চট্টগ্রাম, ৯ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯

মাদক কারবারীর পরিবারে আতংক! আজ আত্মসমর্পন

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১০:৪৩ : পূর্বাহ্ণ

আমান উল্লাহ কবির
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

শীর্ষ মাদক গডফাদার থেকে শুরু করে চুনোপুটি ইয়াবা কারবারী পরিবারের মধ্যে সংশয় ও আতংক দেখা দিয়েছে। কি ঘটে যাচ্ছে আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ভাগ্যে। এব্যাপারে সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ থেকে কোন ধরনের মন্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আজ শনিবার (১৬ ফেব্রুয়ারী) সকালে শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিয়ে টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান।

তারা সকলে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। ওই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. জাবেদ পাটোয়ারী, স্থানীয় এমপি শাহিন আক্তারসহ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন বলে গত তিন দিন ধরে টেকনাফের শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে মাইকিং করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গেল বছর মে মাসের শুরু থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষনা করায় অভিযান জোরদার হতে থাকে আইনশৃংখলা বাহিনীর।

অভিযান শুরুর পর প্রায় প্রতিদিনই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্দেহভাজন মাদক কারবারিদের হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এ সময় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শুধু কক্সবাজারেই ৪২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে টেকনাফে নিহতের সংখ্যা ৩৯ জন। তাদের মধ্যে ২৫ জন টেকনাফের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। সেখানে রয়েছে দুইজন জনপ্রতিনিধি। ফলে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতংক দেখা দেয়। এদের মধ্যে অনেকে প্রাণ বাঁচাতে পথ খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে বিভিন্ন মাধ্যমে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব দেয়। এতে সরকার নির্মূলের জন্য কারবারীদের আত্মসমর্পনের সুযোগ দিতে সম্মত হয়। এরপর গত ১০ জানুয়ারি থেকে ইয়াবা কারবারীরা কক্সবাজার পুলিশ হেফাজতে চলে যায়। এরপর থেকে শুরু হয় দল বেঁধে নিজেদের সমর্পণ প্রক্রিয়া। পরে ফেসবুকে জানান দিয়ে টেকনাফ সদরের ৮ নং ওয়ার্ডের মেম্বার এনামুল হক একঝাঁক ইয়াবা কারবারীসহ শো-ডাউনের মাধ্যমে আত্মসমর্পন করেন।

এরপরেও তালিকাভূক্ত ১ হাজার ১’শত ৫১ জন থেকে গুটি কয়েক নিজেদের সমর্পন করে পুলিশ হেফাজতে গেলেও অনেক রাঘববোয়াল দেশ ও দেশের বাইরে আত্মগোপনে রয়েছে। ইতিমধ্যে সেফহোমে যাওয়া শতাধিক স্ব-ঘোষিত মাদক কারবারিদের মধ্যে ৩৮ জনের মতো গডফাদার রয়েছে বলে সুত্রে জানা যায়। বাকিদের মধ্যে অনেকে তালিকাভূক্ত না হলেও তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে বলেও জানা যায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থাকা ওই হালনাগাদ তালিকায় সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিসহ ৩৪ জন সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধি এবং বদির ভাই, বোন, ভাগ্নেসহ ২৬ জন আত্মীয়ের নাম রয়েছে। আরেক সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীর স্বজনের নামও রয়েছে। রয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদের স্বজনদের নামও। তবে উল্লেখিত জনপ্রতিনিধিরা বার বার তাদের স্বজনরা ইয়াবা কারবারে জড়িত নয় বলে দাবী করে আসছেন।

আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে রয়েছেন- সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ভাই আবদুর শুক্কুর, শফিকুল ইসলাম শফিক, আমিনুর রহমান ওরফে আবদুল আমিন, ফয়সাল রহমান, বদির ভাগিনা সাহেদ রহমান নিপু, আরেক ভাগিনা টেকনাফ পৌর ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূরুল বশর ওরফে নূরশাদ, মং সিং থেইন ওরফে মমসি, ফুপাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেল, মারুফ বিন খলিল বাবু, বদির বেয়াই সাহেদ কামাল, টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলমের ছেলে দিদার মিয়া। টেকনাফের হ্নীলার ৮ নং ওয়ার্ডের মেম্বার নুরুল হুদা, টেকনাফ সদরের ৮ নং ওয়ার্ডের এনামুল হক এনাম মেম্বার, সাবরাংয়ের ১ নং ওয়ার্ডের মোয়াজ্জেম হোসেন দানু মেম্বার, হ্নীলার ৭ নং ওয়ার্ডের জামাল মেম্বার, সাবরাং ইউপির শাহপরীর দ্বীপের ৭ নং ওয়ার্ডের মেম্বার রেজাউল করিম রেজু মেম্বার, উত্তর আলী খালির শাহ আজম ও সাবরাং নয়াপাড়ার আলমগীর ফয়সাল লিটন, ইয়াবা ডন হাজী সাইফুল করিমের দুই শ্যালক জিয়াউর রহমান ও আবদুর রহমান। টেকনাফের পশ্চিম লেদার নুরুল কবির, হ্নীলা সিকদারপাড়ার সৈয়দ আহম্মদ সৈয়দ, বন্দুকযুদ্ধে নিহত নাজিরপাড়ার শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমানের ভাই আবদুর রহমান, নাজিরপাড়ার সৈয়দ হোসেন, নাইটংপাড়ার ইউনুস, ডেইলপাড়ার জাফর আলম, জাহাজপুরার নুরুল আলম, হ্নীলার রশিদ আহম্মদ ওরফে রশিদ খুলু, সদরের ডেইল পাড়ার আব্দুল আমিন ও নুরুল আমিন, টেকনাফ সদরের উত্তর লম্বরি এলাকার করিম মাঝি, হ্নীলা ফুলের ডেইলের রুস্তম আলী। শামলাপুর জুমপাড়ার শফিউল্লাহ, একই এলাকার সৈয়দ আলম, রাজাছড়ার আব্দুল কুদ্দুছ, মধ্যম জালিয়াপাড়ার মোজাম্মেল হক, জাহেলিয়াপাড়ার মোহাম্মদ সিরাজ, কচুবনিয়ার আব্দুল হামিদ, নাজিরপাড়ার মোহাম্মদ রফিক, পল্লানপাড়ার মোহাম্মদ সেলিম, নাইটংপাড়ার রহিমউল্লাহ, নাজিরপাড়ার মোহাম্মদ হেলাল, চৌধুরীপাড়ার মোহাম্মদ আলম, সদর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়ার একরাম হোসেন। হ্নীলার পূর্ব পানখালির নজরুল ইসলাম, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের তুলাতলি এলাকার নুরুল বশর ওরফে কালা ভাই, হাতিয়ার ঘোনার দিল মোহাম্মদ, একই এলাকার হাসান, সাবরাং নয়াপাড়ার নূর মোহাম্মদ, কচুবনিয়ার বদিউর রহমান ওরফে বদুরান, জালিয়াপাড়ার জুবায়ের হোসেন, হ্নীলার পূর্ব লেদার জাহাঙ্গীর আলম প্রমূখ।

সেফহোমে যাওয়া কয়েক পরিবারের সাথে কথা হলে জানা যায়, তারা উদ্বিগ্ন-উৎকন্ঠায় রয়েছেন। অনেক পরিবার ইয়াবায় অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও দীর্ঘ মেয়াদী কারাদন্ড হওয়ার সংশয়ে রয়েছেন। যদি এমনটি হয়ে যায়, কি হবে তাদের পরিবারের সদস্যদের সার্বিক অবস্থা। আবার অনেকেই সরকার তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দিবেন এমনও আশা করছেন।
পৌর কমিশনার নুরুল বশর নুরশাদের পিতা মোঃ ইউনুছ জানান, তারপুত্র একজন জনপ্রতিনিধি। মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তালিকাভূক্ত হলে তিনিও আত্মসমর্পন করে। এখন কি ফায়সালা হয় তা আল্লাহর উপর নির্ভর করে আছি।

টেকনাফ সদরের ৮ নং ওয়ার্ডের মেম্বার এনামুল হকের ভাই হাফেজ নুরুল হক মোজাহেরী জানান, সরকারের স্বদিচ্ছা ও সম্পূর্ণ আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছি।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার জানান, আজ শনিবার টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মাদক কারবারীদের আত্মসমর্পন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে ইতিমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এ অনুষ্ঠান সফল করতে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগীতা কামনা করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, ইয়াবা পাচারের প্রবেশদ্বার খ্যাত টেকনাফে গত দেড় যুগ ধরে এ ব্যবসা চলে আসছে। এ ব্যবসায় অনেক হঠাৎ ‘আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ’ হয়েছেন। অনেকে কথিত বন্ধুক যুদ্ধে নিহতও হয়েছেন। রিক্সাওয়ালা, দিনমজুর, পিঠা বিক্রেতা থেকে হয়েছেন কোটিপতি। ধ্বংস হয়েছেন দেশের হাজার হাজার ছাত্র-যুবসমাজ।