চট্টগ্রাম, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯ , ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বাস্তসংস্থানে জগত সুশৃঙ্খল: না থাকলে তাজমহলও পোকায় খায়

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ১০ আগস্ট, ২০১৯ ১০:৩৬ : পূর্বাহ্ণ

লেখক ফজলুর রহমান

সৌন্দর্য হারাচ্ছে শতাব্দী প্রাচীন সৌধটির শ্বেত পাথর। পাথরগুলোতে দেখা দিয়েছে কালচে সবুজ ছোপ।  কারণ কি? দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, আবারও পোকামাকড় বসত গেড়েছে তাজমহলে। এসব পোকামাকড়ের আক্রমণে এমন হতশ্রী দশা।

আগেও এ ধরনের পোকার আক্রমণে এখানকার শ্বেত পাথরের স্বাভাবিক রং নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু এ সমস্যা শুধু বছরের নির্দিষ্ট সময়ে হতো। তবে বর্তমানে এটি স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দ্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) আগ্রা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ ভাসান্ত স্বর্ণকার।

তিনি জানান, এসব পোকামাকড়ের জন্ম হয় পার্শ্ববর্তী যমুনা নদীতে। এর আগে সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসে এসব পোকা তাজমহলে বসতি গড়ত। কিন্তু এখন বছরজুড়েই এ সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যমুনা নদীর পানি ঠিকভাবে পরিষ্কার না করার কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এসব পোকার কারণে শুধু যে পাথরে কালচে সবুজ ছোপ পড়ছে তা-ই না, এর কারণে তাজমহলের নকশা ও ফুলেল মোজাইকও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা মধ্যে পড়েছে। পাথরের দাগ দূর করতে এএসআই প্রতি শুক্রবার বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ঘষামাজা করার ব্যবস্থা নিয়েছে। ওই দিন তাজমহলে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে।

কিন্তু নিয়মিত দেয়ালে ঘষামাজা করলে শ্বেত পাথর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। যমুনার পানি ঠিকভাবে পরিষ্কার করাই এ সমস্যার একমাত্র স্থায়ী সমাধান বলে মনে করছে এএসআই।

তবে তাজমহলের বাইরে কিছু পরিষ্কার করার এখতিয়ার না থাকায় তাদের পক্ষে এটি করা সম্ভব হচ্ছে না। ২০১৬ সালে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিলে এএসআইয়ের বিজ্ঞান শাখা এর কারণ অনুসন্ধানে নেমেছিল।

এতে দেখা যায়, যমুনার দূষিত পানি থেকেই এসব পোকার উৎপত্তি। নদীর পানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। কারণ পানির স্রোত কমে যাওয়ায় সেখানে ছোট মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আগে এসব মাছ পোকামাকড় খেয়ে এগুলোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখত। আরো কিছু কারণ উল্লেখ করে এগুলো সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল প্রতিবেদনটিতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।

আমাদের চারপাশের সবকিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ । এই পরিবেশে স্বতন্ত্র ধরনের অজীব ও জীব উপাদান থাকে। এসব অজীব ও জীব উপাদানসমূহ একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। জীব উপাদানসমূহের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী। জীবন ধারণের জন্য এসকল উদ্ভিদ ও প্রাণী একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

উদ্ভিদ ও প্রাণী জীবন ধারণের জন্য একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। এভাবে যে কোনো একটি পরিবেশের অজীব এবং জীব উপাদানসমূহের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া, আদান-প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবেশে যে তন্ত্র গড়ে ওঠে তাই বাস্তুতন্ত্র নামে পরিচিত।

প্রকৃতিতে যে কোনো জীবের সংখ্যা হঠাৎ করে বেশি বাড়তে পারে না। প্রতিটি জীব একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে এরা পরস্পর পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সহজে এর কোনো একটি অংশ একেবারে শেষ হতে পারে না। কোনো একটি পরিবেশে বিভিন্ন স্তরের জীব সম্প্রদায়ের সংখ্যার অনুপাত মোটামুটিভাবে অপরিবর্তিত থাকে। পরিবেশে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটলেও বহু দিন পর্যন্ত প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

বাস্তুসংস্থানের পুরো ব্যাপারটা একটা food chain বা খাদ্যশৃঙখলা দ্বারা সম্পৃক্ত । অণুজীবেরা ফসল আর ক্ষুদে উদ্ভিদ উৎপন্ন করাতে সাহায্য করবে আর সেই ফসল আর ক্ষুদে উদ্ভিদ খাবে যথাক্রমে তৃণভোজী আর অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর খাদকেরা যাদের মাঝে অনেক কীটপতঙ্গও রয়েছে। আবার তাদের খাবে পাখিরা, ও অন্যান্য জীবেরা যাদের খাবে নখরযুক্ত শিকারি পাখি (Raptor) আর হরিণ ও অন্যান্য তৃণভোজীদের খাবে বাঘ, সিংহ, নেকড়ের মত অন্যান্য মাংসাশী প্রাণীরা।

একটি বনের কথা ধরা যাক। যেখানে বাঘ, হরিণ, শূকর ইত্যাদি বাস করে। এ বনে বাঘের খাদ্য হলো হরিণ ও শূকর। হরিণ ও শূকরের সংখ্যা বেড়ে গেলে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কারণ বাঘ প্রচুর খাদ্য পাবে। আবার বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে হরিণ ও শূকরের সংখ্যা কমে যাবে। হরিণ ও শূকরের সংখ্যা কমে গেলে বাঘের খাদ্যাভাব দেখা দিবে। ফলে বাঘের সংখ্যাও কমে যাবে। আবার বাঘের সংখ্যা যদি কমে যায় তবে হরিণ ও শূকরের সংখ্যা বেড়ে যাবে। এভাবে হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে একটি এলাকার বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ এর একটি কথা আছে। যা বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত। যেখানে প্রজাপতির তুলনা এইরূপ যে পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে একটা প্রজাপতি ডানা ঝাপটালে সেটার প্রতিক্রিয়া লিনিয়ার পদ্ধতিতে একের পর এক, একের পর এক ঘটনাকে প্রভাবিত করে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তুমুল ঝড় তৈরি করে ফেলতে পারে! প্রজাপতিটা এখানে স্রেফ একটা উদাহরণ। পরিবেশের জীববৈচিত্রও এমনি এক ব্যাপার, যার একদিক ধরে নাড়া দিলে তা ঘুরেফিরে গোটা ব্যবস্থার উপরই প্রভাব ফেলবে।

প্রাণীকুল, আর এর জীববৈচিত্র এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। এই বৈচিত্রতা পুরো সিস্টেমটার প্রয়োজনে সময়ে সময়ে নিজেকে হাজার হাজার, লাখ লাখ ভেরিয়েশন আর ভেরিয়্যান্ট এ ঢেলে দিয়ে বহু যাচাই বাছাই, অভিযোজন এর মধ্যে দিয়ে প্রতিটা জায়গায় প্রয়োজনমত স্থাপিত হয়েছে। ফলে এই যে জীববৈচিত্র আর বাস্তুসংস্থান , তা প্রকৃতির কোনো নিছক খামখেয়ালি নয়। প্রতিটা প্রাণী  আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে এসবের সুরক্ষা প্রয়োজন। বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ তো আর নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা অব্যাহত রাখতে পারে না! তাজমহল টু অন্দরমহল সবখানেই তাই বাস্তুসংস্থান বহাল রাখার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। নয়তো বিলীন হবে বর্তমান, পোকায় খাবে ভবিষ্যত।

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার,চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Print Friendly and PDF

———