চট্টগ্রাম, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯

চট্টগ্রামে ওসি, এসআই ও এএসআইসহ পুলিশের ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ: ২৫ মার্চ, ২০১৯ ৫:০০ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীকে থানায় আটকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ১৫ লাখ টাকা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মো. নুরুল আবছার নামে ওই ব্যবসায়ীর অভিযোগ তাকে থানায় ডেকে নিয়ে প্রথমে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে পুলিশ। তিন দিন থানায় পুলিশের হেফাজতে রেখে এ নির্যাতন চালানো হয়। প্রাণে বাঁচতে তিনি পুলিশকে ১৫ লাখ দেন।

দাবিকৃত বাকি ১৫ লাখ না পেয়ে তাকে ‘বিশেষ ক্ষমতা আইনে মাদক মামলায়’ গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দেয় সিএমপির পতেঙ্গা থানার পুলিশ। এ মামলায় প্রায় দুই মাস জেল খেটে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে কারামুক্ত হন তিনি।

এ ঘটনায় সোমবার সকালে বিচার প্রার্থনা করে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা ও বিশেষ জজ মোহাম্মদ আকবর হোসেন মৃধার আদালতে পতেঙ্গা থানার সেই ওসি, এসআই ও এএসআইসহ পুলিশের ৬ কর্মকর্তা এবং ৩ মাদক বিক্রেতার বিরুদ্ধে বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন নুরুল আবছার।

বাদীর আইনজীবী মোহাম্মদ মোমিনুর রহমান সোমবার এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

দুদকেও অভিযোগ

পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর এই অভিযোগ বিস্তারিত বর্ণনা করে পতেঙ্গা থানার ওসি, এসআই ও এএসআইসহ পুলিশের ৬ কর্মকর্তা এবং ৩ মাদক বিক্রেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম সমন্বিত কার্যালয়-১ এর উপ-পরিচালক বরাবরেও একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ী।

সেই অভিযোগের বিষয়টিও আদালতকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান বাদীর আইনজীবী।

আসামি কারা?

মামলার আসামিরা হলেন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের পতেঙ্গা থানার সাবেক ওসি আবুল কাসেম ভূঁইয়া, এসআই প্রণয় প্রকাশ, এসআই (নিরস্ত্র) আবদুল মোমিন, এএসআই তরুণ কান্তি শর্মা, এএসআই কামরুজ্জামান ও এএসআই মিহির। আর তিন মাদক বিক্রেতা হলেন, ইলিয়াছ ওরফে গাভী ইলিয়াছ, মো, জসিম ও মো. নুরুল হুদা।

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে যা রয়েছে …

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির ধর্মবিষয়ক সাবেক সহ-সম্পাদক ব্যবসায়ী মো. নুরুল আবছারকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সিএমপির পতেঙ্গা থানায় গত বছরের ১ জুন থেকে ৩ জুন পর্যন্ত আটকে করে রাখা হয়। ওই সময় নুরুল আবছারের ওপর থানার এসআই প্রণয় প্রকাশ, এসআই (নিরস্ত্র) আবদুল মোমিন, এএসআই তরুণ কান্তি শর্মা, এএসআই কামরুজ্জামান ও এএসআই মিহির ৩০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে দফায় দফায় নির্যাতন চালান।

টাকা না দিলে ক্রয়ফায়ারে হত্যা ও পরিবারের সদস্যদেরকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন পুলিশের এসব কর্মকর্তা।

নুরুল আবছার পুলিশের এ নির্যাতনে বাধ্য হয়ে ১৫ লাখ টাকা ঋণ করে পুলিশকে দেন। এরপরও ক্ষান্ত হননি তারা। তিন মাদক বিক্রেতার মাধ্যমে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রপাড় থেকে ৪০টি বিদেশি মদের পরিত্যক্ত খালি বোতল সংগ্রহ করে তাতে বাংলা মদ ঢুকানো হয়। পরে সেসব মদের বোতল নুরুল আবছারের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দিয়ে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

‘কী আর বলবো, ওসির মন যা চায় তাই করতো’

ব্যবসায়ী নুরুল আবছার অভিযোগে আরও উল্লেখ করেন, কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে সেই মামলার বাদী পতেঙ্গা থানার তৎকালীন এএসআই তরুণ কান্দি শর্মাকে ফোন করি এবং সাজানো মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানো উচিৎ হয়েছে কি না জানতে চাই।

সে সময় তরুণ কান্তি শর্মা জবাবে বলেন, ‘কী আর বলবো, ওসির মন যা চায় তাই করতো। সব কিছুর ক্ষমতা উনাদের আছে। উনারা যেটাই করছে, আমাদের এখানে (বর্তমানে পাঁচলাইশে) কিছুই নাই।

আপনার বিষয়টা নিয়ে আমাকে ওসি স্যার মা-বাপ নিয়ে যতগুলো গালাগাল করেছে। আমি কেন (আপনার বিরুদ্ধে) মামলা দিচ্ছি না। এ মামলার বাদী হওয়ার জন্য অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ দিয়েছে, যেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। বাস্তবে আমি আড়ালে গিয়ে কান্না করেছি। সত্যি কথা বলতে আমি চাকরি করতে এসেছি। আমার মা-বাপাকে গালাগালি শুনাতে আসিনি। আমি কেন আপনার মামলার বাদী হব। আপনার কাছ থেকে কোনো কিছু পাইনি।’

এএসআই তরুণ কান্তি শর্মাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘সিনিয়র স্যারেরা যেটা করতে বলবেন, আমাকে সেটা করতে হবে। যেটা বলে সেটা মানতে হবে। না মানার সুযোগ নেই, যেহেতু চাকরি করি।’

কী ঘটেছিল সেদিন?

বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে থানায় আটকে রেখে চাঁদা দাবি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখানোর বর্ণনা দিয়ে নুরুল আবছার বলেন, গত বছরের ১ জুন বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে মোবাইলে কল করেন থানার এসআই প্রণয় প্রকাশ। ওই সময় নুরুল আবছারের অবস্থান জানতে চান এবং বাসা থেকে রাস্তায় এসে দাঁড়াতে বলেন প্রণয় প্রকাশ।

১৫ মিনিট পরই নুরুল আবছার এলে স্থানীয় একটি বেকারিতে গিয়ে দুইজনে নাস্তা করেন। এ নাস্তা করার মধ্যেই সেখানে হাজির হন থানার এএসআই তরুণ কান্তি শর্মা, এসআই আবদুল মোমিন, এএসআই কামরুজ্জামান ও এএসআই মিহির। তারাও সেখানে নাস্তা করেন।

ওই সময় এএসআই কামরুজ্জামান ও মিহির ব্যবসায়ী নুরুল আবছারকে বলেন, থানায় গিয়ে ওসি আবুল কাশেম ভূঁইয়ার সাথে দেখা করেন। এরপর এসআই আবদুল মোমিন, এএসআই তরুণ কান্তি শর্মা, কামরুজ্জামান ও মিহির নুরুল আবছারকে সঙ্গে করেই থানায় নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নুরুল আবছারের কাছ থেকে এএসআই কামরুজ্জামান মোবাইল, গাড়ির চাবি ও টাকা পয়সা নিয়ে নেন।

পরে এসআই আবদুল মোমিন গিয়ে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখেন। এর আনুমানিক ৩০ মিনিট পর একজন পিএসআই ওই কক্ষে আসেন এবং নুরুল আবছারের পাশে বসে থাকেন। এভাবেই এক রাত থানার ওই কক্ষে আটকে রাখা হয়।

পরের দিন দুপুরে এসআই আবদুল মোমিন ও এসএসআই মিহির সেই কক্ষে এসে ব্যবসায়ী নুরুল আবছারকে বলেন, ‘তুই ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসা করিস। জীবিত থাকতে হলে ৩০ লাখ টাকা দিবি। টাকা দিবি না ৮৮ ধারায় চালান দিবো আর না হয় ইয়াবা দিয়ে ক্রসফায়ারে দিবো।’

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, এরপর রাতে এসআই আবদুল মোমিন, এসএসআই মিহির ও কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বাবুল আক্তারসহ সেই কক্ষে আসেন এবং তিনজন মিলে চরম মানসিক নির্যাতন করে কক্ষ থেকে বের হন।

এর কিছুক্ষণ পর এএসআই তরুণ কান্তি শর্মা সেই কক্ষে আসেন এবং দাবিকৃত ৩০ লক্ষ টাকা যে করেই হোক দিতে বলেন। এ টাকা না দিলে ফের ক্রসফায়ারের হুমকি দেন।

এরপর ২ জুন শনিবার দুপুরে এসআই আবদুল মোমিন ও এএসআই কামরুজ্জামান এ কক্ষে আসেন এবং নুরুল আবছারের পরিবারের সদস্যদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এরপর এসআই প্রণয় প্রকাশ বেশ কিছু ইয়াবা ট্যাবলেট এনে সামনে রাখেন এবং এসব ইয়াবাসহ মামলা দিয়ে আদালতে চালান দেওয়ার হুমকি দেন।

অভিযোগে ব্যবসায়ী নুরুল আবছার আরো উল্লেখ করেন, ওই সময় কোনো উপায় না দেখে তিনি ফুফাতো ভাইয়ের মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকা আনান এবং ভিআইপি রোডস্থ মাদ্রাসা গেটে গিয়ে এসআই আবদুল মোমিন ও এএসআই কামরুজ্জামান সে টাকা গ্রহণ করেন।

এর পরই এসআই প্রণয় প্রকাশ ও এসআই আবদুল মোমিন ৩০ লাখ টাকার অবশিষ্ট ১৫ লাখ দিতে বলেন। অন্যথায় ক্রসফায়ারে মৃত্যু অথবা প্রদর্শিত ইয়াবা দিয়ে আদালতে চালান দেয়ার হুমকি দেওয়া হয়- যাতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

আর কোনো টাকা না দেওয়ায় থানার এএসআই তরুণ কান্তি শর্মা বাদী হয়ে গত বছরের ৩ জুন পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সে মামলায় ৪০ বোতল বিদেশি মদ নিজ হেফাজতে রেখে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২৫ (বি) ধারায় অপরাধ করার কথা অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। পরে ওই দিন দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

এরপর ২৯ জুলাই জামিনে কারাগার থেকে বের হন ব্যবসায়ী নুরুল আবছার।