চট্টগ্রাম, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯ , ৯ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দিন দিন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প, নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১৬ প্রস্তাবনা

সিটিজি টাইমস ডেস্ক প্রকাশ: ২৭ মে, ২০১৯ ১০:৪৩ : পূর্বাহ্ণ

রোহিঙ্গাদিন দিন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। রাত যত গভীর হয়, তত অরক্ষিত হয়ে পড়ে এসব ক্যাম্প। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে ১৬টি প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের জন্য লিখিতভাবে সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। তা নাহলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ক্যাম্পের একাধিক সূত্র জানা যায়, দিনে একরকম থাকলেও রাত হলেই পাল্টে যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেহারা। অন্ধকারে অরক্ষিত হয়ে পড়ে ক্যাম্পগুলো। কিছু রোহিঙ্গা দুর্বৃত্ত ক্যাম্পে বসেই মাদকসহ চোরাচালান ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামোগত সমস্যা, বিদ্যুৎ না থাকা ও অন্ধকার পরিবেশসহ নানা কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের এক সূত্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সন্ত্রাসী-গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। যার কারণে ক্যাম্পের ভেতরে খুন, অপহরণসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে। দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নজরে এসেছে পুলিশের। ইতোমধ্যে এসব সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রোধে ১৬টি প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের জন্য লিখিতভাবে সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুত ফিরিয়ে না নিলে তারা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী-গোষ্ঠীর শিকার হতে পারে। যে সন্ত্রাস শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে পড়বে।

এদিকে পুলিশের মাসিক প্রতিবেদন মতে, রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে অবস্থান করার পর থেকে জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধে। গত ২১ মাসে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, চোরাচালান, ধর্ষণ, ডাকাতি, মানবপাচারসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তারা। গত ২১ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেসব অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে, তার মধ্যে ৩২৮টি ঘটনায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৭১১ জন। এরমধ্যে খুনের ঘটনা রয়েছে ৩১টি, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ১৯টি ও মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ১১৮টি।

রোহিঙ্গা বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকারকর্মী নুর খান বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইতোমধ্যে যেসব খুনের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে কয়েকটিতে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এছাড়া পুরাতন যেসব রোহিঙ্গা রয়েছে, তাদের অনেকেই আগে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার প্রমাণ রয়েছে। ওদের কাছে আধুনিক অস্ত্রও ছিল। এখন নতুন পুরাতন মিলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে সে ব্যাপারে সজাগ থাকা জরুরি।’

তিনি আরও জানান, দিনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও রাতের অন্ধকারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অনেকটা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। সন্ত্রাসীরা অপকর্ম করে পাহাড়ে কিংবা মিয়ানমারে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভাবতে হবে।

তবে রাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অনিয়ন্ত্রিত বা অরক্ষিত বলতে রাজি নন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৪ ঘণ্টা পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। যৌথ বাহিনী টহল দেওয়া হচ্ছে। স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ ক্যাম্পও। ফলে আগের তুলনায় পরিস্থিতি অনেক নিয়ন্ত্রণে।

তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে যে সব অপরাধ হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ক্যাম্পের ভেতরে অবৈধভাবে বসানো বাজার থেকে চাঁদা আদায়, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে সংঘাত সৃষ্টি। আর যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে সেসব দেশীয় তৈরি অস্ত্র, আধুনিক বা ভারী অস্ত্র এখনও পাওয়া যায়নি। তবে দিনের চেয়ে রাতের অভিযান চালানো একটু কঠিন বলেও জানান তিনি।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘ক্যাম্পের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন, সিসি ক্যামেরা এবং কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব হলে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে।’

পুলিশের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শরাণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার বরাবর ১৬টি প্রস্তাবনা নিয়ে একটি সুপারিশ পুলিশের পক্ষে পাঠানো হয়েছে।

প্রস্তাবনায় যেসব বিষয়ে বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- ক্যাম্পের ভেতরে অবৈধভাবে যত্রতত্র বাজার বসানো বন্ধ করে বাজার পরিচালনায় বৈধ নীতিমালা তৈরি, ক্যাম্পের ভেতরে স্বর্ণের দোকান বসানো এবং স্বর্ণ বন্ধকের ব্যবসা বন্ধ, ক্যাম্পে লাইট পোস্ট এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ক্যাম্পের মাঝি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুন্দর নীতিমালা প্রণয়ন, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা অবৈধ মোবাইল সিম বন্ধ করে বৈধভাবে সিম ব্যবহারের ব্যবস্থা, রোহিঙ্গাদের ত্রাণ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সদস্যদের স্বশরীরে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গাদের দাবি প্রদানের জন্য বৈধ সংগঠনের নীতিমালা প্রণয়ন, ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি, ক্যাম্পে মাদ্রাসা তৈরির ক্ষেত্রে বৈধ বা অনুমতির ব্যবস্থা গ্রহণ, রাতে ক্যাম্পে শরাণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনের প্রতিনিধির উপস্থিত নিশ্চিত করা, এছাড়াও ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

Print Friendly and PDF

———