চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

কর্ণফুলীর উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যেও বহাল অবৈধ মৎস্য আড়ত

প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৮ ০৯:৪৩:০৮ || আপডেট: ২০১৯-০২-০৮ ২২:০৩:৩৩

কর্ণফুলীতে প্রাণ ফেরাতে যে উচ্ছেদ অভিযান চলছে, তাতে সহযোগী হিসেবে আছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই অবৈধ জায়গায় গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ভেঙে দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। অথচ এ বন্দর কর্তৃপক্ষই নদীতীরের জায়গা লিজ দিয়েছে অবৈধভাবে। শতকোটি টাকা মূল্যের চার একর ভূমি চার কোটি ২২ লাখ টাকায় ১৫ বছরের জন্য লিজ দিয়েছে তারা বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের কাছে। লিজ নেওয়া এ জায়গায় ১৮৮টি কক্ষ দিয়ে সমবায় সমিতি গড়ে তুলেছে মৎস্য আড়ত। ভূমি অফিসের সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার জরিপ করে অবৈধ জায়গায় এ আড়ত গড়ে উঠেছে বলে রিপোর্ট দিয়েছেন। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনও তাদের রিপোর্টে অবৈধ এ আড়ত উচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে অবৈধ হিসেবে তালিকাভুক্ত দুই হাজার ১৮১ স্থাপনার মধ্যে রাখা হয়নি এ মৎস্য আড়ত। উচ্ছেদ অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠছে শুরুতেই।

এদিকে গতকাল বুধবার দুপুর ১টায় মাঝিরঘাটে যখন উচ্ছেদ অভিযান চলছিল, তখন ফিশারিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নতুন করে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ওইখানে ছয়টি কক্ষের একতলা ভবনে আস্তর দেওয়ার কাজ করছিল পাঁচজন শ্রমিক। আবার একই সময়ে ফিশারিঘাটের মাঝামাঝি পয়েন্টে একতলা একটি ভবনকে দ্বিতল করার কাজ করছিল ১৫ জন শ্রমিক। মাঝিরঘাটে যখন নদীতীর থেকে ১০০ ফুট দূরের স্থাপনাও ভাঙা হচ্ছিল, তখন ফিশারিঘাটের এসব নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছিল নদীতীরের ৪০ ফুটের মধ্যেই। অভিযান পরিচালনা করা সংস্থার এমন দ্বৈত ভূমিকায় নাখোশ সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, এক নদীর জন্য দুই আইন হতে পারে না। নিজেদের অবৈধ স্থাপনা অক্ষত রেখে অন্যের স্থাপনা ভেঙে দিলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে এ উচ্ছেদ অভিযান।

এ প্রসঙ্গে কর্ণফুলী নদীর গবেষক অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। যে সংস্থা উচ্ছেদ অভিযানের সঙ্গে আছে, তারা নিজেরাই যদি আইন ভঙ্গ করে নদীতীরে অবৈধ জায়গা লিজ দেয়, তবে সাধারণের মধ্যে তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। নিজের অবৈধ জায়গা অক্ষত রেখে অন্যের জায়গায় বুলডোজার চালালে পুরো অভিযানই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’

ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাটি ফেলে কর্ণফুলী নদীতীরের এ জায়গার দখল নেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর পর বছরে ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা দরে ১৫ বছরের জন্য এ জায়গা ইজারা দেয় তারা। শতাধিক কক্ষের মৎস্য আড়ত তৈরি করে পরে এটি বিক্রি করে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেড। প্রতিটি আড়ত পাঁচ থেকে ৩০ লাখ টাকা দরে শতাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছে তারা। তাই এটি রক্ষা করতে তারা দ্বারস্থ হয়েছে প্রভাবশালীর। এ জন্য নদীতীরের এই জায়গা বাদ দিয়েই দুই হাজার ১৮১ স্থাপনার তালিকা তৈরি করেছে জেলা প্রশাসন।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘আমরা যখন তালিকা করেছিলাম, তখন এটি মৎস্য আড়ত ছিল না। তারপরও মৎস্য আড়তের সামনের কিছু অংশ অবৈধ হিসেবে মার্ক করা হয়েছে। কেন এ জায়গার পুরোটা অবৈধ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি- তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে পুনরায় জরিপ করব আমরা।’ তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি এস্টেট অফিসার জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বন্দর চ্যানেল হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। এটির শাসন, খনন, সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত। সাধারণত কর্ণফুলী নদীর হাই ওয়াটার মার্ক (সাধারণ জোয়ারে নদীর পানি যে সীমানা স্পর্শ করে) ১৫০ ফুট পর্যন্ত বন্দরের এখতিয়ারে। তা ছাড়া নদীকেন্দ্রিক যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করে, তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করাও বন্দরের কাজ। এ চিন্তা থেকেই জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে জায়গাটি লিজ দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এটি বন্দরের বৈধ জায়গা।’

অথচ জরিপ করে বন্দর ভূমি অফিস সদর সার্কেলের সহকারী কর্মকর্তা খোরশেদুল আলম মৎস্য আড়তের জায়গাটি নদীর তীর দখল করে নির্মিত হয়েছে বলে প্রতিবেদন দিয়েছেন। আবার ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে একটি প্রতিবেদন দেন সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আছিয়া খাতুন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মধ্যবর্তী স্থানের যে জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, তা ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত নদী শ্রেণির জমি। খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গা কী বিবেচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইজারা বা ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেছে, তা বোধগম্য নয়।’ এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন ২০১৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কর্ণফুলী নদীর পাশের জমিতে স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। কাজ অব্যাহত রাখলে উচ্ছেদ কার্যক্রম গ্রহণ করে ফৌজদারি মামলা করারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। পাশাপাশি ইজারা প্রদান বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকেও চিঠি দেন তিনি। জেলা প্রশাসনের চিঠিতে কর্ণফুলী নদী নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়- ‘কর্ণফুলী তীরবর্তী স্থানে সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৬ সালের ৬ জুন নির্দেশনা দিয়েছেন। এর পরও নদীতীর লিজ দিলে কিংবা স্থাপনা তৈরি করা হলে তা হবে আদালতের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আদালতের এ নির্দেশনাবলে যে কোনো সময় এ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষমতাও রাখে জেলা প্রশাসন।’ আবার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনও তাদের এক রিপোর্টে মৎস্য আড়তটি নদীতীরের অবৈধ জায়গায় গড়ে উঠেছে বলে মতামত দিয়েছে। তারা এ স্থাপনাটি উচ্ছেদেরও সুপারিশ করে। তারপরও এ জায়গাটি নিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছে প্রভাবশালী একটি মহল।

এদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও নদীতীরের এ স্থাপনা অবৈধভাবে গড়ে ওঠায় এটি অধিগ্রহণ করতে চিঠি দিয়েছে জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে। সম্প্রসারিত রিং রোড প্রকল্পের জন্য এ জায়গাটি অধিগ্রহণ করা হবে বলে লাল কালি দিয়ে চিহ্নিতও করেছে তারা। দখলদারদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না- তা সাত দিনের মধ্যে জানাতে চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন চউকের অথরাইজড অফিসার-১। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর এ চিঠি ইস্যু করেন তিনি। কিন্তু এ চিঠির কোনো জবাব না দিয়ে উল্টো খালি জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে ১৮৮টি কক্ষের মৎস্য আড়ত। দুই মাস আগে এ আড়তের পেছনে ২৮টি পিলার দিয়ে নতুন করে আটটি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। বরফকল কিংবা স্টোর হিসেবে এ ঘরগুলো ব্যবহূত হতে পারে বলে জানালেন স্থানীয়রা। এর আগে মৎস্য আড়তের জন্য পাঁচটি একতলা ভবন ও একটি দোতলা ভবন তৈরি করা হয়েছে। ‘ইউ’ আকৃতিতে তৈরি হওয়া একতলা ভবনের দোকানগুলো করা হয়েছে মাছের আড়ত। আর দোতলা ভবনটি শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের ভূমি শাখার আপত্তি থাকার পরও কেন তালিকাভুক্ত দুই হাজার ১৮১ অবৈধ স্থাপনার মধ্যে এটির উল্লেখ নেই- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রাই। তবে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জায়গাটি ১৫ বছরের জন্য লিজ নিয়েছি আমরা। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে মাছের আড়ত তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এটি অবৈধ স্থাপনা হলে কীভাবে লিজ দিল বন্দর কর্তৃপক্ষ? আমাদের উচ্ছেদ করা হলে আমরা বন্দর থেকে ক্ষতিপূরণ চাইব।’ মৎস্য আড়তের এই জায়গা তালিকাভুক্ত দুই হাজার ১৮১ অবৈধ স্থাপনার মধ্যে নেই বলেও জানান তিনি।- সমকাল