চট্টগ্রাম, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ , ৬ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

৪৫ মিনিটের বৃষ্টিতেই ‘নদী’-তে পরিণত বন্দরনগরী, জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি কবে!

সিটিজি টাইমস ডেস্ক প্রকাশ: ২৫ মে, ২০১৯ ১১:৫৮ : অপরাহ্ণ

ফাইল ছবি

জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারছে না বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। সময়ের ব্যবধানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনের মেয়র পরিবর্তন হলেও, নিরসন হয় না জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের।

সামান্য বৃষ্টিতেই ‘নদী’-তে পরিণত হয় নগরী। সর্বশেষ শুক্রবার মাত্র ৪৫ মিনিটের বৃষ্টিতে পানিতে তলিয়ে যায় মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা।

শুক্রবার রাত ৮টা থেকে পৌনে নয়টা পর্যন্ত ঝড়োহাওয়াসহ এ বৃষ্টিপাত হয়। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মেঘনাদ তঞ্চঙ্গা বলেন, রাত নয়টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৩৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাত ৮টার পর থেকে মুষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। মাত্র ৪৫ মিনিটের বৃষ্টিতে নগরীর মুরাদপুর, কাতালগঞ্জ, বাটালী রোড, ষোলশহর, নাসিরাবাদ, আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।এসব এলাকায় সড়কগুলো হাঁটু সমান পানিতে ডুবে যায়।

নগরীর ষোলশহর দুই নম্বর এলাকার বাসিন্দা মাবুদ সওদাগর বলেন, নগরীর জামাল খান থেকে আতুরার ডিপো যাওয়ার পথে তিনি কাতালগঞ্জ এলাকায় পানিতে আটকা পড়েন। সেখানে রাস্তার ওপর হাঁটু পরিমাণ পানি হয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিয়ে চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে হতাশা

সামান্য বৃষ্টিতেই বৃষ্টিপাতের ফলে বড় বড় শহরগুলোতে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। বন্দরনগরী চট্ট্রগামের অবস্থা বেশি খারাপ। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানাযায়, বছরের পর বছর ধরে অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ যেমন রয়েছে, তেমনি আতঙ্ক আর হতাশাও কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন নগরীর ৩৫% এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ খালভরাট, বেদখলের কারণে চলতি বছরে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সবার মনে একটাই ভাবনা -শহরের জলাবদ্ধতার সমস্যা যত দ্রুত সম্ভব দূর করা উচিত, তবে এটি কে করবে তা তারা জানেন না। অনেকের মতে, বন্দরনগরী হিসেবে এই সমস্যাটাকে যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচতি ছিল সেভাবে করা হয়নি এবংএখনো গুরত্ব দেয়া হচ্ছে না।

তবে পরিস্থিতি উন্নয়নে এখনই কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন না কর্তৃপক্ষের কেউ। বর্ষাকাল ছাড়াও বৃষ্টি এলেই চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে এই ভেবে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে তাদের পড়তে হবে।

আগ্রাবাদ এলাকায় বৃষ্টি এলেই হাঁটু পানি জমে থাকে আর তার মধ্যে মানুষ কাজে বের হয়। এছাড়া খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের অবস্থা শোচনীয়।

আমদানি-রপ্তানির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাদের মতে চট্টগ্রাম শহরে এমন জলজটের পরিস্থিতি দেশের বাইরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।যেহেতু এখানে বন্দরে বহু পণ্য আনা-নেয়ার বিষয় থাকে ফলে জলাবদ্ধতার বিষয়টি এ ক্ষেত্রেও এক ধরনের সমস্যা তৈরি করে।

জলাবদ্ধতায় আতঙ্কগ্রস্ত চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা

বৃষ্টি হলেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। গত বছর (২০১৮ সালে) বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানির কারণে নগরীর প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র খাতুনগঞ্জে পুরো তিনদিন লেনদেন বন্ধ ছিল।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও বছরে বছরে জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়ছে যা ব্যবসাকে হুমকিতে ফেলেছে। তারা মনে করেন, এই সঙ্কট থেকে পরিত্রাণে জাতীয় পর্যায় থেকে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

দশক দশক ধরে প্রতিবছরই জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। গতবছর পাঁচ দফায় জলাবদ্ধতায় তাদের অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে।এই ক্ষতি তাদের নিজেদেরই পুষিয়ে নিতে হবে, সেটা তারা মেনে নিয়েছেন।

কিন্তু জলাবদ্ধতা নিয়ে আতংক থেকে মুক্তি মিলবে কিনা,এটিই এখন বড় প্রশ্ন সেখানকার ব্যবসায়ীদের।

ব্যবসায়ীরা জানান, জলাবদ্ধতার সমস্যা তাদের ব্যবসাকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। শুধু খাতুনগঞ্জে নয়, চট্টগ্রামে বিভিন্ন জায়গায় অনেক গুদাম রয়েছে। জলাবদ্ধতায় সব জায়গায় ক্ষতি হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম গণমাধ্যমকে গতবছর জানিয়েছিলেন, ২০১৯ সালের বর্ষায় জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সুফল পাবে জনগণ। কিন্তু সুফলতো দূরের কথা, সামান্য বৃষ্টিতে নগরের অধিকাংশ জায়গায় পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।

সুফল পেতে সময় লাগবে আরো আড়াই বছর

এক সময় অভিযোগ ছিল, জলাবদ্ধতা নিরসনে বরাদ্দ নেই। বর্তমান সরকার সেই ধারা ভেঙে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে একে একে তিনটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে।

যেখানে খরচ হবে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। এত বিশাল বাজেটের প্রকল্প থাকলেও এর কোনো সুফল পাচ্ছে না চট্টগ্রামের মানুষ।

সিডিএ’র জলাবদ্ধতা প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মঈনুদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা হচ্ছে সেটি মিথ্যা নয়। তবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এরমধ্যে ১৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করি আগামী দুই থেকে আড়াই বছর পর নগরবাসী এর সুফল পাবেন।’

প্রকল্প মেয়াদের অর্ধেক সময় চলে যাওয়ার পরও কেন ১৫ শতাংশ কাজ হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

আসন্ন বর্ষায় চট্টগ্রামের ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সম্ভবনা

এবার আসন্ন বর্ষায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে মূলত অপরিকল্পিত জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্পের কারণেই।

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ সালের জুনে।

কিন্তু ওই প্রকল্পের আর মাত্র বছর খানেক সময় বাকি থাকলেও এখনও প্রকল্পের কাজে তেমন অগ্রগতি নেই। গত বছর বর্ষার আগে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। কিন্তু এক বছর ধরে শুধু খাল পরিষ্কারের মধ্যেই প্রকল্পের অগ্রগতি সীমাবদ্ধ।

উপরন্তু বর্ষার আগে এ প্রকল্পের অধীনে নগরীর খালগুলো পুনঃখনন ও সম্প্রসারণের কথা বলে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের সুবিধার্থে এসব খালের মুখ বাঁধ দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে।

নগরীর পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর মুখে এভাবে বাঁধ দেয়ায় আসন্ন বর্ষায় চট্টগ্রামে বড় ধরনের জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

স্থপতি জেরিনা হোসেন  গণমাধ্যমকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএ নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করছে। খালের মুখে বাঁধ দিয়ে কাজ করতে হলে তা অবশ্যই মার্চের মধ্যে শেষ করা প্রয়োজন ছিল।

কারণ আমাদের দেশে মে মাসেই বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় উন্নয়নকাজের জন্য খালের মুখ বন্ধ রাখলে পানি চলাচল ব্যাহত হবে। ফলে বর্ষার আগে খালের মুখের বাঁধ খুলে দেয়া না হলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে জানান, স্থপতি জেরিনা।

এদিকে, শুধু সিডিএ নয়, জলবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতার দায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনেরও কম নয়। সংস্থাটি প্রায় পাঁচ বছর আগে বহদ্দারহাট বারৈপাড়া থেকে কর্ণফুলী পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।

২০১৪ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক)। সে সময় এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২৬ কোটি টাকা। বর্তমানে সেই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। অথচ প্রকল্পের কাজ এখনও শুরুই হয়নি।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামশুদ্দোহা বলেন, জমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতার কারণে এতদিন কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। চেষ্টা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ শুরু করার।

মাস্টারপ্ল্যান ও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়া, খাল দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণকে জলাবদ্ধতার কারণ

মাস্টারপ্ল্যান ও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়া, খাল দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণকে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

এ সমস্যা উত্তরণে কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিতভাবে নালা নির্মাণ, খাল-নালাকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার প্রবণতা, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা এবং মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়া চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এ সমস্যা উত্তরণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরীতে পরিকল্পনাবিহীন ভবন-স্থাপনা নির্মাণ, নালা ও পানি চলাচলের পথগুলোকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা, মাস্টারপ্ল্যান ও ড্রেনেজ ম্যাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না করা, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা এবং আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।

১৯৯৫ সালে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ওই প্ল্যানে তিনটি নতুন খাল খনন, নদী ও সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত খালের মুখে স্লুইসগেট স্থাপন, বিলুপ্ত খাল পুনরুদ্ধার, বিদ্যমান খালগুলোকে গভীর ও প্রশস্তকরণের সুপারিশ করা হয়।

কিন্তু ২২ বছর অতিবাহিত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি ওই ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান। এ ছাড়া নগরের জলাবদ্ধতার জন্য নগরের মধ্য দিয়ে যেসব খাল-নালা, নর্দমা রয়েছে সেগুলো বেদখল হয়ে যাওয়াকেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

নগরীর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৭টি খাল ‘খাল খেকো’র কবলে পড়ে এখন নালায় পরিণত হয়েছে। এসব খালের আশপাশে বসবাসকারী লোকজন খাল ভরাট করে ভবন ও দোকান তৈরি করে ক্ষান্ত হননি। খালগুলোকে আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ ছাড়া চাক্তাই খাল, রাজাখালী খালের মুখে কর্ণফুলী নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় অনেক সময় পানি কর্ণফুলী নদীতে নামতে পারে না।

আবার কর্ণফুলী নদীতে জোয়ার থাকলে সে সময় যদি বৃষ্টি হয় তাহলে নগরীর খাল-নালা নর্দমা দিয়ে প্রবাহিত পানি আর কর্ণফুলীতে নামতে পারে না। ফলে খুব তাড়াতাড়ি এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ভারি বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি হয় আরও ভয়াবহ।

Print Friendly and PDF

———