চট্টগ্রাম, সোমবার, ২৪ জুন ২০১৯ , ১০ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিজেপি ক্ষমতায় আসলে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসন!

সিটিজি টাইমস ডেস্ক প্রকাশ: ২০ মে, ২০১৯ ১১:৪১ : পূর্বাহ্ণ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির অযুহাত তৈরি করছে বিজেপি। এমন খবর দিয়েছে সাউথ এশিয়ান মনিটর। প্রতিবেদনটি লিখেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক।

সুবীর ভৌমিকের প্রতিবেদনটি এখানে তুলে ধরা হলো:

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনকালীন সহিংসতার খবর টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং বিশেষ অনুষ্ঠানে এটা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, যেখানে এমনকি ব্যক্তির নাম ধরে কুৎসা এবং চিৎকার চেঁচামেচি পর্যন্ত হয়েছে। এগুলো সবই একটা উদ্দেশ্য হাসিলে সাহায্য করেছে।

এটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সঙ্ঘাত-কবলিত পশ্চিমবঙ্গ এবং জঙ্গি-কবলিত কাশ্মিরের মধ্যে তুলনা করতে সাহায্য করেছে। একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জম্মু ও কাশ্মিরের নির্বাচন পশ্চিম বঙ্গের চেয়ে বেশি শান্তিপূর্ণ হয়েছে।

মোদি বলেন, “কাশ্মিরে পঞ্চায়েত নির্বাচনে একটি পোলিং বুথেও সহিংসতা হয়নি। কিন্তু একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বেশ কয়েকজন মানুষ নিহত হয়েছে; যারা জিতেছে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে ঝাড়খাণ্ড ও অন্যান্য রাজ্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের একমাত্র ত্রুটি ছিল যে, তারা নির্বাচনে জিতেছিল।”

এক সপ্তাহ পরেই, আরেকটি টিভি নেটওয়ার্ক ‘চমক লাগানো’ খবর নিয়ে আবির্ভূত হয়। সেখানে সূত্র হিসেবে পশ্চিম বঙ্গের কোমলভাষী গভর্নর কে এন ত্রিপাঠিকে ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয় অমিত শাহের রোড শো’র সময় এবং বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার বিষয়ে ব্রিফ করতে অস্বীকার করেছেন রাজ্যের মুখ্য সচিব।

টিভি অ্যাঙ্কার পশ্চিম বঙ্গে ‘সুশাসন নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ’ প্রকাশ করে এজন্য পশ্চিম বঙ্গে প্রশাসনকে দোষারোপ করেন, যেটার নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন মমতা ব্যানার্জি এবং যিনি সমস্ত নিয়ম নীতিকে ছুড়ে ফেলেছেন। কারণ হাজার হলেও মোদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বীকার করতে রাজি হননি মমতা।

কলেজ স্ট্রিটের মারামারির ঠিক আগ দিয়ে একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী যিনি এখন স্বঘোষিত বিজেপি’র ‘চৌকিদার’, তিনি একটি ভুয়া খবর ছড়ান যে, বাংলার প্রশাসন গুজরাটিদের বহিষ্কারের হুমকি দিয়েছে। এর ফলে একটি টিভি চ্যানেলের উত্তেজিত একজন টিভি অ্যাঙ্কার সরাসরি অনুষ্ঠানে আমাকে প্রশ্ন করেন: “বাঙালিদেরকে আসামে হুমকি দেয়া হলে আপনি অভিযোগ করেন, কিন্তু অ-বাঙালিদের সাথে একই ধরনের আচরণ করছেন আপনি”। আমি তাকে অবগত করি যে এটা ভুয়া খবর, যেটা আসলেই ভুয়া ছিল, কিন্তু আমি বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলার আগেই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়।

আরেকটি টিভি নেটওয়ার্কে বিশেষ প্রোগ্রাম সম্প্রচার করা হয়, যার শিরোনাম ছিল “ইস দিস দ্য নিউ ইস্ট পাকিস্তান!”

কলেজ স্ট্রিটের সঙ্ঘাতের কয়েক মিনিটের মধ্যে নির্মলা সীতারামন এবং মুখতার আব্বাস নাকভির নেতৃত্বে বিজেপি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে হাজির হয়ে দাবি করেন যাতে প্রচারণা থেকে মমতা ব্যানার্জিকে নিষিদ্ধ করা হয়, কারণ তিনি চরম উসকানিমূলক বক্তৃতা দিচ্ছেন।

মমতা মোদির সাথে তীব্র মৌখিক লড়াইয়ে নেমেছেন, তাতে বিজেপি নিঃসন্দেহে হোচট খেয়েছে। মোদিকে তিনি বারবার ‘মেয়াদোত্তীর্ণ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে মোদি তাকে বারবার ‘স্পিডব্রেকার দিদি’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন।

এই কথায় হয়তো তার ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি, শক্তি পুরুষালি ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিজেপির নির্বাচনী সম্পদকে খাটো করা হয়েছে – কারণ খর্বকায় হওয়া সত্বেও ব্যাপক ফিট (প্রচারণার শেষ দিন মমতা ২০ কিলোমিটার হেঁটেছেন) এবং লড়াকু বাঙালি নারী এমনকি তাকে ‘মোদি গুন্ডা’ এবং ‘চৌকিদার চোর’ হিসেবে সম্মোধন করেছেন।

হিন্দি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে যখন চোখ রাখছিলাম, দেখলাম যে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ পশ্চিম বঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসন দাবি করছেন। শেষ পর্যন্ত বিড়াল বেরিয়ে এলো ব্যাগ থেকে, যেটা আমি দীর্ঘ সময় ধরে অনুমান করছিলাম।

কলেজ স্ট্রিটের মারামারির একদিন পরে নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত গেরুয়াদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এবং নির্ধারিত সময়ে আগে ২৪ ঘন্টা পশ্চিম বঙ্গে প্রচারণা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

মমতা ব্যানার্জি তার স্বভাবসুলভ ঔদ্ধত্বের সাথে ইসিকে প্রশ্ন করেন আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি এতটাই খারাপ হয়, তাহলে প্রচারণা এখনই বন্ধ করছেন না কেন। সেটা করা হবে না কারণ মোদি বাবুর পশ্চিমবঙ্গে এখনও দুটো সমাবেশে বক্তৃতা করা বাকি।

পশ্চিম বঙ্গে নিশ্চিতভাবে কিছু সহিংসতা হয়েছে, কিন্তু কিভাবে একজন ব্যক্তি এটাকে কাশ্মিরের সাথে তুলনা করতে পারে! এই তুলনাটা ইচ্ছা করে করা হয়েছে এবং একটা পরিকল্পনার অংশ এটা।

কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নির্বাচন বন্ধের জন্য মরিয়া ছিল এবং সেখানে ভোট পড়েছে এতটাই কম যে (অনেক জায়গায় এমনকি দুই অঙ্কের কোঠাতেও যায়নি ভোট) তাদেরকে সহিংসতায় জড়ানোর প্রয়োজনই পড়েনি কারণ সার্বিকভাবে সেখানে বয়কট বাস্তবায়িত হয়েছে। পশ্চিম বঙ্গে ভোটের হার ৮০ শতাংশের কাছাকাছি গেছে, তাকেও ছাড়িয়ে গেছে, কারণ মমতা বা বিজেপি কোনো পক্ষই এক ইঞ্চিও ছাড় দিতে রাজি হয়নি এখানে।

সহিংসতাকে সমর্থন করার কিছু নেই। ১৯৭২ সালে রাজ্যের নির্বাচনে কংগ্রেস কারচুপি করার পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে দুঃখজনকভাবে এটা চলে আসছে (ওই নির্বাচনে নিজের আসনে ৪০,০০০ ভোটে হেরে গিয়েছিলেন জ্যোতি বসু)। ক্ষমতাসিন দলের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর চ্যালেঞ্জ যতটা বড় হয়, ততই সহিংসতা বাড়ে এখানে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন কেন পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ছয়টি বুথে এবং বিজেপি-শাসিত ত্রিপুরার ১৬৮টি বুথে পুনর্নির্বাচনের আদেশ দিয়েছে। ইসি কেন বাবুল সুপ্রিয় এবং লকেট চ্যাটার্জির মতো বিজেপি প্রার্থীদের নির্বাচনে ‘বাধা সৃষ্টির’ অভিযোগে সতর্ক করেছে, যে কারণে অমিত শাহ অভিযোগ করেছেন যে নির্বাচন কমিশন মমতার প্রতি কোমল আচরণ করছে!

পশ্চিমবঙ্গে গত ছয় দফা নির্বাচনের সহিংসতার একটা প্যাটার্ন রয়েছে। গায়ক বাবুল সুপ্রিয়, অভিনেত্রী লকেট চ্যাটার্জি, তৃণমূল ‘বাহুবলী’ দলত্যাগী অর্জুন সিং, সাবেক পুলিশ ভারতী ঘোষ বা বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলিপ ঘোষের মতো হাই প্রোফাইল বিজেপি নেতারা বিভিন্ন জায়গায় মিডিয়াকে সাথে নিয়ে ঘুরে বিভিন্ন বুথে ‘অনিয়মকে চ্যালেঞ্জ’ করে বেরিয়েছেন, যেটা তৃণমূলের তৃণমূল পর্যায়ের ক্যাডারদের মধ্যে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিজেপির নির্বাচনী ব্যবস্থাপকরা তাদের দলীয় সংগঠনকদের সীমাবদ্ধতা জানেন বলেই টিভি চ্যানেলগুলোতে তারা এমনভাবে হিসেব কষে কিছু ‘অ্যাকটিভ ফুটেজ’ সরবরাহ করেছেন, যেগুলো দিয়ে পশ্চিম বঙ্গকে ‘কাশ্মিরের চেয়েও খারাপতর’ করে বর্ণনা করাটা সহজ হয়ে যায়।

তৃণমূল – যার জন্মই হয়েছে বাংলার সহিংসতা পীড়িত যুদ্ধংদেহী কয়েক দশকের সংগ্রামী বাম-বিরোধী রাজনীতির মধ্যে, সেই তৃণমূল কোনো বাধা ছাড়াই জবাব দিয়েছে, কারণ মমতা বিজেপির জন্য এক ইঞ্চিও ছাড় দিতে রাজি নন।

এখন বিজেপি যদি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করে এবং অমিত শাহ অর্ধেকের বেশি সিট পাবেন বলে যে গর্ব করে আসছেন, তার কাছাকাছি যদি চলে আসে, তাহলে তাদের কথাবার্তা পুরো পাল্টে যাবে এবং বলা হবে যে, ‘দিদির গুন্ডাগিরির সাহসী জবাব দিয়েছে বাংলার মানুষ’। কিন্তু বিজেপির আসন সংখ্যা যদি দুই অঙ্কের বেশি না হয়, তাহলে দোষ পড়বে পশ্চিম বঙ্গে ‘দুর্বল আইন শৃঙ্খলা’ পরিস্থিতির ওপর এবং সে পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির শাসনের বিষয়টি আবার উত্থাপন করা হবে।

বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ফলে (মোদি যেটা পুনরায় নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন_ মমতা ব্যানার্জি হয়তো অপ্রত্যাশিত একটা রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন, কিন্তু মোদির সাথে তার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হয়তো পশ্চিমবঙ্গে জন্য শুধু ‘খারাপ দিন’ই নিয়ে আসবে যদি গেরুয়া দল আবার দিল্লির ক্ষমতায় আসে।

Print Friendly and PDF

———