চট্টগ্রাম, , শনিবার, ২৩ মার্চ ২০১৯

মিরসরাইয়ে ১৫দিনে ৭ অগ্নিকান্ড নিহত ৩, পনের কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

প্রকাশ: ২০১৯-০২-১৭ ১৭:৪৮:৩৫ || আপডেট: ২০১৯-০২-১৭ ১৭:৪৮:৪৪

এম মাঈন উদ্দিন

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গত ১৫দিনে ৭টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব অগ্নিকান্ডে বতসঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস পুড়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। নিহত হয়েছেন ৩জন, ৪জন আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন এর লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছে আগুন নিয়ন্ত্রনের কারণে ক্ষতির পরিমান কম হচ্ছে। অন্যথায় আরো বেশি ক্ষতি হওয়ার আশংকা ছিল। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, গ্যাস সিলিন্ডার, চুলার আগুন থেকে এসব অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকে।

জানা গেছে, গত ১ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টায় উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের ডোমখালী এলাকার হাশ্বা মিয়া হাজী বাড়িতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকান্ডে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল আলম, নুরুল করিম, নুরনবী ও কবিরাজের বসতঘর পুড়ে গেছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবী করছে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো।

৪ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে অগ্নিকান্ডে উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের নিজামপুর প্রি-ক্যাডেট কেজি স্কুলের দুটি শ্রেণী কক্ষ পুড়ে গেছে। এতে প্রায় দুই লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কমল কান্তি চক্রবর্তী জানান, অফিস কক্ষের কম্পিউটার প্রজেকট সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় মূল্যবান জিনিসপত্র পুড়ে গেছে।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে মিরসরাই পৌর বাজারের ২৫টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এতে প্রায় ১৪ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীরা।

অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, মোঃ নুরুল হকের হক সু স্টোর (জুতার দোকান), মোঃ শফিউল আলমের রনি সু স্টোর (জুতার দোকান), মোঃ স্বপনের স্বপন স্টোর (জুতার দোকান), স্বপন কুমার নাথের মা-মনি টেইলার্স, হরলাল নাথের টেইলার্স দোকান, মোঃ মুন্নার আল আযীয ফার্মেসী, আবুল হোসেন ডিলারের মুদি দোকান ও কীটনাশকের দোকান, মোঃ রুবেলের হাওলাপুরী পশু খাদ্য দোকান, শিমুল দাশের শিমুল স্টোর (মুদি দোকান), বজেন্দ্র কুমার নাথের বাবু স্টোর (মুদি দোকান), মোঃ ইউসুফের আল আমিন ট্রেডার্স (কনফেকশনারী পাইকারী দোকান), সঞ্জয় শীলের জলসা হেয়ার কাটিং, রুবেল চন্দ্র নাথের গোপাল স্টোর (পান দোকান ও কসমেটিক্স দোকান), বেচু কুমার দাশের লন্ডী দোকান, ডা. জাফর উল্ল্যাহ খানের খান ফার্মেসী। এছাড়া মার্কেটের সামনে ভ্রাম্যমান দোকানের মধ্যে রয়েছে জামশেদ আলম, আমান উল্ল্যাহ, দিলীপ দাশ, নেপাল বাবু, নিতাই দাশ, মনা দাশ, তৈয়বুল আলম, ঝোলন নাথ ও রতন দাশের পান-সুপারি-জর্দার দোকান।

শিমুল স্টোরের মালিক শিমুল দাশ জানান, তারা দোকানে প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল ছিলো নগদ ছিলো সাড়ে ৩ লাখ টাকা। কৃষি ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দোকানে পন্য তোলেন তিনি। বাবু স্টোরের বজেন্দ্র কুমান নাথ জানান, তার দোকানেও প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মালামাল ছিলো। এছাড়া নগদ ছিলো ১০ লাখ টাকা। তার সিসি লোন রয়েছে ৩৫ লাখ টাকার। মেসার্স আল আমিন ট্রেডার্সের মালিক মোঃ ইউসুফ জানান, তার দোকানে প্রায় ৩০ লাখ টাকার মালামাল ছিলো। নগদ ছিলো ৬০ হাজার টাকা। জলসা হেয়ার কাটিংয়ের মালিক সঞ্চয়শীল জানান, তার দোকানে প্রায় ১ লাখ টাকার মালামাল ছিলো। নগদ ছিলো ৩২ হাজার টাকা। গোপাল স্টোরের মালিক রুবেল চন্দ্র নাথ জানান, তার দোকানে প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল ছিলো। নগদ ছিলো প্রায় ২ লাখ টাকা। আবুল হোসেন ডিলার জানান, তার দোকানে ২০ লাখ টাকার মালামাল ছিলো। নগদ ছিলো ১০ হাজার টাকা। স্বপন সু স্টোরের মালিক মোঃ স্বপন জানান, তার দোকানে ৩ লাখ টাকার জুতা ছিলো। নগদ ছিলো ১৪ হাজার টাকা। হক সু স্টোরের মালিক নুরুল হক জানান, তার দোকানে ২৫ লাখ টাকার মালামাল ছিলো। নগদ টাকা ছিলো ১ লাখ ৫০ হাজার। রনি সু স্টোরের মালিক মোঃ শফিউল আলম জানান, তার দোকানে ১৫ লাখ টাকার মালামাল ছিলো। নগদ ছিলো ১২ হাজার টাকা। মা-মনি টেইলার্সের মালিক স্বপন কুমার নাথ জানান তার দোকানে ৬ লাখ টাকার মালামাল ছিলো। আল আযীয ফার্মেসীর মালিক মুন্না জানান তার দোকানে ১৫ লাখ টাকার ওষুধ ছিলো। খান ফার্মেসীর মালিক ডা. জাফর খান জানান তার দোকানে প্রায় ৬ লাখ টাকার ওষুধ ছিলো। এছাড়া ছোট দোকানগুলোতে প্রায় ৫ লাখ টাকার মালামাল ছিলো বলে জানা গেছে।

১১ ফেব্রুয়ারি উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের খিলমুরালী গ্রামের মোঃ বাবুলের বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে প্রায় ১ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন সকালে উপজেলার নিজামপুর এলাকায় লরি ও মাইক্রো বাসের ঘর্ষণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রী চালকসহ তিনজন পুড়ে অঙ্গার হয়ে ঘটনাস্থলে মারা গেছে। আহত হয়েছে দুই শিশু সহ আরো ৪জন।

নিহতরা হলো আব্দুর রহমান (৬৫) ও তাঁর স্ত্রী বিবি কুলছুম (৫৫) এবং মাইক্রো বাসের চালক মাহবুব আলম (৩০)। এ ঘটনায় দগ্ধ দুই শিশু আব্দুল মালেক রনি (১২) ও রাসেল (০৯)। এছাড়া ওই দূর্ঘটনায় আহত হন তার ছেলে আবুল কালাম ও ছেলের শ্যালক আবুল হাসান।

জোরারগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ সোহেল সরকার বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারী সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হাদিফকিরহাট এলাকায় চট্টগ্রামমুখী একটি লরিকে পেছন দিন থেকে ধাক্কা দেয় যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাস। এসময় মাইক্রোবাসটি লরির পেছনে আটকে যায়। নিজামপুর কলেজ গেইট যাওয়ার পর মাইক্রোবাসে আগুন ধরে ঘটনাস্থলে ৩জন মারা গেছে।

জানা গেছে, নিহত ও আহতদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার হাসনাবাদ ইউনিয়নের কমলপুর গ্রামে। তাঁরা দুবাই ফেরত মোমিনুল ইসলাম স্বপন নামে একজনকে আনতে চট্টগ্রাম শহরে যাওয়ার পথে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে উপজেলার ওছমানপুর ইউনিয়নের আজমপুর বাজার সংলগ্ন পাতাকোট গ্রামের হোসেন ডিলার বাড়িতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।

অগ্নিকান্ডে মোঃ শেখ ফরিদ ও হারুন অর রশিদের ঘর পুড়ে যায়। এতে প্রায় লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবী করেন ক্ষতিগ্রস্থরা।

সর্বশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে উপজেলার দুয়ারু এলাকার মকবুল ভূঁইয়া বাড়িতে একটি খড়ের গাদায় আগুন লাগে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ঘটনাস্থলে পৌছে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনার কারণে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি।

মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসের স্টেশান অফিসার রবিউল আজম রবিন জানান, উপজেলার যে কোন স্থানে অগ্নিকান্ডের খবর পেলেই আমরা দ্রুত ছুটে যায়। অনেক জায়গায় রাস্তা ছোট হওয়ার কারণে গাড়ি ঢুকতে না পারায় সমস্যায় পড়তে হয়। তারপরও গত ১৫দিনে বিভিন্ন অগ্নিকান্ডে প্রায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজে আমরা তৎপর রয়েছি। তিনি মানুষকে অগ্নিকান্ডের ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়ার অনুরোধ করেন।