চট্টগ্রাম, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯ , ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রোজার তাৎপর্য ও শিক্ষা

মাওলানা আবদুল মোমেন নাছেরী প্রকাশ: ১০ মে, ২০১৯ ৩:৪২ : পূর্বাহ্ণ

রোজা ফারসি শব্দ। এর অর্থ উপবাস। আরবী প্রতিশব্দ সাওমের প্রতিশব্দ বিরত রাখা, বারন করা বা ফিরিয়ে রাখা। ইসলামের পরিভাষায় সুবহি সাদিক থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোন ধরনের পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। রোজা ইসলামের পঞ্চ ভিত্তির অন্যতম। দ্বিতীয় হিজরী শাবন মাসে মুসলমানদের উপর রোজা ফরজ হয়।

এখন বিশ্লেষন করা প্রয়োজন, রোজার উদ্দেশ্য কি? জীবনের উপর তার প্রভাব কি? গোটা রমজান মাস সিয়াম সাধনার অনুশীলনের পর শাওয়ালের প্রথম তারিখেই ইবাদতের সকল প্রভাব বিলুপ্ত হয় কেন, এর মূল কারন রোজার উদ্দেশ্য হাসিলের ব্যার্থতা।

তাই চিন্তা করা প্রয়োজন, রোজার আসল উদ্দেশ্য কি? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা বাকারার ১৮৩নং আয়াতে বলেন, “হে ইমানদার ব্যক্তিগন, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে।

যেমন ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর. যেন তোমরা তাকওয়ার গুন অর্জন করতে পার।” এ আয়াত থেকে বুঝা গেলো রোজার উদ্দেশ্য শুধু না খেয়ে কষ্ট পাওয়া না। আসল উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে তাকওয়ার গুন সৃষ্টি করা। এর সমর্থনে হযরত মুহাম্মদ (স) বলেন, “এমন অনেক রোজাদার আছে, কেবল ক্ষুদা আর পিপাসা ছাড়া তাদের কপালে আর কিছু জুটে না। ”

এর দ্বারা ভালোভাবেই বোঝা যায়, শুধু ক্ষুদার্ত ও পিপাসায় কাতর থাকা ইবাদত নয় বরং আল্লাহর আইন ভঙ্গ না করা, যে কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায় আল্লাহকে ভালোবেসে সেইসব কাজ আগ্রহের সাথে পালন করাই ইবাদত। এ জন্য রোজা রেখে বেশি পরিমানে নেক কাজ করা উচিত।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুম রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, সিয়ামের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং জৈবিক চাহিদা সমুহের মধ্যে স্থুলতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠা করা।

সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে। চিরন্তন জীবনের অনন্ত সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরোহন করে। পশুত্ব নিস্তেজ হয়ে মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয়। দারিদ্যপিড়িত মানুষদের জন্য সহানুভুতি জাগে। রোজা মানুষের শারিরিক ও আত্মিক শক্তির উন্নতি সাধন করে। পাশবিক চাহিদার প্রাবল্য যা মানুষের স্বাস্থ ধ্বংস করে তা থেকে রোগমুক্তি দেয়।

ইমাম গাজ্জালী ইহইয়াউল উলুম গ্রন্থের প্রথম খন্ডের ২১২ পৃষ্ঠায় লেখেন, আখলাকে ইলাহী বা আল্লাহর গুনে মানুষকে গুনান্বিত করাই সিয়ামের উদ্দেশ। সিয়াম মানুষকে ফেরেসতাদের অনুকরনের মাধ্যমে,যতদূর সম্ভব নিজেকে প্রবৃদ্ধির গোলামী থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। মানুষের মাঝে সহজাত এমন কিছু প্রবৃত্তি আছে যা বাঁচার জন্য প্রয়োজন, যেমন- খাদ্য গ্রহন প্রবৃত্তি, আত্মস্থ প্রবৃত্তি, আত্মপ্রতিষ্ঠা প্রবৃত্তি, ক্রীড়া, যৌন ও বিশ্রাম প্রবৃত্তি।

প্রত্যেক প্রানীই এসব প্রবৃত্তির চরিতার্থ চায়। কোন প্রাণীই এইসব প্রবৃত্তির চরিতার্থ করার ব্যপারে বাধা নিষেদ মানতে চায় না। কিন্তু মানুষকে এইসব প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রন করতে হয়। যেমন, অন্য প্রানীর খাবারের চাহিদা হলে সে সামনে যা পাবে তাই খায়।

কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে চিন্তা করতে হয় আমি যা খাচ্ছি তা হালাল না হারাম। তা খাওয়ার অধিকার আছে কিনা। এভাবেই বিবেক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রন করে। এই বিবেক শক্তিকে পাশবিক শক্তির চাইতে শক্তিশালী করার অনুশীলন করা হয় সিয়াম সাধনার মাধ্যমে।

তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রোজা ফরজ করেছেন মানুষের রূহানী রোগের চিকিৎসা করে এক আল্লাহর সাথে মানুষের গভীর সম্পর্ক সৃষ্টির জন্যে। সর্বপরি তাকওয়ামন্ডিত জীবনযাপন অভ্যস্ত করে তোলার জন্যই রোজা ফরজ করা হয়েছে।

আমাদেরকে রোজার উদ্দেশ্য অনুধাবনের পর জানতে হবে তাকওয়া কি? তাকওয়া আরবি শব্দ। মূল ধাতু বেকায়াতুন। অর্থ- বাঁচা, মুক্তি, সতর্কতা, ভয়। শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে আল্লাহর নির্দেশিত ও রাসুল স. এর পথে জীবন পরিচালনা করা। জীবনের কোন বিভাগে আল্লাহর হুকুম যেন লঙ্গন না হয়, সে সতর্কতার সাথে চলার নামই তাকওয়া।

এরূপ তাকওয়ামন্ডিত জীবন যাদের তারা আখিরাতের শাস্তি থেকে নিস্তার পাবে। সূরা বাকারার ২ নং আয়াতে মুত্তাকীদের পরিচয় এভাবে দেয়া হয়েছে,-তারা গয়েবের প্রতি বিশ্বাস করে, সালাত কায়েম করে, আল্লাহর দেয়া রিজিক থেকে খরচ করে, শেষ নবী মুহাম্মদ স. ও তার পূর্ববর্তী নবীদের উপর নাজেল হওয়া কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে। সূরা বাকারার ১৭৭ নং আয়াতে মুত্তাকীদের গুনাবলী এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, – আল্লাহ, আখিরাত, ফেরেসতা, নবী রাসুলদের প্রতি যথাযথ ইমানের ঘোষনা দান।

আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নিকটাত্মীয়, গরিবদুঃখীদের মাঝে অকাতরে অর্থ দান। সালাত কায়েম ও যাকাত দেওয়া। ওয়াদা পূর্ণ করা ও সবর করা। সর্বাবস্থায় যারা এইসব গুনের অধিকারী তারা মূলত সত্যবাদি এবং তাকওয়ার অধিকারী। তাই রোজা পালনের সাথে সাথে উপরিউক্ত গুনাবলী অর্জনে, সদা তৎপর থাকতে হবে। তাহলেই সিয়ামসাধনার উদ্দেশ্য সফল হবে।

রোজার সামগ্রিক বিধিবিধানঃ

১। রোজা মানুষের মাঝে সামাজিক সম্পর্ক, ঐক্য ও ভাতৃত্বের গুন সৃষ্টি করে। যেমন হাদিসে রসুল স. বলেন, যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করায় তার এ কাজ তার গুনাহ মাফ ও জাহান্নামের আগুন থেকে মাফ পাওয়ার কারন হবে। এ হাদিসে মুসলমান ভ্রাতৃত্ব বন্ধন অটুট রাখার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

২। রোজা সমবেদনা অনুভুতির গুন সৃষ্টি করে। বিত্তবান ধনীরা রোজার রাখার মাধ্যমে বুঝতে পারে গরিবদের পেটের জ্বালা। রোজা অসহায় নিঃস্ব মানুষদের প্রতি এগিয়ে আসার অনুপ্রেরনা যোগায়। রাসুল স. বলেন, সে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ মুমিন নয় যে পেটভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী অভুক্ত। রোজা অভুক্তদের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে।

৩। মানবজীবনের ইচ্ছাশক্তি ও ব্যবহারিক সংযমশীলতা নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে রোজা ফলপ্রসু শিক্ষা দেয়।

৪। রোজা ব্যক্তিগত আচার আচরন সংশোধনের শিক্ষা দেয়। রসুল স. বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্য কথা ও পাপকাজ ত্যাগ করতে পারবে না তার না খেয়ে থাকা আল্লাহর দরকার নেই।

৫। রোজা সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করে। রসুল স. বলেন, যে ব্যক্তি রোজা রাখবে তার দাঙ্গা হাঙ্গামা থেকে বিরত থাকা উচিত। কেউ গালি দিলে বা ঝগড়া ফাসাদ করলে পরিষ্কারভাবে বলা উচিত, ভাই আমি রোজাদার। রোজা এমনি ভাবে সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করে।

৬। কষ্ট সহিষ্ণুতা ও পরিশ্রম প্রিয়তার শিক্ষা দেয়। বছরের একটি মাস ধারা বাহিক প্রোগামসূচি রোজাতে বিদ্যমান। সুবহি সাদিক থেকে সন্ধা পর্যন্ত রোজা রেখে, ইফতারির পর দেহ বিশ্রাম চায় অথচ তার পরও অন্য সময়ের চেয়ে ২০ রাকাত বেশি তারাবিহর নামাজ পড়তে হয়। তারাবি পড়ে মাত্র কিছ ঘন্টা ঘুমিয়ে আবার সেহরির জন্য উঠতে হয়। এরপর ফজর পড়তে হয়। এভাবে রোজা আমাদের কষ্টসহিষ্ণু হতে সাহায্য করে।

৭। রোজা মানুষকে ধৈয্যশীলতা ও নিঃস্বার্থপরতার শিক্ষা দেয়।

৮। রোজা মানুষকে নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা দেয়। এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রেরনা জোগায়।

৯। তাকওয়ার গুন সৃষ্টি করে। মানুষ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরন করতে গিয়ে, একমাত্র আল্লাহকে ভয় করার শিক্ষা দেয় মাহে রমজানের রোজা।

আল্লাহ আমাদের রোজার শিক্ষা বাস্তবায়নের তৌফিক দিন। আমিন।

লেখক: মাওলানা আবদুল মোমেন নাছেরী, পীর সাহেব, মিরসরাই দরবার শরীফ, প্রবন্ধকার ও বহুগন্থ প্রণেতা

Print Friendly and PDF

———