চট্টগ্রাম, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ , ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণেও ব্যবস্থা নিতে পারছে না পুলিশ

চট্টগ্রামে গলিতে গলিতে গ্যাং কালচার, বাড়ছে কিশোর অপরাধ

সিটিজি টাইমস ডেস্ক প্রকাশ: ২৭ আগস্ট, ২০১৯ ১০:৩৮ : পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে কিছুতেই থামছে না কিশোর অপরাধ। উঠতি বয়সী শিশু-কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে মাদক চোরাচালান, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও খুনের মতো ঘটনায়।

তার সর্বশেষ বলি জাকির হোসেন জনি (১৮)। সোমবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে নগরীর খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কে ওমরগণি এমইএস কলেজের ফটকের অদূরে ইক্যুইটি ভবনের সামনে খুন হন।

এলাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজেদের নানা নামে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে কিশোর অপরাধীরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না থাকা ও পারিবারিক অনুশাসনের অভাবে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা।

বয়স মাত্র সাত। এসব শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে ছিনতাইয়ের কাজে। আবার বন্ধুদের হাত ধরেও মরণ নেশা মাদকে পা রাখছেন অনেক কিশোর।

স্কুল-কলেজ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা দ্বন্দ্ব মেটাতে শিশু-কিশোররা কয়েকজন মিলে গড়ে তুলছে গ্যাং বাহিনী।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এবং পাশ্চাত্য ধারা অনুকরণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নস্থানে নিজেদের পরিচয় করছে বিচিত্র সব নামে।

২০১৭ সালে ফেব্রুয়ারিতে উত্তরায় আদনান হত্যার পর আলোচনায় আসে কিশোর গ্যাং কালচার। বর্তমানে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১৫টির বেশি কিশোর গ্যাং। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই গ্রুপগুলো জড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের বিরোধে।

এমনকি গত এক বছরে এসব কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে প্রাণ হারিয়েছে বেশ ক’জন। কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধের জেরে চট্টগ্রামে ক্রসফায়ারের ঘটনাও ঘটেছে।

তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

প্রসঙ্গত, সোমবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে নগরীর খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কে ছুরিকাঘাতে তরুণ খুনের নেপথ্যে বেসরকারি ওমরগণি এমইএস কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

তবে এই তরুণ ওই কলেজের ছাত্র ছিল না বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের শিকার জাকির হোসেন জনি (১৮) সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার কলাপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে। চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে জনি সবার ছোট। তারা ঢাকার মিরপুরে থাকেন।

জনি’র বড় বোন সিআইডি’র চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কুতুব উদ্দীনের স্ত্রী। থাকেন চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী আবাসিক এলাকার এক নম্বর সড়কে। জনি’র আরেক বোন মাহমুদা আক্তার ইন্নি পরিবার নিয়ে থাকেন ময়মনসিংহে।

মাহমুদা আক্তার ইন্নি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জনি চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী আবাসিক এলাকার এক নম্বর সড়কে কুতুব উদ্দীনের বাসায় থেকে পড়ালেখা করত। গতবছর তাকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার মিরপুরে নিয়ে একটি স্কুলের নবম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে জনি ওই স্কুলের দশম শ্রেণীতে পড়ছে।

তিনি জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে মাহমুদা ও তার স্বামী, জনি ও তার মা চট্টগ্রামে কুতুব উদ্দীনের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। সোমবার রাতে তাদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।

চট্টগ্রামে পড়ালেখা করার সময় এমইএস কলেজের আশপাশের এলাকায় জনি’র বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিল। ঢাকায় ফেরার আগে সোমবার দুপুরে তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল জনি।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (বায়েজিদ বোস্তামি) পরিত্রাণ তালুকদার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এমইএস কলেজের কাছে সড়কে ছুরিকাঘাতের পর কয়েকজন মিলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

লাশের সুরতহালকারী খুলশী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নোমান জানান, জনির পিঠে, ডান পায়ের উরুতে এবং বাম পায়ের হাটুঁর নিচে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে।

এদিকে জনি’র মৃত্যুর খবর শুনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা। তারা নগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপি ওয়াসিম উদ্দিনের অনুসারী। তাদের দাবি, জনি তাদের গ্রুপের কর্মী ছিল।

হাসপাতালে গিয়ে নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া জাহিদুল ইসলাম নামে একজন সাংবাদিকদের জানান, জনি ওয়াসিম গ্রুপের ছাত্রলীগের কর্মী ছিল। রোববার এমইএস কলেজের ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে মারামারি হয়। সেখানে জনিও ছিল। এর জের ধরে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা তাকে ছুরিকাঘাত করেছে।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যে ছেলেটি খুন হয়েছে তাকে আমি কোনোদিন ছাত্রলীগের কোনো মিছিল-মিটিংয়ে দেখিনি। ব্যক্তিগতভাবে কোনো গ্রুপ করলে সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু সে নগর ছাত্রলীগের কেউ নয়। আর ঘটনাও কলেজ ক্যাম্পাসে হয়নি। ছেলেটিও এমইএস কলেজে পড়ত না, বহিরাগত ছিল। এগুলো একান্তই কিশোর-তরুণদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। এর সঙ্গে ছাত্রলীগের কোনো সম্পর্ক নেই।’

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রনব চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দুজন হত্যাকারীর নাম পেয়েছি। ঘটনাও আমাদের কাছে ক্লিয়ার। ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে রোববার মারামারি হয়েছিল। এর জের ধরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যে দু’জনের নাম পেয়েছি, তাদের গ্রেফতার করা গেলে, ঘটনা পুরোপুরি পরিস্কার হবে।’

তবে জনি’র মা সাজেদা বেগম দাবি করেছেন, তার ছেলের সঙ্গে খুলশীর এক মেয়ের সম্পর্ক ছিল। এটা নিয়ে জিইসি মোড় এলাকার রবিউল নামে এক ছেলের সঙ্গে জনির বিরোধ ছিল। ৪-৫ দিন আগে রবিউল তাকে প্রবর্ত্তক মোড়ে ডেকে নিয়ে মারধর করে। এই ঘটনার জেরেই তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে।

জনি’র ভগ্নিপতি সিআইডি’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কুতুব উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

সাম্প্রতিক বেশ কটি হত্যা এবং সংঘাতের ঘটনা তদন্তে বের হয়ে আসে কিশোর গ্যাংয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রেম থেকে শুরু করে তুচ্ছ যে কোনো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী সংঘাতে। এসব ক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে হত্যা, মাদক চোরাচালানের মতো বড় ধরণের অপরাধের পরিকল্পনা করছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিশোর অপরাধ দমনে শিশু-কিশোরদের সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের পাশাপাশি পারিবারিক অনুশাসন দরকার।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘সামাজিক যে টানাপড়েন তৈরি হয়, তারই একতা অংশ গ্যাং কালচার। স্কুল ও পরিবারের মাঝে সেতুবন্ধন থাকা উচিত।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অভিযান চলমান আছে।  গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেক সময় তারা নামহীন ভাবে ফেসবুক ও হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে গ্যাং কালচার নিয়ন্ত্রণ করে। এসব দমনে আমরা সব সময় সোচ্চার আছি।’

তাদের মতে, অপরাধ দমনে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করাতে হবে কিশোরদের।

এসব গ্যাং বাহিনী বা কিশোর গ্যাং এর লাগাম টানা না গেলে জনি হত্যার মতো আরো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কিশোর অপরাধ দমনে আরো কঠোর হতে হবে। সেইসাথে বাবা-মাকে সন্তানের প্রতি আরও যত্নবান হতে হবে। তবেই না কমে আসবে কিশোর অপরাধ।

Print Friendly and PDF

———