চট্টগ্রাম, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ , ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পুলিশী অভিযানে আটক১৪

কিশোর গ্যাং’র দাপটে উৎকন্ঠিত রাঙামাটির অভিভাবকরা

আলমগীর মানিক,রাঙামাটি থেকে প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৮:২৩ : অপরাহ্ণ

রাঙামাটি শহরে ‘গ্যাং কালচারের’ নামে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে উঠতি বয়সের কিশোরদের একটি অংশ। এসব গ্যাংয়ের সাথে জড়িতদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ অনেক সময় তারও কিছুটা বেশি ২০-২৫ বছরের মধ্যে।

এদের বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের পরিবারের সন্তান ও স্কুলছাত্র। নিম্ন মধ্যবিত্তের ও লেখাপড়া না করা কিশোর-তরুণও আছে। মূলত: দলবেধে ‘পার্টি’ বা ফূর্তির আয়োজন করে, হর্ন বাজিয়ে প্রচণ্ড গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে ও মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে দাপট দেখায়।

এসব কিশোর অপরাধী ‘গ্যাংয়ের’ ব্যাপারে এতোদিন তাদের অভিভাবক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাই ছিলেন উদাসীন। সম্প্রতি রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা এসব গ্যাং এর সদস্যদের উৎপাত অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বেশ উৎকন্ঠিত করে তুলেছে অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।

মঙ্গলবারও রাঙামাটি শহরের স্টেডিয়াম এলাকায় দুইটি গ্যাংয়ের সদস্যরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়লে পরবর্তীতে সেখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে সংঘর্ষময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

পরে ঘটনাস্থল ও আশেপাশের এলাকাগুলো থেকে ১৪ কিশোরকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলো (১) বন্ধু লাল চাকমা, (২) আনন্দ মোহন চাকমা,(৩) বিবিশ্বর চাকমা, (৪) নিজুম চাকমা, (৫) রিটন চাকমা, (৬) মিন্টু চাকমা, (৭) রূপেল চাকমা, (৮) উৎপল চাকমা, (৯) বল্লাল চাকমা, (১০) নিউশন চাকমা, (১১) জীবন কৃ চাকমা, (১২) রিপন চাকমা, (১৩) গৌতম কুমার চাকমা ও (১৪) জুয়েল চাকমা। আটককৃতরা সকলেই রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৮ম থেকে ১০ শ্রেণীর শিক্ষার্থী।

কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ মীর জাহেদুল হক রনি আটকের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, আটককৃতদের সকলেই শিক্ষার্থী হওয়ায় এবং বয়সটাও অনেক কম। তাদের পিতা-মাতা ও অভিভাবকরা এসে তাদের সন্তানরা আর কখনো কোনো ধরনের গ্যাং এর সাথে জড়িত হবেনা মর্মে মুচলেখা প্রদান করলে আটককৃতদের পিতা-মাতার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

ওসি বলেন, আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে সম্প্রতি রাঙামাটি শহরের কাঠালতলী, আলম ডক ইয়ার্ড, কল্যাণপুর, ভেদভেদী, ষ্টেডিয়াম ডিসি বাংলো এলাকা, রিজার্ভ মুখ এলাকা, রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি, পর্যটক এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পিতা-মাতার বখে যাওয়া কিছু ছেলের ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তি ঘটেছে।

এদের অনেককে আমরা চিহ্নিত করেছি। তালিকানুসারে অভিযান পরিচালনা করে এদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। প্রাথমিকভাবে অভিভাবকদের সতর্ক ও মুচলেখা নিয়ে আমরা ছেড়ে দিলেও পরবর্তীতে আমরা মামলার মাধ্যমে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দিবো।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, রাঙামাটিতে অন্তত ১০টি বিভিন্ন নামের গ্যাং গ্রপ রয়েছে। সোস্যাল মিডিয়ায়ও তাদের পদচারনা বেশ লক্ষ্যনীয়। সবগুলোর মধ্যে-কাট্টি গ্যাং, ৬৯-গ্যাং, চেইন গ্র“প, বিদ্রোহী ভয়েজ, রাঙামাটি ভাইরাস গ্যাং, আরজিটি বিদ্রোহী গ্যাং, রাঙামাটি বিদ্রোহী গ্যাং, ফাজিল গ্যাং (রাঙামাটি) নাম জানাগেছে।

এছাড়াও এলাকাভিত্তিক কিছু তথাকথিত বড় ভাইয়ের নেতৃত্বেও চলছে গ্যাং কালচার। এসব গ্যাং এর সদস্যরা গত এক বছর ধরে শহরের বিভিন্ন স্থানে মারামারি ও প্রিডে মোটর সাইকেল চালিয়ে কয়েকটি দূর্ঘটনার ঘটনা ঘটালে সকলের নজরে আসে। বিষয়টি নিয়ে চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা সভায়ও আলোচনা হয়।

এই বিষয়ে জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর কবীর বলেছেন, শুধুমাত্র পুলিশের উপর দোষ চাপিয়ে সবরকমের দায়-দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়না। সমাজের প্রতিনিধিত্বকারি জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সকলেই যদি স্ব স্ব অবস্থান থেকে সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি হয়না।

এসপি আরো বলেন, আপনাদের ছেলে-মেয়েদের বয়স আঠারো না হতেই আপনি তার হাতে এন্ড্রোয়েট মোবাইল ফোন আর মোটরসাইকেল তুলে দিচ্ছেন।

এই দু’টা জিনিসই বাচ্চাদের বখাটে হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। নিজেরাই নিজেদের সন্তানদের বখাটে বানাতে উপকরণ সাপ্লাই দিবেন, অন্যদিকে পুলিশকে দোষ দিবেন? এমন সংস্কৃতি থেকে বের আসার আহবান জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, আমাকে আপনারা সহযোগিতা করুন, তদবির বন্ধ করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলুন” দেখবেন খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যেই একটি নিরাপদ ও সুন্দর রাঙামাটি গড়ে উঠবে।

Print Friendly and PDF

———