চট্টগ্রাম, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ , ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বজ্রপাতের আগাম সতর্কতায় সফলতা, মৃত্যু কমল

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ২৫ জুলাই, ২০১৯ ৩:৪৪ : অপরাহ্ণ

বেশ কয়েক বছর ধরে ভারত ও বাংলাদেশে বজ্রপাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আর এই সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এখন আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বজ্রপাতের আগাম সতকর্তা সফলতার মুখ দেখেছে। সম্প্রতি ভারতের ওড়িশা রাজ্যে বজ্রপাতের আগাম সতর্কতা জারি করে মৃতের সংখ্যা ৩১ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত ও শঙ্কিত, তখনই এমন দাবি এলো উড়িষ্যা রাজ্য প্রশাসন থেকে। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এক বেসরকারি কোম্পানির সহযোগিতায় নতুন এক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পেরেছেন তারা।

সতর্কবার্তা পাওয়ার পরপরই বাজ পড়ার সম্ভাব্য এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে এসএমএস করে সাবধান করে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে সাইরেন বাজিয়েও সাবধান করা হচ্ছে। নতুন এ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

বিবিসি প্রচারিত প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজ্যের দুর্যোগ মোকাবেলা বিষয়ক মন্ত্রী সুদাম মারান্ডি সম্প্রতি ওড়িশা বিধানসভায় জানিয়েছেন, ২০১৭-১৮ সালে যেখানে ৪৬৫ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা গিয়েছিল, সেখানে ২০১৮-১৯ সালে মৃত্যু হয়েছে ৩২০ জনের। কয়েক বছরের মধ্যে এবারই নিহতের সংখ্যা চারশ এর নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

প্রতিবছর বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। তবে নতুন একটি সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে হতাহতের সংখ্যা কমাতে সাফল্য পেয়েছে ওই রাজ্য। ওড়িশা দুর্যোগ মোকাবেলা কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিষ্ণুপদ শেঠি বলেন, ‘আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থ নেটওয়ার্ক নামের একটি সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি, যারা কোন এলাকায় বাজ পড়বে তা প্রায় এক ঘণ্টা আগে জানিয়ে দিতে পারছে। সতর্কবার্তা পাওয়ার সময় থেকে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছাতে দুই থেকে তিন মিনিট সময় লাগছে।’

দুর্যোগ মোকাবেলা কর্তৃপক্ষের জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমসের প্রকৌশলী ভোলানাথ মিশ্র জানান, আর্থ নেটওয়ার্ক ওড়িশার নানা জায়গায় ছয়টি সেন্সর বসিয়েছে। সেই সেন্সর থেকে সংগ্রহ করা তথ্য তাদের দপ্তরে পৌঁছাচ্ছে। মেঘের অবস্থান, আকৃতি, বাতাসের গতিপ্রকৃতির মতো অনেক প্যারামিটার খতিয়ে দেখে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে মোটামুটি কোন এলাকায় বাজ পড়তে পারে।

বজ্রপাত নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে স্কুল-কলেজ আর গ্রামে গ্রামে ব্যাপক প্রচারাভিযান চলছে। একই সঙ্গে আর্থ নেটওয়ার্কের সতর্কবার্তা আরো কী কী উপায়ে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, সেই পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে তাল, সুপারি, খেজুর বা নারকেলগাছের মতো উঁচু গাছ যাতে কেটে ফেলা না হয়, সেই প্রচারও চলছে। এ ধরনের উঁচু গাছ অনেক সময় বাজ আকৃষ্ট করে সাধারণ মানুষকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে। এতে গাছ হয়তো জ্বলে যায়, কিন্তু আশপাশে থাকা মানুষ বেঁচে যায়।

ভোলানাথ মিশ্র বলছিলেন, ‘আমরা ১৪টি এলাকা চিহ্নিত করেছি, যেখানে সবচেয়ে বেশি বাজ পড়ে। সেসব এলাকায় আমরা সাইরেনের ব্যবস্থা চালু করেছি। সতর্কতা জারি হলেই সাইরেন বাজতে থাকবে। কেউ যদি মোবাইল ফোনের মেসেজ না-ও পড়ে বা অ্যাপের অ্যালার্ট না-ও দেখতে পারে, তাহলেও সাইরেন শুনেই সতর্ক হয়ে যাবে। এটা পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা। সফল হলে গোটা রাজ্যেই এটা চালু করা হবে। এর সঙ্গে উপকূল অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা জারি করার যে ব্যবস্থা আছে, সেটাকেও বজ্রপাতের সতর্কতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কাজ হচ্ছে।’

দুর্যোগ মোকাবেলা কর্তৃপক্ষের প্রধান বিষ্ণুপদ শেঠি বলেন, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা আশ্রয় শিবিরগুলোতে যখন বহু মানুষ ওঠে, সেখানে যাতে বাজ পড়ে অনেক মানুষের মৃত্যু না হয়, তার জন্য ‘লাইটনিং ক্যাচার’ লাগানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে স্কুল-কলেজগুলোতেও এগুলো লাগানো হবে।

বজ্রপাত কি?

জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হওয়ার সময় এতে প্রচুর স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ (electrostatic charge) জমা হয়। পানিচক্রে জলকণা যখন ক্রমশ ঊর্ধ্বাকাশে উঠতে থাকে তখন তারা মেঘের নিচের দিকের বেশি ঘনীভূত বৃষ্টি বা তুষার কণার সাথে সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়। যার ফলে উপরের দিকে উঠতে থাকা অনেক বাষ্প পরমাণু বেশ কিছু ইলেকট্রন হারায়। যে পরমাণু ইলেকট্রন হারায় তা পজিটিভ চার্জে এবং যে পরমাণু ইলেকট্রন গ্রহণ করে তা নেগেটিভ চার্জে চার্জিত হয়।

অপেক্ষাকৃত হাল্কা পজিটিভ চার্জ থাকে মেঘের উপর পৃষ্ঠে এবং ভারী নেগেটিভ চার্জ থাকে নিচের পৃষ্ঠে। যথেষ্ট পরিমাণ পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জ জমা হওয়ার পর পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণের দরুণ electrostatic discharge প্রক্রিয়া শুরু হয়। discharge তিন ভাবে হতে পারে-(ক) মেঘের নিজস্ব পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জের মধ্যে (একে বলা হয় intra cloud বা, IC discharge) (খ) একটি মেঘের পজেটিভ (+) কিংবা নেগেটিভ (-) চার্জের সাথে অন্য মেঘের নেগেটিভ (-) কিংবা পজেটিভ (+) চার্জের সাথে (একে বলা হয় cloud to cloud বা, CC discharging) (গ) মেঘের পজেটিভ (+) চার্জের সাথে ভূমির (একে বলা হয় cloud to ground বা, CG discharging) Discharge হওয়ার সময় পজেটিভ (+)  চার্জ থেকে নেগেটিভ (-)  চার্জের দিকে বাতাসের মধ্য দিয়ে স্পার্ক আকারে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। এ ঘটনাই হল বজ্রপাত। বজ্রপাতের শাব্দিক অর্থ হলো “ভূমিতে বিদ্যুৎ পতিত হওয়া”। তবে সব বজ্রপাতে ভূমিতে বিদ্যুৎ বা চার্জ পতিত হয় না। শুধু মাত্র CG discharging প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন বজ্রপাতে ভূমিতে বৈদ্যুতিক চার্জ পতিত হয়।

বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ চমকায় কেন?: বজ্রপাতের সময় বাতাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। আমরা জানি বাতাস বিদ্যুৎ অপরিবাহী। কিন্তু মেঘে জমা হওয়া স্থির বিদ্যুৎ এত উচ্চ বিভব শক্তি (১০ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত) উৎপন্ন করে যে, তা বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার জন্য বাতাসের একটা সরু চ্যানেলকে আয়নিত করে পরিবাহী পথ (conductive path) তৈরি করা হয়। আয়নিত পরমাণু থেকে বিকীর্ণ শক্তি তিব্র আলোক ছটা তৈরি হয়।
বজ্রপাতের সময় শব্দ উৎপন্ন হয় কেন?: উরংপযধৎমব হওয়ার সময় বাতাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, একে বলা হয় air breakdown। এ সময় বাতাসের যে চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় তার তাপমাত্রা প্রায় ২৭০০০ ডিগ্রি সেঃ (যা সূর্যের তাপমাত্রা থেকে বেশি) এ উন্নীত হয় এবং বাতাসের চাপ স্বাভাবিক চাপ থেকে ১০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ চাপ এবং তাপমাত্রায় পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র এক সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ। এত কম সময়ে তাপমাত্রা ও চাপের এত ব্যাপক পরিবর্তন চারপাশের বায়ুন্ডলকে প্রচণ্ড গতিতে (বিস্ফোরণের মত) সম্প্রসারিত করে। এ সময় যে শব্দ তরঙ্গ উৎপন্ন হয় সেটাই আমরা শুনতে পাই।

বজ্রপাতের সময় কি পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়?: ভূমি থেকে ৩ মাইল দূরত্বের বজ্রপাত (lightning strike) গড়ে এক বিলিয়ন থেকে ১০ বিলিয়ন জুল শক্তি উৎপন্ন করে। একটি ১০০ ওয়াট বাল্ব ১ সেকেন্ড জ্বালাতে শক্তি খরচ হয় ১০০ জুল। সে হিসাবে, ১০ বিলিয়ন জুল শক্তি দিয়ে ওই বাল্বকে ১১৬০ দিন বা প্রায় ৩৯ মাস অবিরাম জ্বালানো যাবে। বৈদ্যুতিক শক্তি পরিমাপক একক “কিলোওয়াট-আওয়ার” হিসেবে এ শক্তি ২৭,৮৪০ কিলোওয়াট-আওয়ার। বাংলাদেশে একটি পরিবার গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০০- ১৫০ ইউনিট (কিলোওয়াট-আওয়ার) বিদ্যুৎ ব্যাবহার করে। তার মানে একটি বজ্রপাতের বিদ্যুৎ শক্তি জমা করতে পারলে একটি পরিবার ১৮৫ মাস বা, প্রায়  ১৫ বছর বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ ব্যাবহার করতে পারবেন। চাইলে আপনিও বজ্রপাতকে ট্র্যাপে ফেলে বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ ব্যাবহারের সুযোগ লুফে নিতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে বজ্রপাত ঘায়েল করতে আপনি সময় পাবেন এক সেকেন্ডেরও কম (কারণ বজ্রপাতের পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে)। থেমে নেই বিজ্ঞানীরা। বজ্রপাত থেকে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ তড়িৎ শক্তিকে ধারণ করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের বিষয়ে বিজ্ঞানীরা উৎসাহী হয়ে উঠেছেন এবং তা বাস্তবায়িত করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাধারণত পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে যতই ওপরের দিকে যাওয়া হয় ততই এর তাপমাত্রা কমতে থাকে। সেজন্য বিজ্ঞানীরা বায়ুমন্ডলকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করেছেন। তবে তাপমাত্রা কম থাকার কারণে অনেক সময় দেখা যায় নিচ দিকের মেঘ ওপরের দিকে উঠতে থাকে।

বাতাসের নিন্মাঞ্চলে থাকা এ ধরনের মেঘকে বাজ মেঘ কিংবা ‘থান্ডার ক্লাউড’ বলে। তবে এই মেঘ যতই ওপরে উঠতে থাকে ততই এতে পানির পরিমাণ বাড়তে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পানির পরিমাণ যখন প্রায় পাঁচ মিলিমিটার হয় তখন এটা বন্ধনমুক্ত হয়ে ধনাত্মক  আয়ন ও ঋণাত্মক আয়নে বিভক্ত হয়ে যায়। এদিকে পৃথিবী ধনাত্মক চার্জ বিশিষ্ট হওয়ায় মেঘের ঋণাত্মক আয়নসমূহ নিচের দিকে অবস্থান নেয় এবং ভূমির দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে। অধিকাংশ সময়ে ঋণাত্মক আয়নের মান বেশি হয়। এ কারণে ঋণাত্মক আয়নগুলো পৃথিবীর ধনাত্মক আয়নের আকর্ষণে যখন নিচে চলে আসে তখনই বজ্রপাত হয়। এ সময় ওপর হতে নিচের দিকে বৈদ্যুতিক আধানের নির্গমনের ফলে আমরা আলোর ঝলকানি দেখতে পাই। এ সময় বিকট শব্দ শোনা যায়, ফলে বজ্রপাত আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এই বিকট শব্দটি মূলত হয় বাতাসের কারণে। ঋণাত্মক আয়ন পৃথিবীতে নির্গমনের সময় ওই স্থানে বাতাসের একটি বিরাট এলাকা শূন্য হয়ে আয়নগুলোর নির্গমন ঘটে এবং নির্গমনের পরে সেই বাতাস আবার আগের স্থানে ফিরে আসে। অল্প সময়েই বাতাসের এই প্রসারণ এবং সঙ্কোচনের কারণে আমরা বিকট শব্দ শুনতে পাই। এই আয়ন নির্গমনের সময় যদিও বিদ্যুৎ ও শব্দ একসঙ্গেই উৎপন্ন হয় তবু বিদ্যুৎ আগে দেখা যায় এবং শব্দ পরে শোনা যায়। এর কারণ হল আলো ও শব্দের বেগ।  আলোর বেগ সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার আর শব্দের বেগ সেকেন্ডে মাত্র ৩৪০ মিটার। এ কারণে বিদ্যুতের ঝলক আগে দেখা যায় এবং শব্দ পরে শোনা যায়।

তবে বজ্রপাত ঘটতে গেলে বৈদ্যুতিক আধানের নির্গমন দুটি মেঘের মধ্যে অথবা একটি মেঘ এবং ভূমির মধ্যেও হতে পারে। ভূমিতে যদি আধানের নির্গমন ঘটে সেক্ষেত্রে আধানগুলো খুব দ্রুত ভূমিতে চলে আসার ক্ষেত্রে কোনো পরিবাহী পেলেই সেটাতে আকৃষ্ট হয়। যে কারণে বড় বড় গাছের মাথায় বেশি বজ্রপাত হয়। এই উপমহাদেশে নারিকেল গাছের নতুন কচি পাতা প্রায়ই দেখা যায় মাঝখানের দিকে সূচাল হয়ে থাকে। যার ফলে এখানে নারিকেল গাছে বেশি বজ্রপাত হয়। উচ্চ বৈদ্যুতিক আধানের ফলে পরিবাহী সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এ ক্ষেত্রে এই আধান নির্গমন যদি কোনো প্রাণীর মধ্য দিয়ে হয় তখন তার মৃত্যু ঘটে। এ কারণে খোলা মাঠে বিদ্যুৎ চমকালে শুয়ে পড়তে বলা হয়।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা যা নেবেন: বজ্রপাতের সময় কি করা উচিত, আর কি উচিত নয়- সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতর।  মার্চ থেকে মে এবং অক্টোবর থেকে নবেম্বরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রঝড় হয়ে থাকে। বজ্রপাতের সময় পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিতে এবং উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। এসময় জানালা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলা, টিভি-ফ্রিজ না ধরা, গাড়ির ভেতর অবস্থান না করা এবং খালি পায়ে না থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকতে যেসব বিষয় মাথায় রাখা দরকার- ১. ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে খোলা বা উঁচু জায়গায় না থাকাই ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় যদি কোনো দালানের নিচে আশ্রয় নেয়া যায়। ২. বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বিদ্যুৎস্পর্শের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই বজ ঝড়ের সময় গাছ বা খুঁটির কাছাকাছি থাকা নিরাপদ নয়। ফাঁকা জায়গায় যাত্রী ছাউনি বা বড় গাছে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অত্যন্ত বেশি। ৩. বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছে গিয়ে উঁকিঝুঁকি নিরাপদ নাও হতে পারে। এ সময় জানালা বন্ধ রেখে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ৪. বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা ঠিক হবে না। এমনকি ল্যান্ড ফোন ব্যবহার না করতেও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। বজ্রপাতের সময় এগুলোর সংস্পর্শ এসে অনেকে স্পৃষ্ট হন। ৫. বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব ধরনের যন্ত্রপাতি এড়িয়ে চলা উচিত। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও স্পর্শ করা ঠিক হবে না। বজ্রপাতের আভাস পেলে আগেই প্লাগ খুলে রাখা ভালো। ৬. বজ্রপাতের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে যত দ্রুতসম্ভব বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করতে বলেছেন আবহাওয়াবিদরা। যদি তখন প্রচণ্ড বজ্রপাত ও বৃষ্টি হয়, তাহলে গাড়ি কোনো বারান্দা বা পাকা ছাউনির নিচে রাখা যেতে পারে। ওই সময় গাড়ির

কাচে হাত দেয়াও বিপজ্জনক হতে পারে। ৭. বৃষ্টি হলে রাস্তায় পানি জমতে পারে। অনেক সময় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে সেই পানিতে পড়ে হতে পারে দুর্ঘটনার কারণ। কাছে কোথাও বাজ পড়লেও সেই পানি হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের কারণ। ৮. বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। যদি একান্ত বের হতেই হয়, পা ঢাকা জুতো ব্যবহার করা ভালো। রাবারের গামবুট এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো কাজ করবে। ৯. বজ্রপাতের সময় রাস্তায় চলাচলেও খেয়াল রাখতে হবে। কেউ আহত হয়ে থাকলে দেরি না করে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করতে হবে। তবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কাউকে ঘটনার সময় খালি হাতে স্পর্শ করলে নিজেও ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সুজিত কুমার দেবশর্মা বলেছেন, কালবৈশাখীর মৌসুমে বজ ঝড় বেশি হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে দুই থেকে তিনশ’ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ‘যখন কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়, তখনই বজ্র ঝড় হয়ে থাকে। কিউমুলোনিম্বাস মেঘ হচ্ছে খাঁড়াভাবে সৃষ্টি হওয়া বিশাল আকৃতির পরিচালন মেঘ; যা থেকে শুধু বিদ্যুৎ চমকানো নয়, বজ্রপাত-ভারি বর্ষণ-শিলাবৃষ্টি-দমকা-ঝড়ো হাওয়া এমনকি টর্নেডোও সৃষ্টি হতে পারে।

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Print Friendly and PDF

———