চট্টগ্রাম, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ , ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মিরসরাইয়ে পাহাড়ি ঝর্ণাগুলোতে ৪ বছরে নিহত ১০, আহত শতাধিক

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি প্রকাশ: ১৭ আগস্ট, ২০১৯ ১:৩৪ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় অবস্থিত বিভিন্ন পাহাড়ি প্রাকৃতিক ঝর্ণা দেখতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অনেক পর্যটকক। প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে এখানে। গত ৪ বছরে ১০জন পর্যটক নিহত ও শতাধিক পর্যটক আহত হয়েছে। একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

জানা গেছে, নজরকাড়া পাহাড়ি প্রাকৃতিক ঝর্ণার কারণে মিরসরাইয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঝর্ণা দেখার জন্য মিরসরাইয়ে আসছেন পর্যটকরা।

বিশেষ করে দুই ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নামে এসব ঝর্নায়। উপজেলার নয়স্তর বিশিষ্ট খইয়াছরা, নাপিত্তাছরা, সহ¯্রধারা, মহামায়া, বাওয়াছরা, রূপসী ঝর্ণা, বোয়ালিয়া ঝর্না, হরিণাকুন্ড ঝর্না, সোনাইছরি ঝর্ণা নজর কেড়েছে ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের।

তবে ঝর্ণাগুলোতে প্রশাসনের কোন নজরদারী না থাকাতে একেরপর এক ঘটছে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রতিদিন শতশত মানুষ ঝর্ণার পানিতে একটু শরীর ভিজিয়ে নিতে ছুটে যাচ্ছেন।

সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট উপজেলার বড়কমলদহ রূপসী ঝর্নায় কূপে ডুবে নিহত হয় মেহেদী হাসান প্রান্ত (২১)। মেহেদী হাসান নাটোর জেলার নাটোর উপজেলার জালালাবাদ গ্রামের মোঃ নুরুল আমিনের ছেলে। তারা চট্টগ্রাম শহরের কর্ণেলহাট প্রশান্তি আবাসিক এলাকায় থাকতো।

প্রান্ত চট্টগ্রাম শহরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট টেকনোলজিতে সিভিল ডিপার্টমেন্টের ষষ্ঠ সেমিষ্টারের ছাত্র ছিলো। মেহেদী হাসানের বন্ধু শাহরিয়ার ইসলাম বলেন, রূপসী ঝর্ণা দেখার জন্য আমরা বৃহস্পতিবার সকালে ৬বন্ধু চট্টগ্রাম শহর থেকে আসি। ঝর্ণায় দ্বিতীয় স্তরে উঠে মেহেদী সহ আরো ২জন উপর থেকে পানিতে লাফ দেয়। এসময় ২জন উঠে গেলেও মেহেদী উঠতে পারেনি। সে মহুর্ত্বের মধ্যে পানিতে ডুবে যায়।

আমরা অনেক চেষ্ঠা করেও তাকে পানি থেকে তুলতে পারিনি। এভাবে তাকে হারাতে হবে কখনো ভাবিনি। গত ২৬ জুলাই খৈয়াছড়া ঝর্ণা দেখতে এসে ঝর্ণার উপর থেকে পা পিছলে পড়ে নাম আবু আল হোসাইন মেমোরী (২৯) নামে এক পর্যটক নিহত হয়। তার বাড়ী বগুড়া জেলার বগুড়া সদর থানায়।

সে ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় সেইফটি কনসালটেন্ট বিডি প্রতিষ্ঠানের আর্কিটেকচার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতো। ২৮ জুন খৈয়াছড়া ঝর্নায় আনোয়ার হোসেন নামে এক পর্যটক উপর থেকে পড়ে নিহত হয়। সে ফেনী সদরের আব্দুল মজিদের পুত্র। গত ২ এপ্রিল খৈয়াছড়া পাহাড়ি এলাকায় ঝর্ণার উপর থেকে পা পিছলে পড়ে মো. আশরাফ হোসেন (৩০) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।

নিহত আশরাফ ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মৃত নাজিম উদ্দিনের সন্তান। ১২ জুলাই উপজেলার বোয়ালিয়া ঝরনা দেখতে এসে আটকে ১৫ পর্যটক। চারঘণ্টা চেষ্টার পর তাদের উদ্ধার করে মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। ১৭ জুলাই মহামায়া লেকে পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয় শাহাদাত হোসেন (২২) নামে এক যুবক।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ১৯ জুলাই পানিতে খুঁজে শাহদাতকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। তার বাড়ী মিরসরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নে। গত বছরের ১৫ আগস্ট নয়দুয়ারিয়ার নাপিত্তাছড়া ঝর্ণার কূপে ডুবে অনিমেষ দে (২৭) নামে এক পর্যটক নিহত হয়। সে ফকিটছড়ি উপজেলার নিরঞ্জন দে’র ছেলে। একই বছরের ২৪ আগস্ট বড়কমলদহ রূপসী ঝর্ণায় উপর থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায় সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক। তার বাড়ি সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া এলাকায়।

ওই বছরের ১৫ জুলাই খৈয়াছরা ঝর্ণার সাতটি স্তরের ৫ম স্তরে উঠার পর স্থানীয় এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সময় তাকে ধরতে যায় ওয়াসিম আসগর। ওই পর্যটক সামান্য আঘাত পেলেও ওয়াসিম পাহাড়ের নিচে পড়ে যায়। এতে মারাত্বক আহত হয় সে।

২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর উপজেলার নাপিত্তছরা ঝর্ণায় সাঁতার কাটার সময় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন মামুন (২২) মৃত্যু হয়। সে ফেনী জেলার শৈর্শদী এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে।

জানা গেছে, কিছু বিষয়ে সতর্ক না থাকায় অনেক সময়ই ঘটে যাচ্ছে দুর্ঘটনা। পর্যটকদের অসতর্কতার জন্য ইতিমধ্যে ঘটে গেছে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা। তাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহ বেশ কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন মিরসরাই উপজেলা ও থানা প্রশাসন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া খেয়ালখুশি মতো গহীন জঙ্গলসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এলোমেলোভাবে বেড়াতে গিয়ে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ছে।

এর জন্য অনেকেই দর্শনার্থীদের দায়িত্বহীনতা ও অসংযত আচরণকে দায়ী করছেন। তবে সম্প্রতি পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিতে ইকো গাইড ভাড়া দেওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ে উঠার জন্য জুমারিং ও নামার জন্য র‌্যাপ্লিং ভাড়া দিয়ে পর্যটকদের নজর কেড়েছেন বারৈয়ঢালা জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি।

বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) সভাপতি মোঃ সরওয়ার উদ্দিন বলেন, আমরা পর্যটকদের জন্য সচেতনতা মূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করেছি। খৈয়াছরা, সহ¯্রধারা, নাপিত্তা ছরা, লবণাক্ষ ছরা, বাওয়া ছরা, কমলদহ ছরা, সোনাই ছরা ঝর্ণা এলাকায় নিরাপদে যাওয়ার জন্য ২০ জন ইকো গাইডকে নিয়োগ দিয়েছি। পর্যটকরা যদি ঝর্ণা এলাকায় যাওয়ার সময় ইকো গাইডদের সাথে নিয়ে যায় তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

খইয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, মূলত দায়িত্বহীনতা ও অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকে ঝর্ণার উপরে উঠে সেলফি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায়।

মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর ষ্টেশন অফিসার মোঃ তানভির আহম্মদ বলেন, ঝর্নাগুলোতে প্রশসনের নজর দেয়া প্রয়োজন। পর্যটকদের গাইড দিতে হবে কোন স্থানে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবে, কোন স্থানে গেলে নিরাপদ তাহলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে।

মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জসীম উদ্দিন বলেন, মিরসরাইয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে সৃষ্ট ঝর্ণা দেখতে প্রতিদিন আসেন হাজারো পর্যটক। ঝর্ণা এলাকাগুলোতে যদি পর্যটন মন্ত্রণালয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে তাহলে প্রতিবছর কয়েককোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব। এখানে কোন নিরাপত্তা না থাকায় ইতমধ্যে কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা পর্যটন এলাকগুলোতে বিপদনজক স্থান চিহ্নিত করে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শীঘ্রই সর্তকতামূলক সাইনবোর্ড দিবো।

Print Friendly and PDF

———