চট্টগ্রাম, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯ , ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ফরমালিন আতঙ্কে খাওয়া ছেড়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতি!

সিটিজি টাইমস ডেস্ক প্রকাশ: ১৪ মে, ২০১৯ ১২:০৪ : অপরাহ্ণ

জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন-বিরোধী অভিযানে কয়েক বছর আগে সারা দেশে ধ্বংস করা হয় ফলমূল। মাছের বাজার আর শাক-সবজির কাঁচা বাজারেও চলে এই অভিযান। ওই সময় লাখ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের।

সম্প্রতি জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফল-মূল, শাক-সবজি সংরক্ষণে ফরমালিনের কোনো ভূমিকা নেই। মাছের বেলায়ও তাই। অথচ ফরমালিনের দোহাই দিয়ে ফলমূল, শাক-সবজি খাওয়া ছেড়ে দিয়ে অনেকে নিজেরই ক্ষতি করছেন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পরিচালক কৃষিবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘‘ওই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল৷ ফল-মূল এবং শাক-সবজি ফরমালিন দিয়ে সংরক্ষণ করা যায় না। আর সংরক্ষণের কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি, যা হয়েছে তা ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।”

২০১৩ সালে খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয় বাংলাদেশে। একইসঙ্গে খাদ্য সংরক্ষণে যে কোনো অননুমোদিত রাসায়নিক প্রয়োগের অপরাধে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে আইন তৈরি হয়। আর ২০১৫ সালে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন করে এর ব্যবহার ও আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দেয়।

ড. মনিরুল বলেন, ‘‘ফল মূল, শাক-সবজি এগুলো হলো ফাইবার। এখানে ফরমালিন দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই৷ কেউ যদি না বুঝে দেয়ও, তাহলেও কোনো কাজে আসবে না। সংরক্ষণে কোনো ভূমিকা রাখবে না। কারণ, এখানে কোনো প্রোটিন নেই।”

আমদানি করা আপেলে এক ধরনের এডিবল প্যারাজিন দেওয়া হয়৷ এটা খাওয়ার যোগ্য- উল্লেখ করে বলেন, “আপনি-আমি যে আপেল খাই, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সেই একই আপেল খান। বিদেশে গেলে একটা আপেল, একটা মালটা নিয়ে আসবেন দেড় বছরে কিছু হবে না। এটা হলো সায়েন্স। এটা এডিবল প্যারাজিন দিয়ে করা হয়। এখন ফলের খোসা দিয়ে কোটিং তৈরি করা হয়। আবার স্টিকার বের হয়েছে, যা ফলের ওপরে লাগানো থাকে, ওই রকম স্টিকার, যা দিয়ে আমের লাইফ দুই সপ্তাহ বাড়ানো যায়। এখানে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”

তবে আগাম আম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আমের একটি ক্যালেন্ডার আছে৷ তাই ২০ থেকে ২৫ মে-র আগে আম খাওয়া ঠিক নয়৷ আগাম পেড়ে ফেলা আম কারবাইড দিয়ে পাকানো হয়। সরকারের উচিত হবে মার্চ-এপ্রিলে যে আম আমদানি হয়, তা বন্ধ করা। দুই মাস এলসি বন্ধ রাখা৷ কারণ, সেগুলো শতভাগ কারবাইড দিয়ে পাকানো হয়।”

এ কৃষিবিজ্ঞানী বলেন, ‘‘আমের মুকুল বা গুটি আমে যে কীটনাশক দেওয়া হয়, তা এখন ১৫-২০ দিনের বেশি থাকে না। তাই আতঙ্কের কিছু নেই।”

মাছে ফরমালিন প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘যে মাছ পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়, যেমন মলা, কাচকি মাছে এক সময় দশমিক তিন থেকে পাঁচ ভাগ ফরমালিন কেউ কেউ সময়-সময় ব্যবহার করতো৷ ফরমালিনের এমন ঝাঁজালো গন্ধ, যা বেশি ব্যবহার করা যায় না। এটা ধুয়ে ফেললে আর থাকে না। তবে এটা এখন আর দেওয়াই হয় না।”

ড. মনিরুলের মতে , ‘‘আমরা আসলে ফরমালিন আতঙ্কে ভুগছি। এটা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তৈরি করে ফল-মূল, শাক সবজি। এখন আমরা আতঙ্কে তা খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছি। এটা আমাদের অনেক বড় ক্ষতি করছে।”

ফরমালিন টেস্টের পদ্ধতি এবং কীট নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘ফরমালিন টেস্টের নামে যেসব কিট এখানে ব্যবহার করা হয়েছিল, ওই কিটগুলো ঠিক ছিল না। সেটা তখন বলায় বেনজীর আহমেদ (ডিএমপি’র তখনকার কমিশনার) আমাকে অ্যারেস্ট করতে চেয়েছিল। কিন্তু আদালতের নির্দেশে আমেরিকায় পরীক্ষা করে এখন প্রমাণ হয়েছে ওই কীটগুলো ঠিক ছিল না।”

এদিকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মাহবুব কবীর বলেন,‘‘এখন দেশে ফরমালিনই নেই। সুতরাং ফরমালিন মেশানোর সুযোগও নেই। ২০১৫ সালে এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, ফরমালিন ফল-মূল সংরক্ষণে কাজ করে কিনা। প্রোটিন বন্ডেজ ছাড়া সেলুলোজ বন্ডেজে ফরমালিন দিলেও কাজ করবে না। কাজেই কেউ যদি অতীতে শাক-সবজি, ফল-মূল সংরক্ষণে ফরমালিন দিয়েও থাকেন, তা কাজে আসেনি। আসবেও না।”

Print Friendly and PDF

———