চট্টগ্রাম, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯

শব্দদূষণ এখন ‘শব্দ-সন্ত্রাস’: ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম বাসী

প্রকাশ: ২৩ মার্চ, ২০১৯ ৯:৩০ : অপরাহ্ণ

শব্দদূষণ একটি মারাত্মক সমস্যা। এ সমস্যা মানুষেরই সৃষ্ট। একটু সচেতনতা অবলম্বন করলেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

শব্দদূষণ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন একে ‘শব্দ-সন্ত্রাস’ নামে অভিহিত করা যায়। অপদস্থ হওয়ার ভয়ে বেশির ভাগ মানুষ কোথাও অভিযোগ না করে নির্বিবাদে উচ্চশব্দের ভয়ংকর যন্ত্রণা সহ্য করছেন।

ব্যস্ততম নগর হিসেবে রাজধানী ঢাকার পরই বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অবস্থান। প্রতিদিন এই নগরে লক্ষাধিক যানবাহন চলাচল করে। এরমধ্যে অধিকাংশ যানবাহনেই রয়েছে হাইড্রোলিক হর্ন।

যত্রতত্র বাজানো হয় এই হর্ন। নিয়ম মানা হচ্ছে না হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনেও। এর ফলে নগরীতে বেড়ে গেছে শব্দদূষণ।

এছাড়া কল-কারখানার জেনারেটরের শব্দ ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে কনসার্ট ও মাইকের উচ্চ শব্দের কারণেও মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ হচ্ছে নগরে।

সহনীয় মাত্রার চেয়ে উচ্চমাত্রার শব্দদূষণের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে নগরবাসী। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট, ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ও সুন্দর জীবন ‘শব্দদূষণ এখন জীবনবিনাশী শব্দ-সন্ত্রাস; গভীর সংকটে আমাদের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য! সমাধানের উপায় কী?’ শীর্ষক আলোচনায় বাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মোল্লা।বলেন, উচ্চশব্দের প্রধান উৎস যানবাহনের অহেতুক হর্ন, ভবন নির্মাণের সামগ্রী, মাইক আর ইট গুঁড়া করার যন্ত্র। তবে গায়েহলুদ, বিয়ে, জন্মদিন, নববর্ষ, ইত্যাদি সামাজিক অনুষ্ঠানে অতি উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, এতে প্রতিবেশীদের রাতের ঘুম হয় না, হৃদ্‌রোগীদের হৃৎকম্পন বেড়ে যায়, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় মারাত্মক ক্ষতি হয়। মানুষের কর্মক্ষমতা কমছে, গর্ভবতী মা ও শিশুদের ওপর উচ্চশব্দের প্রভাব আরও মারাত্মক।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের প্রভাষক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ইমতিয়াজুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত শব্দদূষণের কারণে কমবেশি সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। হৃদরোগী ও স্ট্রোকের রোগীদের সমস্যা বেড়ে যায়।

তিনি জানান, অতিরিক্ত শব্দ দূষণে সব বয়সী মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। মানসিক চাপ তৈরি হয়। অস্থিরতা বেড়ে যায়। মেজাজ হয় খিটখিটে।

এদিকে, অনেকেই মনে করেন শব্দদূষণ সমস্যা মানুষেরই সৃষ্ট। একটু সচেতনতা অবলম্বন করলেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মানুষের সৃষ্টি এমন একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিবেশগত সমস্যা হলো শব্দদূষণ।

ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, শহরে মিছিল, বিজ্ঞাপন ও নির্বাচনের কাজে মাইকের ব্যবহার সংক্ষিপ্তকরণ, জেনারেটরের বিকল্প সৌরশক্তি ব্যবহার করা, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কারখানা স্থাপন, ইটভাঙার মেশিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো থেকে বিরত থাকা, বিশেষ করে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট স্থান ব্যতিরেকে অতিরিক্ত মাইক ব্যবহারে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।

যানবাহনের শব্দের ব্যাপকতা ও তীব্রতা হ্রাসের জন্য আইন করে উন্নত প্রযুক্তির ইঞ্জিন এবং সাইলেন্সারের ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত।

সামাজিক অনুষ্ঠানে বাসার ছাদে বা উন্মুক্ত স্থানে ব্যান্ডসঙ্গীতের আয়োজন করা হয়ে থাকে, যার ফলে শব্দদূষণ সৃষ্টি হয়। আশপাশে থাকা শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষ এ চরম সমস্যার সম্মুখীন হয়।

সাধারণ শব্দকে মাপা হয় ডেসিবেল বা ডিবিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসতি এলাকায় দিনের বেলা ৫৫ ডিবি, রাতে ৪৫ ডিবি হওয়া উচিত। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডিবি, রাতে ৫৫ ডিবি; শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ডিবি, রাতে ৬৫ ডিবির মধ্যে শব্দমাত্রা থাকা উচিত।

হাসপাতাল সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০, রাতে ৪০ ডিবি শব্দমাত্রা থাকা উচিত। এই মাত্রার মধ্যে থাকা আমাদের পক্ষে সহনীয়। এর বেশি হলেই দূষণ হিসেবে তা চিহ্নিত হয়।

মাত্রাতিরিক্ত বলে গণনা করা হয়। আমাদের দেশে এই শব্দমাত্রা নিয়ে মাথাব্যথাও নেই। আসলে সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত শব্দ যদি আমরা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বা অনেকক্ষণ ধরে শুনতে বাধ্য হই, তাহলে সেই শব্দের দূষণ ও অন্যান্য পরিবেশ দূষণের মতো মারাত্মক হয়ে ওঠে।

আমাদের শরীর ও মনের মাঝে তীব্র প্রভাব ফেলে। শব্দদূষণের মাত্রা যে পর্যায়ে যাচ্ছে, তাতে শিল্প-কারখানা, পরিবহন এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে শব্দের সুনির্দিষ্ট তীব্রতা সম্পর্কিত স্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অথচ পরিবেশ সংশ্নিষ্ট বিশাল অধিদপ্তর, মন্ত্রী, জেলা অফিস, আইন সবই রয়েছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে শহরকে ৫ ভাগে ভাগ করা হয়েছে- নীরব এলাকা, আবাসিক এলাকা, মিশ্র এলাকা, শিল্প এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা। এসব এলাকায় দিন ও রাতভেদে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে নীরব এলাকা চিহ্নিত করা হয়। এসব জায়গায় মোটরগাড়ির হর্ন বাজানো বা মাইকিং করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এরপর ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শব্দদূষণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।

এই নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা হলো ৫৫ ডেসিবেল এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল। একইভাবে মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল, নীরব এলাকার জন্য এ শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় ৭৫ ও ৭০ ডেসিবেল সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর ওপরে শব্দ সৃষ্টি করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় বলা আছে, আবাসিক এলাকার সীমানা থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে নির্মাণকাজের ইট বা পাথর ভাঙার যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

যানবাহনে অপ্রয়োজনে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানো যাবে না। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা যাবে না। এই বিধির আওতায় স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এসব প্রতিষ্ঠানের চারদিকে ১০০ গজের ভেতরে কোনো ধরনের হর্ন বাজানো যাবে না। আরও বলা হয়েছে, কোনো উৎসব, সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে লাউডস্পিকার, কোনো যান্ত্রিক কৌশল ব্যবহার করতে হলে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি লাগবে।

এসব কার্যক্রম সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টার বেশি হবে না। পাশাপাশি রাত ১০টার পর কোনোভাবেই শব্দদূষণকারী যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব নয়েজ কন্ট্রোলের দাবি, পথের শব্দের কারণে একজনের হাইপারটেনশন, আলসার, হৃদরোগ, মাথাব্যথা বা স্নায়ুর সমস্যা হতে পারে।

এমনকি অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে। শব্দ দূষণের কারণে ব্লাড প্রেশার, শ্বাসের সমস্যা এমনকি হজমের সমস্যাও হতে পারে।