চট্টগ্রাম, সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯ , ৩রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ঈদকে ঘিরে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা সক্রিয়

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রকাশ: ২০ মে, ২০১৯ ১১:৫৬ : পূর্বাহ্ণ

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে ঘিরে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তৎপরতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। হুন্ডি ব্যবসায়ীরা মাসে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করে বলে খবর পাওয়া গেছে। আর এতে সরকার কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

জানা গেছে, মিরসরাইয়ের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বয়ে যাওয়া জনবহুল বাজার দারোগারহাট, নিজামপুর,বড়তাকিয়া, মিরসরা সদর, বারইয়ারহাট, জোরারগঞ্জ, মিঠাছড়ায়, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী নেতৃত্বের পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চল তথা ডোমখালী,সাহেরখালী,বড়দারোগাহাট আবুতোরাব, মায়ানী, শান্তিরহাট, কাটাছড়া,বামনসুন্দর দারগারহাট, ঝুলনপোল, আবুরহাট ও ভারতীয় সীমান্তবর্তি করেরহাটসহ বেশকয়েকটি গুরুত্বপূর্ন এলাকায় হুন্ডি ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা রয়েছে।

জানা গেছে, ব্যাংকিংয়ে নানা হয়রানির অজুহাতে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ থেকে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হুন্ডি। বিশেষত রমজানের ঈদকে সামনে রেখে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসছে হুন্ডির মতো নন-ব্যাংকিং চ্যানেলে। আন্তর্জাতিক স্বর্ণ ও মুদ্রা চোরাচালান চক্রের এজেন্ট হিসেবে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট মিরসরাইয়ের এই হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বর্ণ ও মুদ্রা চোরাচালানের পাশাপাশি হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। নগর গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, শুধু রমজানে নয়, সারা বছরেই হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসীদের টাকা দেশে আসে।
মিরসরাইয়ের পশ্চিম মায়ানী এলাকার ছেলে মেহেদী (ছদ্মনাম) দীর্ঘদিন ধরে দুবাই থাকেন। তিনি ব্যাংকিং চ্যানেলে না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠান। দুবাইয়ে থাকা হুন্ডির এজেন্টদের কাছে টাকা জমা দিয়ে দেশে তার ছোট ভাই সুমন (ছদ্মনাম) ফোনে জানিয়ে দেন। প্রাসী ভাইয়ের কাছ থেকে ফোন পাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই রিয়াদের ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে বলা হয়, ‘ভাই আপনার একটি চালানি আছে?’ এপাশ থেকে সম্মতিসূচক জি বলতেই অপর প্রাপ্ত থেকে বলা হয়, কত?। সুমন বলেন, ‘এক ত্রিশ’। অপর প্রান্ত থেকে নিশ্চিত হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই রিয়াদের দেওয়া ঠিকানায় চলে আসে অপরিচিত ওই ব্যক্তি। এক হাজার টাকার বান্ডেল এবং আরো ৬০টি ৫শ টাকা নোট দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন অপরিচিত ওই ব্যক্তি। কথোপকথনের ‘এক ত্রিশ মানে এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা।

এভাবে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয় হুন্ডিতে। শুধু দুবাই প্রবাসী মেহেদী নন, প্রবাসীদের একটি বড় অংশ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করা প্রবাসীদের বেশিরভাগই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রবাসীদের অভিযোগ, ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে হয়রানির শিকার হতে হয়। কিন্তু হুন্ডিতে টাকা দেওয়ার ঘণ্টার মধ্যেই ঘরে পৌঁছে যায়।

প্রবাসীদের এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মিরসরাইয়ে হুন্ডির কয়েকটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের নিয়ন্ত্রন করে চট্টগ্রাম শহরের রিয়াজুদ্দিন বাজার ও তামাকুমন্ডি লেইনের কয়েকটি সিন্ডিকেট।

জানা যায়, চলতি বছরের ৩ মার্চ জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনাপাহাড় এলাকায় একটি প্রাইভেটকারে তল্লাশি চালিয়ে ২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের ৬শ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধার করে পুলিশ। দুই ঘটনায় জড়িতরা রিমান্ডে এসব স্বর্ণ রিয়াজুদ্দিন বাজার থেকে পাচারের জন্য নিয়ে যাচ্ছিল বলে স্বীকার করে।

জানা গেছে, মিরসরাইয়ের দুটি পৌরসভা এবং ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কাজের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এদের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি স্বজনদের কাছে টাকা পাঠানোর ভরসা রাখেন হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ওপর। এসব মানুষের প্রতি মাসে টাকা লেনদেনের হার ৫০ প্রায় কোটি টাকারও বেশি বলে এক হিসাবে জানা গেছে। হুন্ডি ব্যবসায়ীরা তাদের টাকায় বিভিন্ন ব্যবসা করে বলে জানা গেছে। আবার কখনও কখনও হুন্ডি ব্যবসায়ীরা প্রবাসীদের টাকার মাধ্যমে জাল টাকার নোটও ছড়িয়ে দেয়। এত করে সাধারণ নিরীহমানুষ নানান দুর্ভোগের শিকার হয়। দীর্ঘকাল ধরে এ ব্যবসায় একশ্রেণীর হুন্ডি ব্যবসায়ীদের পকেট ভারি হলেও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। প্রশাসনিক ভাবে হুন্ডি ব্যবসা বন্ধে এ যাবৎকালে কোন অভিযানও চোখে পড়েনি। ফলে একপ্রকার স্বাভবিকভাবেই এ ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারী ব্যাংকের মিরসরাই শাখার ব্যবস্থাপক বলেন, ‘এখন বিদেশ থেকে দেশে টাকা পাওয়া একেবারে সহজ হয়ে গেছে। তারপরও কিছু কিছু প্রবাসী হুন্ডির মাধ্যম টাকা পাঠাচ্ছে। এতে একদিকে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে ঝুঁকি থাকে টাকা নিয়ে। আমরা প্রবাসী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের হুন্ডির মাধ্যমে টাকা না পাঠাতে অনুরোধ করে আসছি। ইতমধ্যে অনেকে ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ থেকে টাকা পাঠাচ্ছে।’

এই ব্যাপারে মিরসরাই থানার ওসি (তদন্ত) বিপুল চন্দ্র দেবনাথ জানান, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। তবে এখনও কোন লিখিত অভিযোগ থানায় দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Print Friendly and PDF

———