চট্টগ্রাম, , রোববার, ২৪ মার্চ ২০১৯

চবি ছাত্রীর মৃত্যুতে দায়ী ৩ শিক্ষকের নামমাত্র সাজা

প্রকাশ: ২০১৯-০২-২৭ ২১:৫২:১৭ || আপডেট: ২০১৯-০২-২৮ ১০:২৫:৫৫

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী প্রমিতি রহমানের ওপর মানসিক নির্যাতনের দায়ে মৃত্যুর ঘটনায় একই বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সালের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ফয়সালসহ আরো দুইজনকে এ শাস্তি দেওয়া হয়। এদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফয়সালের পদোন্নতি দুই বছর স্থগিত রাখা হয়েছে। আর তৎকালীন প্রীতিলতা হলের প্রভোস্ট মাহবুবুর রহমান ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মুনমুন নেছা চৌধুরীকে সতর্ক করা হয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১৯তম সিন্ডিকেট সভায় তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে অ্যামপ্লয়িজ স্ট্যাটাসের (ইফিসিয়েন্সি অ্যান্ড ডিসিপ্লিন) ৪(১)(বি) ধারা অনুযায়ী এই শাস্তি দেয়া হয়। একইসঙ্গে দায়িত্ব পালনের সময় ছাত্র ছাত্রীদের প্রতি আক্রোশমূলক কোনো আচরণ ভবিষ্যতে যাতে না হয়, সেজন্য তাদের সতর্ক করা হয়।

এই দণ্ডকে গুরু অপরাধের লঘু শাস্তি হিসেবে অ্যাখায়িত করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বেশ কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী ও প্রমিতির পরিবার।

২০১৫ সালে ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রমনা এলাকায় বাসায় মারা যান ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী প্রমিতি রহমান। ওই বছরের ২৬ অক্টোবর তার মা তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (বাজেট ও অডিট) আলম আরা বেগম বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে প্রমিতিকে নির্যাতনের অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও চবি ভিসির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

একইসঙ্গে ২০১৫ সালের ২ জুলাই শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সাল পরীক্ষার হলে প্রমিতি রহমানসহ চার শিক্ষার্থীকে মানসিক নির্যাতন করেছেন- এমন আরেকটি অভিযোগ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের পরীক্ষা কমিটি বরাবর করা হয়।

এছাড়া পরীক্ষার হলে মানসিক খাতা কেড়ে নিয়ে মানসিক নির্যাতন করায় আরেকটি অভিযোগ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর করা হয়।

এরপর ঘটনা তদন্তে চবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীন আখতার দুটি কমিটি গঠন করেন। এর একটির নেতৃত্বে চবির সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম ইমাম আলী। আরেকটির নেতৃত্বে উপ-উপাচার্য ও আইন অনুষদের ডিন এবিএম আবু নোমান।

অভিযোগগুলো তদন্ত করে দুটি কমিটিই শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সাল, মাহবুবুর রহমান ও মুনমুন নেছা চৌধুরীকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তির সুপারিশ করে। তিন বছর পর সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১৯তম সিন্ডিকেট সভায় সেই সুপারিশই বাস্তবায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তবে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সভায় মোহাম্মদ ফয়সাল তার বিরুদ্ধে নেয়া পদোন্নতি স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। সেটি নাকচ করে দেয়া হয়।

প্রথম তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে থাকা অধ্যাপক ড. এ এফ এম ইমাম আলী বলেন, আমি বস্তুনিষ্ঠভাবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। শিক্ষকের ভুলের জন্য একজন ছাত্রী মৃত্যু হয়েছে। যা কখনও কাঙ্ক্ষিত না। আমি চাই অবশ্যই দোষীদের শাস্তি হোক।

এ বিষয়ে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রমিতির মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো সত্যতা পেয়েছে এবং সুপারিশ করেছে। তারই ভিত্তিতে এই শাস্তি কার্যকর করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, শাস্তির বিষয়ে আমি অবগত। এখন ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব।

এছাড়া শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সালের বিরুদ্ধে প্রমিতিসহ চার শিক্ষার্থীর পরীক্ষার হলে খাতা রেখে দিয়ে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগটি তদন্ত করেন চবি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কেএম নুর আহমদ জানান, প্রমিতির মৃত্যু ঘিরে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটি সত্যতা পেয়ে সুপারিশ করেছে। তারই ভিত্তিতে তিন শিক্ষকের শাস্তি কার্যকর করা হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রমিতির মা আলম আরা বেগম বলেন, অনেক দেরিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে তাই তাদের ধন্যবাদ জানাই। তবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার সাজা মাত্র দুই বছর পদোন্নতি স্থগিত! সাজা দিতে হবে তাই যেন দেওয়া। আমার মতে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী এ সাজা অনেক কম হয়েছে।