং সুদের হার হ্রাসের প্রয়োজনীয়

উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং বন্দরে আমদানিকৃত পেঁয়াজের খালাস প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন এবং নির্বিঘœ পরিবহন নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ বরাবর পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দর বাড়ার প্রেক্ষাপটে দেশটির সরকার শুক্রবার পেঁয়াজ রপ্তানির সর্বনিম্ন মূল্য টনপ্রতি ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করার পরই বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এক দিনের ব্যবধানে গতকাল চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের পাইকারি দর কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ঢাকার শ্যামবাজারের আড়তগুলোতে গতকাল পাইকারি দর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। আর দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আমদানি হয়। গতকাল সেখানে ট্রাকসেল (পাইকারদের কাছে আমদানিকারকদের বিক্রি) হয়েছে প্রতিকেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা। ওই বন্দর দিয়ে আগে খোলা এলসির বিপরীতে শনিবার ছয় ট্রাক পেঁয়াজ আমদানি হলেও গতকাল কোনো ট্রাক আসেনি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, জরুরিভাবে টিসিবি স্থলবন্দরের আমদানিকারকদের কাছ থেকে সরাসরি কিনে রাজধানীসহ সারা দেশে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করবে। এ পদ্ধতিতে ৭২-৭৩ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারবে টিসিবি। আর এরই মধ্যে মিয়ানমান, মিসরসহ অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিসিবির উপ-ঊর্ধ্বতন কার্যনির্বাহী মো. হুমায়ুন কবির গতকাল বলেন, পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ভারত ছাড়াও মিয়ানমার, তুরস্ক, মিসরসহ অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে টিসিবি প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।

গতকাল ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা দোকান ঘুরে দেখা যায়, দোকানিরা নিজেদের ইচ্ছামতো দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। শাহজাদপুরের মুদি দোকানি প্রিন্স বলেন, দেশি কিংবা ভারতীয় সব ধরনের পেঁয়াজের দরই ৮০ টাকা কেজি। ওই এলাকার অন্য এক দোকানদার জানালেন, ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তিনি। গুলশান গুদারাঘাট কাঁচাবাজারের কয়েকটি মুদি দোকান ঘুরে দেখা গেল কেউ ৭৫ টাকা, আবার কেউ ৮০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। দামের পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলে আনিস নামের এক বিক্রেতা জানান, ভারত পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে। এ কারণে দেশেও বেড়েছে।

গুদারাঘাট কাঁচাবাজারে আসা এক ক্রেতা আব্দুল খালেক বলেন, ব্যবসায়ীরা মনগড়াভাবে দাম নিচ্ছে। নাকাল হচ্ছি আমরা। এই সময়ে বাজারে যাতে সঠিক দামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়, সে বিষয়ে সরকারের বাড়তি নজরদারি দরকার।

রবিবার ঢাকার শ্যামবাজার ও কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের আড়তগুলোতেও দেশি পেঁয়াজ ৬০-৬৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। শ্যামবাজারের আড়তদার হাবিব বলেন, গতরাতে হিলি থেকে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনে আনতে হয়েছে। তাই এখন বেশি দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।

টিসিবির বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজের দর ছিল ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা। সাত দিন আগে এই পেঁয়াজের দর ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। আর এক সপ্তাহ আগে ঢাকার বাজারে দেশি পেঁয়াজের দর প্রতিকেজি ৪৮-৫৫ টাকা থেকে বেড়ে গতকাল ৬০-৭০ টাকা হয়েছে।

আমাদের হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম খোকন জানান, রবিবার থেকে ভারত নির্ধারিত ৮৫০ ডলারে আমদানি শুরু হয়েছে। আর বন্দরে পেঁয়াজের পাইকারি দর বেড়েছে কেজিতে ১৩-১৫ টাকা। গত শুক্রবার বন্দরে প্রতি কেজি পেঁয়াজ প্রকারভেদে ৩৯ থেকে ৪২ টাকা দরে ট্রাকসেল হলেও গতকাল দাম বেড়ে হয়েছে ৫২ থেকে ৫৫ টাকা।

হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক মাহফুজার রহমান ও সাইফুল ইসলাম জানান, আগে খোলা এলসির বিপরীতে শনিবার ছয় ট্রাক পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছিল। রবিবার ৮৫০ ডলার দরে ছয় ট্রাক আমদানি হয়েছে। আমদানিকারকরা লোকসান দিয়ে ৫২ থেকে ৫৫ টাকা দরে পাইকারদের কাছে ট্রাকসেল করেছে।

তারা বলেন, ভারতের নির্ধারিত দরে পেঁয়াজ আমদানি করলে প্রতি কেজির আমদানি মূল্যই পড়বে ৭২-৭৩ টাকা। এত বেশি দরে আমদানির পর তা বিক্রি করা যাবে কি না, তা নিয়েও আমদানিকারকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ফলে পেঁয়াজ আমদানি কমার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, খাতুনগঞ্জে এক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। ভারত পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়ানোর কারণে দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, শুক্রবার পেঁয়াজের পাইকারি দর ছিল ৫০ টাকা। বরিবার সকালেই তা বেড়ে ৬৫ টাকায় পৌঁছেছে। ইরা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী রিতাপ উদ্দিন বলেন, দেশি পেঁয়াজের মৌসুম শেষ হয়েছে। তাই চাহিদা বেড়েছে আমদানি পেঁয়াজের। সে অনুপাতে হিলি থেকে পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ভারত রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই এক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দর বেড়েছে ২০ টাকার কাছাকাছি।

বক্সিরহাটের খুচরা বিক্রেতা নিয়াজুর কাদের বলেন, পাইকারিতে দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। এখন ৭০ টাকা দরে বিক্রি করছি। আগামী সপ্তাহে আরও বাড়তে পারে বলে পাইকাররা আগাম জানিয়ে রাখছেন।

Print Friendly and PDF

———