চট্টগ্রাম, , রোববার, ২৪ মার্চ ২০১৯

রাসায়নিক নয়, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যুপুরী চকবাজার

প্রকাশ: ২০১৯-০২-২১ ২৩:২৯:২৪ || আপডেট: ২০১৯-০২-২১ ২৩:২৯:২৯

পুরান ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে ৮০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির পেছনে রাসায়নিকের গুদামের কথা উঠলেও সেখানে এ ধরনের গুদামের অস্তিত্ব মেলেনি। প্রত্যক্ষদর্শী, এলাকাবাসী, ফায়ার সার্ভিসসহ উদ্ধার তৎপরতায় যারা কাজ করেছেন তাদের তথ্যমতে, গাড়ি এবং রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এই দুর্ঘটনার কারণ।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা হয়েছে, যারা জানাচ্ছেন, দুটি গাড়ি আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতাই এই ঘটনার সূত্রপাত। এর একটি ছিল সিলিন্ডার গ্যাস বোঝাই পিকআপ এবং অপরটি প্রাইভেট কার। এক পর্যায়ে দুই গাড়ির মধ্যে সংঘর্ষে বিস্ফোরিত হয় প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এই বিস্ফোরণের পর সিলিন্ডারভর্তি পিকআপেও ধরে আগুন। আর সেখানে অসংখ্য সিলিন্ডার একসঙ্গে বিস্ফোরিত হওয়ার পর এর শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে গাড়িটি অন্তত তিনতলা বাড়ির সমান উঁচুতে উঠে মাটিতে আছড়ে পড়ে। সেই সঙ্গে ছড়িয়ে যায় আগুনের ফুলকি।

এই সময় সিলিন্ডারের ভেতরের গ্যাস আর আগুন চার পাশে ছড়িয়ে যায় কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই। এই আগুন গিয়ে পড়ে খাবার হোটেলের সামনে রাখা গ্যাসের সিলিন্ডারে। প্রচণ্ড উত্তাপে বিস্ফোরিত হয় সেগুলোও।

এসব বিস্ফোরণ বিদ্যুতের তার পুড়িয়ে দেওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ সংযোগ। আর অন্ধকারের মধ্যে এই আগুন তৈরি করে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।

চকবাজারের আগুনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নেয়ামত উল্লাহ বলেন, ‘রাস্তায় ম্যালা লোক ছিল। সিলিন্ডারটা ফাটল, নগদ আগুন ধরইরা গেল। রাস্তায় যারা ছিল, তাগো ক্ষতি বেশি হইছে।’

ধ্বংসযজ্ঞের শুরুর এই বর্ণনা পাওয়া গেছে প্রত্যক্ষদর্শী রশিদ আহমেদের কাছ থেকেও। স্থানীয় এই ব্যবসায়ী জানান, জ্যামে আটকে থাকা একটি পিকআপের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে এই ভয়াবহ নরককাণ্ডের সূত্রপাত। এরপর একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। তবে প্রথম বিস্ফোরণের পরই ওই পথে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। আর তাতে রাস্তায় যানবাহনে আটকে থাকা মানুষ ও পথচারীরা দগ্ধ হন আগুনে।

রশিদের ভাষ্য, প্রথম বিস্ফোরণের পর আগুনের ফুলকি গিয়ে পড়ে পাশের হাজি ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলার খাবার হোটেলে। হোটেলের সামনে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারেও বিস্ফোরণ ঘটে তখন। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ভবনে।

তখন বুধবার রাত সাড়ে ১০টা। চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের দোকানগুলো বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ব্যবসায়ীরা। তবে চুড়িহাট্টা জামে মসজিদ সংলগ্ন আসগর আলী লেন, নবকুমার লেন ও হায়দার আলী লেনের সংযোগস্থল চুড়িহাট্টার মোড়ে রিকশা, প্রাইভেট কার, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল মিলে জট লেগেছিল।

এর মধ্যে গ্যাসের বিস্ফোরণ দগ্ধ করে যানজটে আটকা পড়া বহু জনকে। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় তারা।

আগুন ছড়িয়ে পরে আশপাশের দোকান ও বাড়িতে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন লেগে যায় ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলার হোটেলে। আগুনে হোটেলে থাকা বেশ কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার আবারো বিষ্ফোরিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে হোটেলে থাকা সবাই আগুনে পুড়ে যায়।

আগুন রাস্তায় থাকা রিকশা, অটোরিকশা, প্রাইভেট কার ও আশপাশের মানুষের গায়ে ধরে যায়। এসময় বৈদ্যুতিক সংযোগ বিছিন্ন হয়ে গেলে অন্ধকারে দিকবিদিক দৌড়াড়ৌড়ি শুরু করে সাধারণ মানুষ।

এর মধ্যে ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচ তলায় থাকা প্লাস্টিক আর বডি স্প্রের গুদাম পুড়তে থাকলে ওপরের মানুষগুলোর নিচে নামার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আর গুদামের দাহ্য পদার্থগুলো কিছুক্ষণ পর পর বোমার মতো করে ফুটছিল।

এক পর্যায়ে আগুন ছড়ায় দোতলা, তিন তলা আর চারতলায়। গ্যাসের সিলিন্ডারগুলো ফুটতে থাকে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণের শব্দ নিয়ে। মানুষগুলো মুহূর্তেই নাই হয়ে গেল এই ভবনের।

প্রথমে ফায়ার সার্ভিসে চারটি ইউনিট কাজ শুরু করে। পরে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ ইউনিটে। আগুন নেভাতে ভোরে যোগ হয় দুটি হেলিকপ্টার। এমনকি পুলিশের দুটি জলকামান কাজ শুরু করে আগুন নিয়ন্ত্রণে। প্রায় বারো ঘন্টা প্রচেষ্টার পর ফায়ার সার্ভিসের দুইশ সদস্য আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকটে পড়তে হয় ফায়ার সার্ভিসকে। সরু গলি হওয়ায় আগুন নেভাতে বেশি বেশ পেতে হয়। বকশিবাজার, পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার ও আশপাশের পুকুর থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি এনে আগুন নেভানো হয়।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর দেখা গেছে, চুড়িহাট্টার মোড়ে আগুনে পুড়ে রাস্তায় কঙ্কাল হয়ে পরে আছে বেশ কয়েকটি যানবাহন। চারদিকে কেবল পোড়া ধ্বংসস্তূপ।

এরমধ্যে একটি রাস্তার মোড়ে একটি পিকআপ ভ্যান। এই সেই গাড়ি যার কারণেই এত মৃত্যু, এত ধ্বংস।

তার পাশেই ছিল ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশা। তার পাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি রিকশা ও দুটি প্রাইভেট কার। সবগুলোর লোহা ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই।

রাস্তার পরে আছে কয়েক বস্তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের দানা। রয়েছে বডি স্প্রে ও রুম স্প্রের টিনের বোতল। বেশি ভাগ বিষ্ফোরিত হলেও অনেক বোতল অক্ষত রয়েছে।

এই আগুন হাজার হাজার বোতল বিস্ফোরিত বডি স্প্রে আর লোশনের বোতল। যেই দুটি ভবনে লেগেছে সেখানে রাসায়নিকের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে গ্যাস সিলিন্ডার থেকেই আগুনের সূত্রপাত ছিল বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে।

চুড়িহাট্টা মোড়ে জামে মসজিদের সামনে ভ্রাম্যমাণ একজন তরকারি বিক্রেতা সঙ্গে সঙ্গে আগুনে ভূষ্মিভূত হয়ে মারা গিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানায়।

মানুষ মরেছে ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচ তলায় খাবার হোটেলে, সড়কে, রাস্তার পাশের গলিতে। এদের কেউ দিনভর ব্যস্ততার পর বাড়ি ফিরছিলেন, কেউ বিয়ের কেনাকাটা সেরে ফিরছিলেন ঘরে।

সকালে ফায়ার সার্ভিস যখন মরদেহ গুণতে শুরু করে তখন সংখ্যাটি ১০ ছাড়িয়ে ২০, ৩০, ৪০, ৫০ এর কোটায় গিয়ে পৌঁছে। পরে জানা যায় নিহতের সংখ্যা ৮১। হাসপাতাল ভর্তি আরও ৪১ জন যাদের মধ্যে নয় জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা সবাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে শিল্পমন্ত্রী বলেন, ‘ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেটা ছিল একটি রেস্টুরেন্ট। এটা হচ্ছে সিলিন্ডার ব্লাস্ট। ওই এলাকায় গ্যাসস্বল্পতা ছিল। হোটেলে সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করতো। যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা কেমিক্যাল এরিয়া না, এখানে কেমিক্যালের কোনো অস্তিত্ব নেই, কোনো গোডাউনও ছিল না।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী আহমদ খান বলেন, ‘আগুনের সূত্রপাত তদন্তের পর বলা যাবে। যতটুকু শুনেছি, এই প্রাইভেটকারের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর ভবনের একটি অংশে আগুন লাগে। পাশে একটি খাবারের হোটেল ছিল, সেখানে এলপিজি গ্যাস ব্যবহার হতো। এছাড়া ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় কেমিক্যালের মজুদ ছিল। ছিল প্লাস্টিক দানার মতো অতি দাহ্য পদার্থ। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।’-ঢাকাটাইমস