চট্টগ্রাম, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ , ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রামু সহিংসতার ৭ বছর

সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিহারগুলো অপরুপ স্থাপত্য শৈলীতে পূণ:নির্মাণত

সোয়েব সাঈদ, রামু প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৭:৪৪ : অপরাহ্ণ

২৯ সেপ্টম্বর রামু সহিংসতার ৭ বছর। ২০১২ সালের এই দিনে ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননার একটি ছবিকে কেন্দ্র করে রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পাশে দাড়ায় সরকার। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিহারগুলো অপরুপ স্থাপত্য শৈলীতে পূণ:নির্মাণ করা হয়।

বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও বিহারগুলোর নিরাপত্তায় ব্যাপক উদ্যোগ নেয় সরকার। রামুতে সেই কালো রাতের ভীবিষিকা ভুলে রামুতে সব সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে ফিরে এসেছে সাম্প্রতিক সম্প্রীতি। তবে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয়নি এখনো।

চিহ্নিত অনেক দূষ্কৃতিকারি মামলা থেকে কৌশলে রেহায় পেয়েছে। অথচ পুলিশের দায়েরকৃত মামলায় শত শত নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর রামু ও উখিয়া-টেকনাফে বৌদ্ধপল্লীতে চালানো নারকীয় হামলার ১৮ মামলার একটি বিচারও শেষ হয়নি।

ন্যাক্কারজনক এ ঘটনায় দায়ীরা কেউ শাস্তি পায়নি এখনও। ঘটনার পর বিভিন্ন মামলায় ৯৯৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এ ঘটনায় আটকরা সবাই এখন জামিনে। অনেকেই বিদেশে পাড়ি দিয়েছে।

ঘটনার পরপরই ক্ষতিগ্রস্থ বিহার ও ঘরবাড়ি পুণনির্মাণ করে দিয়েছে সরকার। দীর্ঘ সাত বছরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অনেকটা ফিরে এসেছে বলে জানান রামুর বৌদ্ধরা।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, বৌদ্ধ মন্দির ও বসতিতে হামলার ঘটনায় সর্বমোট ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়।

তৎমধ্যে বাদীর সম্মতিতে ১টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। অন্য ১৮টি মামলা আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সাধারণ সম্পাদক রাজু বড়ুয়া জানান, রামু সহিংসতার সাত বছর পার করছি। ঘটনার সাত বছরে রামুর পরিস্থিতি অনেকটা ভালো।

তবে এ ধরণের ঘটনা যাতে আর কোথাও না ঘটে, এ জন্য সকলকে আরো সর্তক থাকার আহবান জানান এবং বৌদ্ধদের পাশে থেকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ সরকার ও রামুবাসির প্রতি ধন্যবাদ জানান তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুর ১২ বৌদ্ধ বিহার, ৩০টি বসতঘর, পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফে ৭টি বৌদ্ধ বিহার, ১১টি বসতঘর পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।

পুড়ে যায় এসব মন্দিরে থাকা হাজার বছরের পুরাতাত্ত্বিক সব নিদর্শন। এ ঘটনার পর দায়ের করা হয় ১৯টি মামলা। এর মধ্যে রামুর আটটি মামলায় ৪৫৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

তবে রামু থানার জনৈক সুধাংশু বড়ুয়ার করা মামলাটি দু’পক্ষের আপস মীমাংসার ভিত্তিতে প্রত্যাহার করা হয়।

রামু সহিংসতার ঘটনা দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে আঘাত হেনেছিল তা অনেকটা দূর হয়েছে। তবে সম্পূর্ণরূপে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া সময় সাপেক্ষ বলে জানান, কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু।

তিনি বলেন, রামু সহিংসতার সাত বছরে ফিরে এসেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। রামুর বৌদ্ধরা পেয়েছে দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার। কিন্তু রামুর ঘটনার পর যেই মামলাগুলো হয়েছে সেই মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।

জানা গেছে, বৌদ্ধপল্লীতে হামলার ঘটনায় দায়ের ১৯ মামলার এজাহারে নাম-ঠিকানা উল্লেখিত আসামি ছিল ৩৭৫ জন। রামু থানার আট মামলার এজাহারে মোট আসামি সাত হাজার ৮৭৫। এর মধ্যে ১১১ জনের নাম-ঠিকানা থাকলেও পুলিশ গ্রেফতার করতে পেরেছিল মাত্র ৭৪ জনকে। আর সন্দেহভাজনদের মধ্যে আটক করেছিল ১৩২ জনকে।

উখিয়া থানার সাত মামলায় পাঁচ হাজার ৬২৪ আসামি থাকলেও গ্রেফতার ছিল ১১৬ জন। টেকনাফ থানার দুটি মামলায় ৬৫৩ আসামির মধ্যে গ্রেফতার ছিল ৬৩ জন।

কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দুই মামলায় এক হাজার ৩০ আসামি থাকলেও গ্রেফতার ছিল ৯৮ জন। গত সাত বছরে ধাপে ধাপে জামিন নিয়ে বেরিয়ে গেছে সবাই।

চা ল্যকর এ ঘটনার পর আদালতের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি জড়িতদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে সুপারিশ করে।

কিন্তু ঘটনার পরিকল্পনাকারী গডফাদারদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটক করে এসব মামলা দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। দায়ীরা রয়েছে এখনও অধরা।

Print Friendly and PDF

———