চট্টগ্রাম, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ , ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ধর্মের বাধা অতিক্রম করে এক হওয়া প্রেমিক যুগল নিখোঁজ ছিল তিনদিন!

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি প্রকাশ: 25 July, 2019 9:59 : PM

ধর্মের বাধা অতিক্রম করে এক হওয়া প্রেমিক যুগল নিখোঁজ ছিল তিনদিন। তারপর যখন তাদের খোঁজ মিললো ততক্ষণে তারা সকল বাধার উর্ধে চলে গেছে। দু’জনই লাশ হয়ে ভাসছে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে। রাঙামাটি শহরের এই তরুণ তরুণীর যুগল ছবি এখন ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে। তবে তিনদিন নিখোঁজের সময় বিষয়টি অনেকে জানলেও ছেলেধরা গুজবের ডামাডোলে কেউ কাউকে বলার সাহস পায়নি।

বৃহস্পতিবার সকালে তাদের লাশ ভেসে উঠে রাঙামাটি কাপ্তাই সড়কের ধার ঘেঁসে গড়ে ওঠা একটি বেসরকারি পর্যটন কেন্দ্রের পাশে। শহরময় খবর চাউর হতে সময় লাগেনি। মুসলিম পরিবারের মেয়েটি হিন্দু পরিবারের ছেলেকে ভালোবেসে প্রাণ দেওয়ার এ কাহিনী যেমন ব্যর্থ প্রেমের এক করুণ কাহিনী, তেমনি এর পেছনে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরণের গল্প। সব কিছুই কেমন যেন রহস্যময় এবং ধোঁয়াটে।

‘লেকার্স পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের একজন ছাত্রী নিখোঁজ’। এমন খবর দু’দিন ধরে বনরূপা, কাঁঠালতলী ও লেকার্স এলাকায় বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। এলাকার নারী মহলে খবরটি ছিল এমন যে, মেয়েটি মুসলিম হয়েও হিন্দু ছেলের সাথে প্রেম করে বিপদে পড়ে এবং তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ‘নষ্ট হয়রানীর শিকার হয়’। এই দুঃখেই মেয়েটি নিরুদ্দেশ হয়েছে।

রাণীর হাট পার্শ্ববর্তী শিলক এলাকার শহীদ তালুকদারের কন্যা তাহফিমা খানম তিন্নি (১৮)। রাঙামাটি শহরে নানার বাড়িতে থেকে পড়শোনা করতো। তবে এই নানা তার আপন নানা নয়, মায়ের ভাই হিসেবে নানা। তিন্নি লেকার্স পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকে বাণিজ্য বিভাগের ছাত্রী।

এদিকে শহরের রিজার্ভ এলাকাতেও তিনদিন ধরে একটি ছেলে নিখোঁজের সংবাদ আলোচনায় ছিল বন্ধু মহলে। প্রান্ত দেওয়ানজি হিমেল(১৮) নামের এই ছেলেটি ২৩ জুলাই সকাল ৭.৩৩ মিনিটে ফেসবুকে নিজের ওয়ালে দেয়া স্ট্যাটাসে লিখেছিল ‘আলবিদা’। এই স্ট্যাটাসের পর থেকেই নিখোঁজ সে।

জানা গেছে, বন্ধুদের মধ্যেই কেউ একজনকে ফোনে সে বড়গাং গেছে বলে জানায়। সেখানে তার ব্যাগ এবং ফোন রয়েছে, ফোনের পাসওয়ার্ডও জানায় বন্ধুকে। তারপর থেকেই সে নিখোঁজ।

প্রান্ত/হিমেল রিজার্ভ বাজারের ঔষধ ব্যবসায়ি ছোটন দেওয়ানজির পুত্র, হিমেল ঢাকার ক্যামব্রিয়ান কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছেলে নিখোঁজের বিষয়ে বাবা থানায় মিসিং ডায়েরী করলেও ইতোমধ্যে বন্ধুদের মাধ্যমে তিনি অবগত ছিলেন একজন মুসলীম মেয়ের সাথে অন্তরঙ্গতার কথা। লজ্জায় তিনি বিষয়টি কাউকে বলতেও পারছিলেন না।

২৪ জুলাই ছেলের বন্ধুরা বড়গাং থেকে তার ব্যাগ এবং ফোনসেট খুঁজে পায় বলে জানা গেছে। সেখানে যাওয়ার পথে তারা দুর্ঘটনারও শিকার হয়। এমন খবরও জানাজানি হয় বুধবার। বৃহস্পতিবার হ্রদের ধারে তাদের লাশ পাওয়া গেলো। লাশ ফুলেনি বা আঘাতের কোনো চিহ্ন আছে কিনা তাও জানা যায়নি।

পুলিশ বৃহস্পতিবার ১২টার দিকে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করে। রাঙামাটি কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপÍ কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক রণি ঘটনার সত্যতা নিশ্চত করে জানান। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হবে।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে প্রেমিক যুগল আত্মহত্যা করেছে। তবে ময়না তদন্তের আগে কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলে সম্ভব নয় বলে জানায় পুলিশ।

দু’জনের প্রেমের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি বিভিন্ন সূত্র থেকে মোটামোটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের যুগল অনেক ছবি রয়েছে তার বন্ধুদের ফেসবুকে। একটি সূত্র জানিয়েছে, ছেলেটি প্রেমিকার জন্মদিন পালন করার জন্যই ঢাকা থেকে ছুটে এসেছিল। তবে কেন তারা আত্মহত্যা করতে গেলো??

বন্ধু মহলে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। দু’দিন তারা কোথায় ছিল? আত্মহত্যা করে থাকলে কিভাবে আত্মহত্য করলো?। সাতার জানা মানুষ পানিতে আত্মহত্যা করাটি কি সহজ? আরো নানা প্রশ্ন। সময় হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে। তবে আবেগ- দুটি সম্ভাবনাময় কিশোরকে অকালে বিনাশ করলো এটাই এখন সকলের মাঝে আলোচনার বিষয়বস্তু।

Print Friendly and PDF

———