চট্টগ্রাম, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯ , ২৭শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামের শিক্ষক বদলির আদেশ কে দিলো?

বাংলা ট্রিবিউন প্রকাশ: ১০ মে, ২০১৯ ১১:১৪ : পূর্বাহ্ণ

অনিয়মের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট থেকে চট্টগ্রামের পাঁচ জন প্রাথমিক শিক্ষককে বদলির আদেশ পাঠানোর পর এখন তা অস্বীকার করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বদলির আদেশের বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক এবং চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসার করণীয় জানতে চেয়ে অধিদফতরের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিষয়টি ধরা পড়ে।

এই ঘটনায় গত ২৬ এপ্রিল বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের পর অধিদফতর থেকে গত ২৮ এপ্রিল স্বাক্ষরিত পত্রে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বদলির কোনও আদেশ দেওয়া হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে অফিসিয়াল ইমেইল থেকে তাহলে কে বদলির আদেশ পাঠালো?

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির আদেশ দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি এরসঙ্গে ভুয়া বদলি আদেশ পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে। এমনই একটি ঘটনা গত ১০ এপ্রিল ঘটে।

সেদিন অধিদফতরের অফিসিয়াল ই-মেইল থেকে চট্টগ্রাম মহানগরে পাঁচ জন সহকারী শিক্ষকের বদলির আদেশ পাঠানো হয়। কিন্তু ওই আদেশ নিয়ে বেকায়দায় পড়েন চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক এবং চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসার।

শিক্ষকদের বদলি করা কর্মস্থলে যোগদান করানো সম্ভব হচ্ছিল না। জানতে চাইলে অধিদফতরের পরিচালক খান মো. নুরুল আমিন (পলিসি ও অপারেশন) বলেন, ‘এগুলো ছিল ফলস অর্ডার। আমি এসেছি মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে, তখন হাজার হাজার অ্যাপ্লিকেন্ট, হাজার হাজার স্টেকহোল্ডার। এগুলো হ্যান্ডেল করতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়েছে। কে করেছে জানি না, সমাজে তো দুষ্টু লোকের অভাব নেই।

এটা যখন আমার নলেজে এসেছে তখনই ফাইল চেক করেছি। এ ধরনের কোনও আদেশ ডিজি মহোদয় অনুমোদন করেননি। ইস্যু রেজিস্ট্রারে এ ধরনের কোনও স্মারক নেই। এটা ভেরিফাই করে জানিয়ে দিয়েছি।’

বদলির আদেশ কে পাঠালো তা জানতে চাইলে খান মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘আমি তো নতুন এসেছি। এটা বের করতে এনএসআই বা এসবি পারে। যারা ভালো অনুসন্ধান করতে পারেন তারা হয়তো পারবেন। আমরা চাই শয়তানগুলো কারা তা জানতে, এসব চোর বদমাশগুলোকে ধরতে হবে। ’

অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ এপ্রিল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক খান মো. নুরুল আমিন (পলিসি ও অপারেশন) এর অফিসিয়াল ই-মেইল ([email protected]) থেকে চট্টগ্রামে পাঁচ জন সহকারী শিক্ষকের বদলির আদেশ পাঠানো হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়ের অফিসিয়াল ([email protected]) ই-মেইলে। অফিসিয়াল মেইলটি পাঠানো হয় ওই দিন দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে।

সংশ্লিষ্ট পাঁচটি আদেশে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার সুখছড়ি রহমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রিমা দাসকে বদলি করা হয় পাঁচশাইল উপজেলার যেকোনও স্কুলে।

ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব ফরহাদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাসিনা পারভীনকে বদলি করা হয় ডবলমুরিং উপজেলার মাদারবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আনোয়ারা উপজেলার পূর্ব বোয়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাহমিনা ফেরদৌসীকে বদলি করা হয় পাহাড়তলীর যেকোনও স্কুলে।

বোয়ালখালী উপজেলার ২৮ নম্বর শাকপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিলকিস আরা বেগমকে বদলি করা হয় বন্দর উপজেলার দরবেশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

আর কক্সবাজারের সদরের ঈদগাহ বাহাছড়া সরকারি প্রাথমিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মমতাজ বেগমকে বদলি করা হয় চট্টগ্রাম মহানগরের কোতোয়ালী থানার কাতালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

আদেশ নিয়ে শিক্ষকরা বদলি করা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার জন্য জেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আদেশগুলো জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে অফিসিয়ালি পৌঁছেনি।

আদেশ প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) জালাল উদ্দিনের স্বাক্ষর আছে; কিন্তু, আদেশ জারি কর্মকর্তা হিসেবে তার নাম থাকলেও স্বাক্ষর নেই।

এতে চট্টগ্রামের শিক্ষা অফিসার নাসরিন সুলতানার সন্দেহ হলে তিনি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হন,অধিদফতর থেকে আদেশগুলো পাঠানো হলেও তা সঠিক নয়। ফলে শিক্ষকরা আদেশের কপি পেলেও বদলি হতে পারেননি।

চট্টগ্রামের শিক্ষা অফিসার নাসরিন সুলতানা ওই সময় বলেন,‘এই বিষয়টি নিয়ে লিখিতভাবে অধিদফতরকে জাননো হয়েছে।’

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উপপরিচালক মো. সুলতান মিয়াও বিষয়টি অবহিত হয়ে তার কাছে পাঠানো অফিসিয়াল ইমেইলটি সঠিক কিনা তা যাচাই করতে অধিদফতরে যোগাযোগ করেন।

শিক্ষক বদলির পাঁচটি আদেশে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা হিসেবে যার নাম রয়েছে তিনি সহকারী পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) জালাল উদ্দিন। এ বিষয়ে জালাল উদ্দিন বলেন, ‘তথ্য প্রযুক্তির যুগ।

ডিজিটালি পাঁচটি চিঠি জাল করে ফেলা হয়েছে। পরিচালক অপারেশনের মেইল থেকে চিঠি গেছে, আমি পরিচালক অপারেশন নই। আমার আলাদা মেইল আছে। সেখান থেকে কীভাবে গেলো আমার জানা নেই।’

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ এপ্রিল স্বাক্ষরিত অধিদফতরের পত্রে জানিয়ে দেওয়া হয়, এ ধরনের আদেশ জারি হয়নি।

পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) খান মো. নুরুল আমিন স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়,‘এ অফিসের রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে গত ২১ মার্চ সংশ্লিষ্ট বদলি সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়নি।

এ পাঁচটি বদলি সংক্রান্ত অফিস আদেশ বাস্তবায়ন না করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হলো।’ চিঠিতে বদলি আদেশের স্মারক উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে এ ধরনের আদেশ পাঠানো হলেও কে কোন উদ্দেশে শিক্ষক বদলির মতো গুরুত্বপূর্ণ আদেশ পাঠালো সে বিষয়ে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কে ই-মেইলটি পাঠিয়েছেন তাও শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে দেওয়া আদেশগুলো অধিদফতরের এক বা একাধিক কর্মকর্তার যোগসাজসে হয়েছে। তাই অপরাধ ঢাকাতে এ বিষয়ে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। অপরাধ ঢাকতে শুধু চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে বদলি আদেশ বাস্তবায়ন না করার জন্য।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা বলেন,‘চিঠিতে শিক্ষক বদলির ওই পাঁচ আদেশ যে অধিদফতরের আদেশ ছিল তা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম শিক্ষা অফিসারকে পাঠানো চিঠিতে।’

Print Friendly and PDF

———