চট্টগ্রাম, , রোববার, ২৪ মার্চ ২০১৯

যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত শুভপুর ব্রিজ

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-১০ ২০:০৮:৩০ || আপডেট: ২০১৯-০৩-১১ ১০:২৮:৫৩

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত শুভপুর ব্রীজ। এতে করে ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশংকা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় ব্রিজের উপরের ঢালাই নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক স্থানে লোহার রেলিং ও নাট-বোল্ট চুরি হয়ে গেছে। অবকাঠামো এতটাই নড়বড়ে যে ছোট যানবাহন চলাচল করতেও পুরো ব্রিজটি কাঁপতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে ব্রিজের ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে সড়ক বিভাগ। এর পরও কিছুদিন বাস ও পণ্য বোঝাই ট্রাক পারাপার করায় এখন ব্রিজের এক মাথায় লোহার খুঁটি দিয়ে বড় যানবাহন পারাপারের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যে ব্রিজটি ভেঙে দিয়ে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন সেটি ঐতিহাসিক শুভপুর ব্রিজ। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশের একমাত্র সড়ক ছিল পুরাতন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মিরসরাই, ছাগলনাইয়া, রামগড় ও খাগড়াছড়ি সংযোগ স্থাপনকারী এই ব্রিজের দখল নিয়েই ১৯৭১ সালে দফায় দফায় পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। পাকিস্তানি বাহিনী যাতে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এই ব্রিজ অতিক্রম করে চট্টগ্রাম প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য মুক্তিযোদ্ধারা যেমন ব্রিজটি ধ্বংসের চেষ্টা চালান তেমনি ব্রিজটি রক্ষা ও দখলে রাখার জন্যও পাক হানাদার বাহিনী মরিয়া ছিল। মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিবিজড়িত ফেনী নদীর উপর নির্মিত এই সেতু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ক্রমেই যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এটি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

জানা যায়, ১৯৫২ সালের দিকে আরসিসি স্ল্যাবে বেইলি ট্রাস দিয়ে ফেনী নদীর ওপর ১২৯ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণ করা হয়। পরে নদীর প্রসস্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৬৮ সালে সেতুটি আরও ২৪৯ মিটার সম্প্রসারণ করায় এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৩৭৪ মিটারে। এটি ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মহাসড়কে তৎকালীন দীর্ঘতম সেতু।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা তোবারক হোসেন জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শুভপুর ব্রিজটি। ব্রিজের ১০ নং পিলারে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কিঞ্চিৎ ক্ষতিগ্রস্থ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলে ফেনী অংশ হানাদারমুক্ত হয়।

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ব্রিজটির বিভিন্ন স্থানে এখনো গোলাবারুদের চিহ্ন পাওয়া যাবে। এ ব্রিজের আশপাশে বহু সম্মুখযুদ্ধ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের একটি চলচ্চিত্রেও শুভপুর ব্রিজটি দেখানো হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে এটি মেরামত করে আবার চলাচল উপযোগী করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ইতিহাসের সাক্ষী শুভপুর ব্রিজের অবস্থা খুবই করুণ! ব্রিজের পিলারগুলোর নিচে থেকে বেশ খানিক মাটি সরে গেছে। মাটি সরে যাওয়ায় ব্রিজের পশ্চিমাংশ ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নিয়মিত এই ব্রিজ দিয়ে যাতায়াতকারী বারইয়ারহাট শহীদুল ইসলাম বলেন, ব্যবসার কাজে প্রায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মুখ যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এবং ‘কলমিলতা’ সহ বহু বাংলা ছায়াছবি ও স্বল্প দৈর্ঘ্য ছায়াছবির শুটিং স্পট হিসেবে শুভপুর ব্রিজ ব্যবহৃত হয়েছে। এখন ব্রিজটি ভেঙে পড়ার উপক্রম।

জানা গেছে, ফেনীর মহিপাল–-বারইয়ারহাট সংযোগ সড়কটি ১৯৮৩ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পর থেকে রাস্তা সংস্কার কাজের বাজেট বেশিরভাগ নতুন রোডে হয়ে থাকে। তাই পুরাতন রোডের ঐতিহাসিক এই ব্রিজটির দিকে কারো নজর নেই।

করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন বলেন, আমি সংশ্লিষ্ট সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষকে কয়েকবার জানিয়েছি ব্রিজটি মেরামতের জন্য। ব্রিজের এখন যে অবস্থা যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে নদীতে পড়বে। কিন্তু কেউ উদ্যোগ নিচ্ছেন না।

সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বলেন, আমার নিজের মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি রয়েছে এই ব্রিজে। আমি চেষ্টা করছি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত শুভপুর ব্রিজটি পুনর্র্নিমাণ, নয়তো সংরক্ষণ করে বিকল্প সেতু নির্মাণ করার। আমি মন্ত্রণালয়ে এর প্রস্তাবনাও দিয়েছি। আশা করছি আমরা শিগগিরই এর কাজ শুরু করতে পারব।