fbpx

চট্টগ্রাম, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ , ৮ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিকল্প জ্বালানির উৎস হবে সৌর মিথানল দ্বীপ

ফজলুর রহমান প্রকাশ: ৯ জুলাই, ২০১৯ ১০:৪৯ : পূর্বাহ্ণ

বিকল্প জ্বালানির বিকল্প উৎস আবিষ্কারে সারাবিশ্ব মাতোয়ারা। এরই মধ্যে কিছু উৎস ব্যববহারে সফলতাও এসেছে। তবে বিকল্প জ্বালানির উৎসব কি হতে পারে তা নিয়ে গবেষণায় আরও এক ধাপ এগিয়েছেন নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা।

পরিবেশ থেকে অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড সরিয়ে সেই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে সমুদ্রের পানির মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড ও সবুজ মিথানল উৎপাদন করে তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা।এভাবেই সমুদ্রের পানির মাধ্যমেই পাওয়া যাবে জ্বালানি। এতে করে বুঝা যায়, মাটি খুঁড়ে জীবাশ্ম জ্বালানি খোঁজার দিন শেষ হয়ে আসছে।

বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী,  প্রায় ৭০টি দ্বীপপুঞ্জের সমান আয়তনে একেকটি ১০০ মিটার ব্যাসার্ধের প্যানেল নিয়ে একটি সৌর মিথানল দ্বীপ গড়ে তোলা হবে সমুদ্রের ওপর, যা সূর্যের আলো দিয়ে বিশেষ কিছু প্রক্রিয়া ও সরঞ্জামের মাধ্যমে এই জ্বালানি উৎপাদন করবে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই জ্বালানি উৎপাদনে যে পরিমাণ জায়গা, সৌরশক্তি ও পানির প্রয়োজন, তা একমাত্র সামুদ্রিক অঞ্চলেই পাওয়া সম্ভব। সে কারণে তাঁরা ইন্দোনেশিয়া, উত্তর অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলের সামুদ্রিক অঞ্চলগুলো বেছে নিয়েছেন। প্যানেলগুলো একটা মেমব্রেনের ওপর সূর্যের দিকে মুখ করে বসানো হবে, যা এই প্যানেলগুলোতে ২৪ মেগাওয়াটের শক্তি দেবে।

প্রক্রিয়াটি কি রকম?

সমুদ্রের পানিতে লবণ থাকায় প্রথমে সেই পানি লবণমুক্ত করা হবে। লবণমুক্ত করার পর হাইড্রোলিসিসের মাধ্যমে সেই পানির হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করা হবে। এই প্রক্রিয়াটির জন্য একটি বিশেষ ট্যাংকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ট্যাংকটির সঙ্গে একটি আন্ডারওয়াটার পাইপলাইন যুক্ত করা থাকবে, যা বাষ্প সঞ্চালনের জন্য ব্যবহার করা হবে। আন্ডারওয়াটার পাইপলাইনটি তীরের স্টিম টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এটি এক গিগাওয়াটের শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হবে, যা গ্রিন মিথানল ও কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদনে সাহায্য করবে। এ ছাড়া এই সৌর মিথানল প্যানেলের একটি সংস্করণ মাটিতে করার পরিকল্পনাও রয়েছে বিজ্ঞানীদের।

মাটিতেও করার পরিকল্পনা

এই সৌর মিথানল প্যানেলের একটি সংস্করণ মাটিতে করার পরিকল্পনায় রয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, লক্ষ লক্ষ সামুদ্রিক ভাসমান সৌর মিথানল দ্বীপগুলি সূর্যালোকের দ্বারা চালিত হয়ে কার্বন-ডাই অক্সাইড ও গ্রিন মিথানল বা জ্বালানি উৎপাদন করবে, যা ট্রেন, প্লেন ও জাহাজ চালাতে সাহায্য করবে। তবে আগামী দিনে এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে তা শুধুমাত্র সরঞ্জামের দামের উপর নয়, কতটা পরিমাণ শক্তি যানবাহনে যাবে তার উপর নির্ভর করছে।

এক কথায় বলা যায়, জ্বালানি শক্তির ওপরই নির্ভর করে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব, কিন্তু বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি শক্তির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তাই এই জ্বালানি সংকটের সমাধানের জন্য বিকল্প শক্তির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। একটা তথ্য বিশ্লেষণ করা যাক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিদেশি তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। ওই অঞ্চলে যে পরিমাণ তেল ব্যবহৃত হয়, তার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে সেখানকার অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদনও কমছে, গত এক দশকে সেখানকার তেল উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি ভিন্ন পন্থা অবলম্বন না করে বা বিকল্প জ্বালানির উৎপাদন না বাড়ায়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে তাকে ৯৫ শতাংশ তেল আমদানি করতে হবে—ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি এ কথা বলেছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিই আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র দুর্বলতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কারণ এর মাজেজা হচ্ছে, তার আমদানি অস্থিতিশীল ও কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ২০১৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলো বিদেশি অপরিশোধিত তেলের জন্য ২৭১ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় করেছে, যেটা কিনা বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও স্লোভেনিয়ার সম্মিলিত জিডিপির চেয়ে বেশি। এর প্রায় অর্ধেক টাকাই রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় গেছে!সে কারণে আজকের ইউরোপীয়রা ধারণা করছে তারা যদি তেল আমদানি না করে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন করে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারবে।

তবে কেবল ইউরোপীয়রা নয়, সারা বিশ্বই বিকল্প জ্বালানির নিজস্ব উৎস গড়তে তৎপর। এখাতের গবেষণায় বিপুল অর্থও ঢালছে। এমন একটি গবেষণা হলো, সমুদ্রের পানি থেকে জ্বালানি তৈরি। এই বিকল্প জ্বালানি দিয়ে এক ঢিলে কয়েক পাখি মারা যায়: এতে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ে, সমুদ্র শক্তির সুব্যবহার হয়, গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমে এবং নিজদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার,চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Print Friendly and PDF

———