চট্টগ্রাম, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯

ঝুঁকিতে লাখো পর্যটক! কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেলে নেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা

প্রকাশ: ৪ এপ্রিল, ২০১৯ ৬:১৯ : অপরাহ্ণ

পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সমুদ্র তীরসহ পুরো শহর জুড়ে গড়ে উঠেছে সাড়ে চারশোরও বেশি হোটেল-মোটেল। এসব হোটেলের অধিকাংশেই নেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা।

কয়েকটি হোটেলে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা থাকলেও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ত্রুটিপূর্ণ।এসব কারণে প্রতি মুহূর্তেই ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশ-বিদেশ থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া লাখো পর্যটক।

পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় হোটেলগুলো রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হবে সংশ্লিষ্টদের।কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, অতিসত্বর এসব হোটেলে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা কার্যকর করতে সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নামমাত্র অনুমোদন নিয়ে এসব গড়ে তোলা হয়েছে এসব হোটেল-মোটেল। অথচ কক্সবাজারের সৌন্দর্যকে আরও নান্দনিকভাবে বিশ্ব দরবারে ফুটিয়ে তুলতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রকে মেগা প্রকল্পের আওতায় নিয়ে এসে কাজ শুরু করা হয়েছে। এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বিশ্বের নামিদামী কয়েকজন প্রকৌশলী কক্সবাজারের এসব হোটেলে অবস্থান করছেন।

এছাড়াও বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবিরের অবস্থান কক্সবাজারে হওয়ায় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থার কর্মকর্তারা। অর্থাৎ বিশ্বের নানাপ্রান্তের মানুষে ভরপুর রয়েছে কক্সবাজারের এসব হোটেল মোটেল গুলোতে।

এসব কারণে এসব হোটেল-মোটেলে গুরুত্বপূর্ণ দেশি-বিদেশি অতিথিরা অবস্থান করেন। কিন্তু এগুলোর অধিকাংশেরই যথাযথ নেই ফায়ার ফাইটিং প্ল্যান। নিয়মানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট কক্ষে নয়টি অগ্নিনির্বাপক গ্যাস সিলিন্ডার থাকার কথা থাকলেও বেশিরভাগ হোটেলে রাখা হয় ৪ টি।

এছাড়াও হাইসেন্ট পয়েন্ট অকেজো, যত্রতত্র রাখা হয় এলপি গ্যাস সিলিন্ডার, নেই পর্যাপ্ত পানির মজুত, জরুরি মুহূর্তে বের হওয়ার জন্য নেই কোনও ব্যবস্থা। নেই ফ্লোর মার্কিংও।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব কারণে প্রতি মুহূর্তেই ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশ-বিদেশ থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া লাখো পর্যটক।

এদিকে, সম্প্রতি দেশে কয়েকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় টনক নড়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের। অগ্নিঝুঁকিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে হোটেলগুলোতে শুরু হয়েছে অভিযান।

জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গড়ে তোলা ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গত ১ এপ্রিল অভিযান চালিয়ে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় কয়েকটি হোটেল থেকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

এর মধ্যে- অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকায় সী ওয়ার্ল্ড বীচ রিসোর্টকে ৫০ হাজার, বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজকে ৩০ হাজার ও ওয়েন্ডে ট্রেসকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ত্রুটি সারিয়ে নিতে ২০ দিনের সময় বেধে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এ অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেলিম শেখ।তিনি বলেন, ‘‘সারাদেশে যেভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে তাতে সতর্ক অবস্থান নিয়ে জেলা প্রশাসন আগে থেকেই অভিযান চালাচ্ছে। কেউ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থায় ক্রটি রাখলে শুধু জরিমানাই নয়, দেওয়া হবে কঠোর শাস্তি। প্রতিটি হোটেলেই পর্যায়ক্রমে এ অভিযান চালানো হবে।’’

এ বিষয়ে কক্সবাজারের বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজের চীফ ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমাদের মোটামুটি সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে।তবে রিজার্ভে পানি ও অগ্নিনির্বাপক গ্যাস সিলিন্ডারের সংখ্যা কম ছিল। দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা এ সংকট দূর করব। আশা করি আমাদের হোটেলে কোনও নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই।’’

সী ওয়ার্ল্ড রির্সোটের নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘সব হোটেলে এ ব্যবস্থা নিলে ভাল হয়। কারণ পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে সব হোটেলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। তবে এটি একটি ভাল উদ্যোগ।’’ এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

রাজধানী থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক পারভেজ মাহতাব বলেন, ‘‘আমরা কক্সবাজারে ভ্রমণে আসি একটু ভাল সময় কাটাতে।সারাদেশে যে পরিমাণ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে তেমন কিছু কক্সবাজারে হলে কী অবস্থা হবে তা সৃষ্টিকর্তাই ভাল জানেন। এখন থেকেই হোটেল মালিকদের পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। কারণ দুর্ঘটনা কাউকে বলে আসে না।’’

আরেক পর্যটক দম্পতি শেলী চৌধুরী ও সালমান রেজা বলেন, ‘‘এত ছোট সিঁড়ি। দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত বের হওয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। তাই দ্রুত বড় সিড়ি বা বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে।’’

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ফায়ার সার্ভিসসহ সব বিভাগকে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা সচল রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনও হোটেল বা বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থায় যাতে ত্রুটি না থাকে সেজন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।

সব হোটেল-মোটেলে যথাযথ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।