চট্টগ্রাম, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ , ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সবে কদর এক মহিমান্বিত রজনী

মাওলানা আব্দুল মোমেন নাছেরী প্রকাশ: ১ জুন, ২০১৯ ৩:৪৪ : অপরাহ্ণ

আন জাবির ইবনে আব্দুল্লাহি রাদিআল্লাহু আনহুমা কালা রসুলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা মান কামা লাইলাতুল কাদরী ইমানাও ওয়া আহদিসাবান গুফরালাহু মাতাকাদ্দামান মিন জানবিহি।

অর্থাৎ জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, হযরত রসুলুল্লাহি (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের জন্য শবেকদরে দন্ডায়মান হয় অর্থৎ নামাজ পড়ে, তার অতীতের সমস্ত গুণাহ মাফ হয়ে যায়। শবেকদর একটি মহান রাত্রি। এই রাত্রি বরকত ও রহমতপূর্ন। অন্য কোনো রাত্রি এই রাত্রির মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে না।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ইন্নাল্লাহা তায়ালা জাইয়ানাললাইয়ালী বিলাইলাতিল কাদরি। অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা শবেকদরের সাথে অন্যান্য রাত্রিসমূহকেও সৌন্দর্য দান করেছেন।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- আফদাদুল লাইয়ালী লাইলাতুল কাদরি। অর্থাৎ রাত্রিসমূহের মধ্যে শবেকদরই উত্তম।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- রমযানের শেষ দশ রাত্রির বিজোড় রাত্রির মধ্যে শবেকদর অনুসন্ধান করো অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও তারিখ।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যদি তোমরা চাও যে, তোমাদের কবর নূরের দ্বারা উজ্জ্বল হোক, তাহলে শবেকদরের রাত্রে এবাদত করো।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি শবেকদরকে জিন্দা রাখে, কিয়ামতের দিন তার দিল মুরদা হবে না এবং আল্লাহতায়ালা তার সগীরা-কবীরা অর্থাৎ ছোট-বড় সমস্ত গুণাহ মাফ করে দেবেন।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি শবেকদরকে জিন্দা রাখে, সে একশত বৎসরের সওয়াব পাবে। এর কারণ এই যে, আল্লাহতায়ালা শবেকদরকে লুকিয়ে রেখেছেন, যেন বান্দা তা তালাশ করবার আগ্রহ রাথে অর্থাৎ প্রেমিকদের মতো অনুসন্ধান করে।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি শবেকদরকে পাবে, আল্লাহতায়ালা তার উপর দোযখের আগুন হারাম করে দেবেন এবং তার সমস্ত অভাব পূর্ণ করে দেবেন।

আবু সাঈদ (রা) বলেছন, আমি রসুলূল্লাহ (দ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, হে রসুলুল্লাহ (দ) শবেকদরের রাত কোনটি ? তিনি বললেন, ‘হে আবু সাঈদ! সেটা রমযানের ২১ তারিখ। পুণরায় হজরত আলী (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে রসুলুল্লাহ (দ)! রমযানের মর্যাদাপূর্ণ রাত্রি কোনটি ? তিনি বললেন, ‘হে আলী (রা) এটি রমযানের ২৩ তারিখ। পুনরায় হজরত সিদ্দিক আবু বকর (রা) জিজ্ঞাসা সকলে তিনি বলেন, ‘আবুবকর সিদ্দিক (রা)! রমযান মাসের ২৭ তারিখের মধ্যে অনুসন্ধান করো তা হলে তুমি তাকে পাবে। অধিকাংশ ওলামা এই মতের সঙ্গে একমত। ইমাম আজম (রহ) এর অনেক রেওয়ায়েত থেকে ওই তারিখ প্রমাণিত হয়েছে। হজরত আবু হানিফা (রহ) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদর’ এর নয়টি হরফ আছে এবং লাইলাতুল কদর’ সূরা কদরের মধ্যে তিনবার এসেছে। সুতরাং নয় হরফকে তিনবার একত্র করলে তিন নয় সাতাশ হয়। এতে ইঙ্গিত হয় যে অবশ্যই ২৭ তারিখের রাত্রিকে শবেকদর বলা হয়। অধিকাংশ বুজুর্গানেদ্বীন এই রাত্রিকেই শবেকদর বলে মেনে নিয়েছেন।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি রমযান মোবারকের ২৭ তারিখ রাত্রিকে জিন্দা রাখে, আল্লাহতায়ালা তার জন্য ২৭ হাজার বৎসরের এবাদতের সওয়াব লেখেন এবং তার জন্য বেহেস্তে কত সংখ্যক ঘর তৈরি করবেন, তা আল্লাহতায়ালাই জানেন।

আল্লাহতায়ালা বলেছেনঃ ‘ইন্না আনজালনাহু;- অর্থাৎ হে মুহাম্মদ (দ) আমি নিশ্চয়ই জিব্রাইল (আ) এর দ্বারা আপনার উপর তাকে অর্থাৎ কুরআনকে নাজিল করেছি। বহু কিতাবে বর্ণিত আছে, যখন জিব্রাইল (আ) আল্লাহর তরফ থেকে সমস্ত কুরআন শরীফ একই সময় লাওহে মাহফুজে পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন, তখন শবে কদরের রাত্রি ছিল। পুনরায় সেখান থেকে আবর্শক অনুযায়ী অল্প অল্প করে হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) এর উপর নাজিল করা হয়েছিল। তারপর আল্লাহতায়ালা বলেছেন- ‘ফি লাইলাতিল কদরি’ অর্থাৎ কুরআনকে লাইলাতুল কদরে বা শবে কদরের রাত্রে নাজিল করেছি। ‘ওয়ামা আদরাকামা লাইলাতুল কদরি’- অর্থাৎ হে মাহুম্মদ (দ) আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর অর্থাৎ শবে কদরের বুজর্গী কী ? লাইলাতুল কদরি খায়রুম মিন আলফি শাহরি’- অর্থাৎ শবে কদর হাজার মাসের রাত্রি থেকে অতি উত্তম, তাই আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি এই রাত্রিতে এবাদত করবে তাকে আমি হাজার মাসের এবাদতের সওয়াব থেকেও বিশি সওয়াব প্রদান করব।’ এরা রাতকে আল্লাহতায়ালা এই জন্য খাস করেছেন যে, একদিন হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) নিজ উম্মতের মধ্যে হজরত শামাউন (আ) সম্পর্কে যিনি বনি ইসরাঈলদের মধ্যে খুব বড় একজন আবেদ অর্থাৎ এবাদতকারী ছিলেন তাঁর বিষয়ে একটি গল্প বলেছিলেন। তিনি আল্লাহর রাস্তায়ই জেহাদ করেছিলেন, তাঁর গল্প খুব বড়। রসুলুল্লাহ (সঃ) এর আসহাবগণ আফসোস করে বলেলেন, ‘হে রসুলুল্লাহ (সঃ) আপনার উম্মতের হায়াত এইরূপ হবে না” তা হলে তারাও এইরূপ এবাদত করতে পারত।’ হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) তখন চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তখন সূরা কদর নাজিল হল। অর্থাৎ হে মুহাম্মদ (দ) আমি আপনার উম্মতের জন্য একটি বুজর্গ রাত্রি প্রদান করব, যা- খায়রুম মিন আলফি শাহরি, অর্থাৎ হাজার মাস থেকেও উত্তম। আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি শবে কদরকে জিন্দা রাখবে, তাকে উক্ত ‘লাইলাতুল কাদরির’ এবাদতের সওয়াব থেকেও বেশি সওয়াব প্রদান করব।’

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘মান আদরাকা লাইলাতুল কদরি রাফাল্লাহ কাদরুহু ইয়াওমাল কিয়ামাতি।’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি শবে কদর পাবে এবং শবে কদরের নামাজ পড়বে, আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন তাকে উচ্চ মর্যাদা প্রদান করবেন।’ হজরত উবাইদ বিন উমর (রা) বলেছেন, ‘আমি সাতাশে রমযানের রাত্রিতে সূরা সাগরে জাহাজে চড়ে গিয়েছিলাম। যখন উক্ত সাগরের পানির স্বাদ গ্রহণ করলাম তখন দেখলাম, পানি খুব মিঠা, আর আমাদের জাহাজ চলা বন্ধ হয়ে গেল। তখন আমরা একটি দ্বীপের নিকটবর্তী হলাম, এবং দেখলাম, সমস্ত বৃক্ষ সিজদায় পড়ে আছে।’ শবে কদরের নিশানায় ইমাম নাওবি (রা) এইরূপ বর্ণনা করেছেন যে, যখন শবেকদর আবির্ভূত হয়, তখন ওই রাত্রে লক্ষ লক্ষ ফিরিশতা নাজিল হয়ে তাদের সাথে মুসাহফা করেন, যারা ওই রাতকে জিন্দা রাখেন। তাদের মুসাহফা করার নিশানা এই যে, ওই সময়ে অন্তঃকরণে অত্যন্ত খুশি অনুভূত হয়, চোখ থেকে অশ্রু নির্গত হয় এবং আল্লাহর দিকে মহব্বত খুব বেশি রকম হয়। ওই সময় বুঝে নেবে যে দোওয়া অবশ্যই কবুল হবার সময়। হজরতগণ তা পরীক্ষা করেছেন।

‘গাজীয়াতু-ত্বলিবীন’ নামক কিতাবে একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, যখন শবে কদর আবির্খত হয় তখন আল্লাহতায়ালা জিব্রাইল (আ) কে হুকুম করেন। জিব্রাইল (আ) বহু ফিরিশতা নিয়ে পৃথিবীতে আসেন। প্রত্যেক ফিরিশতার সঙ্গে সবুজ রঙের নেজা এবং জিব্রাইল (আ) এর সঙ্গে ছয়শত পাখা থাকে। জিব্রাইল (আ) কাবার উপর এসে হুকুম করেন। তারপর ওই ফিরিশতাদের মধ্যে কতক ফিরিশতা পূর্বদিকে ও কতক ফিরিশতা পশ্চিমদিকে যায়। জিব্রাইল (আ) ওই ফিরিশতাদেরকে হুকুম করেন ‘আজ রাতে তোমরা উম্মতে মুহাম্মদীর নিকট যাও।’ তারপর তারা তাদের কাছে আসে এবং যারা উক্ত বুজর্গ রাত্রিকে জিন্দা রাখে অর্থাৎ নামাজ পড়ে এবং নিজের মা’বুদকে স্মরণ করে তাদের সাথে মুসাহফা করে এবং ফজর হওয়া পর্যন্ত বান্দাগণ যে দোওয়া প্রার্থনা করতে থাকে তাদের সাথে তারা ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলতে থাকে। পরে জিব্রাঈল (আ) ডেকে বলেন, ‘হে আল্লাহর দোস্তগণ! তোমরা এখন চলে যাও।’ তারপর ফিরিশতাগণ জিজ্ঞাসা করেন, জিব্রাঈল (আ)! ঈমানদার উম্মতে মুহাম্মদীর কী অভাব পূর্ণ করেন ? জিব্রাঈল (আ) উত্তরে দেন, ‘হে ফিরিশতাগণ ! আল্লাহতায়ালা তাদের উপর সত্তরবার দৃষ্টিপাত করেন এবং তাদের সমস্ত গুণাহ মাফ করে দেন।’ আল্লাহতায়ালা চার প্রকার লোককে মাফ করবেন না। হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ওই চার প্রকার লোক হল- ১) সর্বদা যে ব্যক্তি মধ্যপানে আসক্ত। ২) যে ব্যক্তি পিতা-মাতার অবাধ্য। ৩। যে ব্যক্তি আত্মীয়-স্বজনের সংশ্রব পরিত্যাগ করে। ৪) যে ব্যক্তি মুসলমানদের সাথে শক্রতা করে। আল্লাহতায়লা বলেছেন- ‘তানাজ্জালুল মালাইকাতু ওয়াররুহ ফিহা বিইজনি রাব্বিহিম মিন কুল্লি আমরি’। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা হুকুমে ফিরিশতাগণ এবং রুহ ওই রাত্রে প্রত্যেক কাজের জন্য নাজিল হন। অধিকাংশ আলেম বলেছেন রুহ হজরত জিব্রাইল (আ) এর অপর নাম। কেউ কেউ বলেন, রুহ এক ফিরিশতার নাম যিনি রুহসমূহের ভারপ্রাপ্ত।

আল্লাহতায়ালা বলেছেন- ‘সালামুন হিইয়া হাত্তা মাতলাইল ফাজলি।’ অর্থাৎ ওই রাত্রে ফজর হওয়া পর্যন্ত শান্তি বিরাজমান থাকে সুতরাং ওই রাত্রিকে জিন্দা রাখবে এবং কুরআন শরীফ তেলাওয়াত ও জিকির আজকার করবে। এমনকী কয়েক রাকায়াত নামাজ পড়া উচিত, তা হলে বহু সওয়াব পাওয়া যায়।

হজরহ রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি রমজানের ২৭ তারিখের শবে কদরের রাত্রিতে প্রত্যেক রাকায়াতের সূরা ফাতেজার পর সূরা ‘ইন্না আনজালনা’ ১ বার, এবং সূরা ‘ইখলাস’ ২৭ বার পড়ে চার রাকায়াত নামাজ পড়ে, তা হলে সে সমস্ত গুণাহ থেকে পাক হয়ে যাবে, যেন মায়ের উদর থেকে এখনই ভুমিষ্ঠ হয়েছে। আল্লাহতায়ালা তাকে বেহেশতের মধ্যে এক হাজার বালাখানা দান করবেন।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি শবেকদরের রাত্রিতে সুরা ফাতিহার পর ১ বার সূরা ‘ইন্না-আনজালনা’ ও তিন বার সূরা ‘এখলাস’ দ্বারা দুই রাকায়াত নফল নামাজ পড়বে, আল্লাহতায়ালা রুজি বৃদ্ধি করবেন এবং তাকে হজরত উদ্রিস (আ) হজরত শোয়ায়েব (আ) এর সওয়াব দান করবেন। তাকে আল্লাহতায়ালা বেহেশতের মধ্যে মাশকের থেকে মাগরিব পর্যন্ত বড় একটি শহর দান করবেন।

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি রমযান মাসের ২৭ তারিখের রাত্রিতে প্রত্যেক রাকায়াতে সূরা ফাতিহার পর ৩ বার ‘ইন্না-আনজালনা’ ও ৫০ বার সূরা ‘এখলাস’ পড়ে চার রাকায়াত নামাজ পড়বে এবং সালাম ফেরাবার পর সেজদায় গিয়ে পড়বে-সুবহানাল্লাহি আল-হামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার।’ তারপর সেই ব্যক্তি যে দোওয়া আল্লাহতায়ালার দরগাহে চাইবে তা অবশ্যই কবুল হবে। আল্লাহতায়ালা তাকে অসীম নিয়ামত দান করবেন এবং সমস্ত গুণাহ মাফ করে দেবেন।’

হজরত রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- মাসের ২৭ তারিখের রাত্রিতে নামাজের নিয়ত করে গোসল করে, পা ধোয়ার আগেই আল্লাহতায়ালা তার সমস্ত গুণাহ মাফ করে দেবেন। শবে কদরের রাত্রে ওই দোওয়া পড়া আবশ্যক- আল্লাহুম্মা ইন্নকা আফুউন তুহিব্বুল আফুউন ফায়াফু আন্নি ইয়া গাফুরু, ইয়া গাফুরু।

লেখক মোফাচ্ছিরে কোরআন পীর সাহেব মিরসরাই দরবার শরীফ (সোবহানীয়া কমপ্লেক্স) চট্টগ্রাম।

Print Friendly and PDF

———