চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সাতকানিয়ায় ৩০ ফুট গভীর করে কেটে নেয়া হচ্ছে ফসলি জমির মাটি!

প্রকাশ: ২০১৯-০২-১১ ১০:৪৭:৫১ || আপডেট: ২০১৯-০২-১১ ১৭:৫১:২৫

সাতকানিয়া প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় উপজেলায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রির হিড়িক পড়েছে। কৃষকদের অভাবের সুযোগে এসব মাটি খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর) দিয়ে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, এতে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হবে।

সাতকানিয়ায় কৃষিজমির মাটি অবাধে কেটে নেয়ার ফলে কৃষিজমির উর্বরতাশক্তি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জমিতে ফসল উৎপাদনের উপযোগী মাটি হলো জমির উপরের অংশ বা টপ সয়েল। একবার টপ সয়েল কেটে নিলে তা পূরণ হতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ বছর।

এ দিকে সরকারের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ অনুসারে কৃষিজমি, পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি কাটলে অথবা অনুমোদন ছাড়া নদী বা হাওর, চরাঞ্চল থেকে মাটি কাটলে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান থাকার পরও প্রশাসন এ সবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

জানা যায়, ভাটার ইট তৈরি, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও বসতভিটে ভরাট করার কাজে এ মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

জমির মালিকরা সামান্য টাকার লোভে একটি সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন।

এলাকাবাসী জানান, প্রতি বছর আমন ধান কাটার পর থেকে বর্ষাকাল শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এক শ্রেণীর অসাধু মাটি ব্যবসায়ী গরিব কৃষক ও জমির মালিকদের টাকার লোভ দেখিয়ে আবাদি জমির মাটি কিনে নেয়।

জমির মালিকরা জমির মাটি বিক্রির কুফল সম্পর্কে না জানার কারণে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে নামমাত্র মূল্যে মাটি বিক্রি করে দেয়।

প্রতি বছর বিশেষ করে ইটভাটার মওসুম শুরু হওয়ার পর স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র মাটি ব্যবসায়ীদের সাথে সিন্ডিকেট করে জমির মালিকদের ওপর বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ করে মাটি বিক্রি করতে বাধ্য করে বলেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা কেওচিঁয়া, ঢেমশা, ছদাহা, নলুয়া, খাগরিয়া, মাদার্শা, চরতি, সাতকানিয়া সদর, পশ্চিম ঢেমশা, এলাকার আবাদযোগ্য কৃষিজমি থেকে স্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে প্রতিদিন প্রায় শত শত ট্রাক ভর্তি করে উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক ইটভাটা থাকায় এখানে মাটির চাহিদাও বেশি। স্থানীয় প্রকারভেদে প্রতি একর জমির মাটির দাম কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

মাটি ব্যবসায়ীরা জানান, জমির মালিকদের কাছ থেকে আমরা মাটি ক্রয় করে ব্যবসা করি। ভাটার দূরত্ব অনুযায়ী পরিবহনখরচের ওপর মাটির দাম কম-বেশি হয়ে থাকে।

এর মধ্যে ইট তৈরির উপযোগী ও ভাটার কাছাকাছি জমির মাটির দাম তুলনামূলক বেশি। এখানকার বেশির ভাগ মাটি ইটভাটায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

প্রতি বছর ইটভাটার মওসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে আবাদকৃত কৃষি জমিগুলোর মাটি কাটা হয়। আর মাটিগুলো স্থানীয় ইটভাটায় মজুদ শুরু হয়। এখানকার প্রতিটি ইটভাটায় পাহাড় সমান করে মাটি পরবর্তী বছর ব্যবহারের জন্য মজুদ করে রাখা হয়।

এভাবে প্রতি বছর অবাধে উর্বর কৃষিজমিগুলোর মাটি কেটে নেয়ার ফলে সাতকানিয়ায় দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে কৃষিজমির পরিমাণ। ইতোমধ্যে শত শত একর কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর।

স্থানীয় কয়েকজন জমির মালিক জানান, স্কেভেটর দিয়ে মাটি ব্যবসায়ীরা কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় জমির মালিকদের অগোচরে রাতের বেলায় মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ভূমিদস্যুরা।

মাটিকাটার বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের কাছে নাজেহাল ও হামলার শিকার হতে হয়। এসব ভূমিদস্যুর রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে জমির মালিকেরা অনেকটা দিশেহারা।

এ দিকে উপজেলার ছদাহা এলাকার জমির মালিক সৈয়দনুর জানান, তার জমির পাশের অনেক জমির মালিক মাটি বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে মাটি ব্যবসায়ীরা জমিগুলো থেকে ২০-২৫ ফুট এবং অনেক ক্ষেত্রে ৩০-৩৫ ফুট পর্যন্ত গভীর করে মাটি কাটার ফলে তাদের জমিগুলোতে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আর জমিগুলোতে কোনো রকমের চাষাবাদ হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে জমির মাটি বিক্রি করে দিতে হয়।

এ ব্যাপারে উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এস এম জহির জানান, ফসলি জমি থেকে টপ সয়েল কেটে নেয়ার ফলে আবাদি জমিগুলোর উর্বরতাশক্তি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফসল উৎপাদনের জন্য মাটির যে গুণাগুণ থাকা দরকার তার সবটুকুই থাকে উপরের অংশে। আর একবার মাটির উপরের অংশ কেটে নিলে তা পূরণ হতে অনেক বছর সময় লাগে।