চট্টগ্রাম, , শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

চট্টগ্রামে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী ৩৩ হাজার

প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৭ ০০:০০:৫৮ || আপডেট: ২০১৯-০২-০৭ ১৭:১৮:০০

বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন খ্রিষ্টান ধর্ম পালনকারীর সংখ্যা চট্টগ্রামে ৩৩ হাজার। সারাদেশে এ সংখ্যা তিন লাখ ৮০ হাজার বলে তথ্য প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম আর্চডাইয়োসিসের মেট্রোপলিটন আর্চবিশপ মজেস কস্তা।

বুধবার আনুষ্ঠানিক এক সংবাদ সম্মেলনে মজেস কস্তা এ তথ্য জানান।

প্রসঙ্গত, ৫০০ বছর আগে ১৫১৮ সালে পর্তুগিজ বণিকরা যখন চট্টগ্রামে আসেন, সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলে প্রথম খ্রিস্টধর্মের প্রচলন হয়। পরবর্তীতে এই খ্রিস্টবিশ্বাস তৎকালীন পূর্ববঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। যে পুরোহিত ফাদার বঙ্গদেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, আরাকান সৈন্যদের হাতে তাকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়। শহীদ হন আরও প্রায় ৬০০ ধর্মাবলম্বী।

সেসব শহীদদের রক্তের বিনিময়ে ‘মানবতা এবং সেবা’র মহিমা নিয়ে গত ৫০০ বছর ধরে বাংলাদেশ, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল এমনকি মিয়ানমারেও টিকে আছেন লাখ লাখ খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী।

চট্টগ্রামে খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসীদের আসার ৫০০ বছর পূর্তিতে গণমাধ্যমের কাছে এই ইতিহাস সামনে এনেছেন চট্টগ্রাম আর্চডায়োসিসের মেট্রোপলিটন আর্চবিশপ মজেস কস্তা। আর্চডায়োসিসের পক্ষ থেকে এ উপলক্ষে করা হয়েছে বর্ণাঢ্য আয়োজন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে এই আয়োজন শুরু হবে বলে জানিয়েছেন মজেস কস্তা।

সংবাদ সম্মেলনে মজেস কস্তা জানান, আরাকান সৈন্যদের হাতে নিহত ৬০০ খ্রিস্টশহীদের সমাধিতে মঙ্গলপ্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হবে এই অনুষ্ঠান। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় চট্টগ্রামে খ্রিস্টবিশ্বাসীদের প্রথম প্রার্থনালয় কর্ণফুলী উপজেলার দৌলতপুরের মরিয়ম আশ্রম দিয়াং-এ এই মঙ্গলপ্রার্থনা হবে। এরপর সারাদেশ থেকে আসা কয়েক হাজার খ্রিস্টভক্ত সম্মিলিত প্রার্থনায় অংশ নেবেন।

শুক্রবার (৮ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হবে মহাখ্রিস্টযোগ। এরপর সন্ধ্যা ৬টায় নগরীর পাথরঘাটায় বিশপ ভবনে একটি আন্ত:ধর্মীয় সভা হবে। এতে সবধর্মের বিশিষ্টজনদের সমাগম ঘটবে। এছাড়া বাংলাদেশের সব বিশপদের পাশাপাশি ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূতও এই আয়োজনে অংশ নেবেন।

সংবাদ সম্মেলনে ৫০০ বছর পূর্তি আয়োজনের মিডিয়া উপ-কমিটির চেয়ারম্যান ও কারিতাস চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক জেমস গোমেজ বলেন, ‘খ্রিস্টধর্ম ছাড়াও অন্য ধর্মাবলম্বী সকলের সঙ্গে নিজেদের আনন্দ সহভাগিতার জন্য আন্ত:ধর্মীয় সভার আয়োজন করা হয়েছে। তিন ধর্মের পাঁচজন করে বিশিষ্টজনকে দাওয়াত করা হয়েছে। সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজনও থাকবেন।’

মজেস কস্তা বলেন, ‘এই আয়োজন, এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। আবার ৫০০ বছর পর হয়ত এই ধরনের আয়োজন হবে। ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর থেকে এই আয়োজনের যাত্রা আমার শুরু করেছি। একবছর ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে। দু’দিনের তীর্থোৎসবের মধ্য দিয়ে আমরা এর সমাপনী করতে যাচ্ছি।’

পূর্ববঙ্গে খ্রিস্টবিশ্বাসীদের আগমনের ইতিহাস তুলে ধরে মজেস কস্তা জানান, ১৫১৮ সালে সাগরপথে পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে খ্রিস্টবিশ্বাসীরা চট্টগ্রামে প্রবেশ করেন। ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কোচিন রাজ্য থেকে প্রথম মিশনারীরা চট্টগ্রামে আসেন। পূর্ববঙ্গে আসা প্রথম মিশনারী, জেজুইট ধর্মসংঘের পুরোহিত ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ চট্টগ্রামের দিয়াং-এ পূর্ববঙ্গের প্রথম গির্জাঘর নির্মাণ করেন।

১৫৯৯ এবং ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রাম শহরের পাথরঘাটার বান্ডেল রোডে এবং জামালখানে আরও দুইটি গির্জাঘর নির্মাণ করেন। এসময় খ্রিস্টবিশ্বাসীরা চট্টগ্রামের পাশাপাশি আসাম, মিজোরাম, মিয়ানমারের কিছু অংশে এবং ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, সিলেটে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্ম প্রচলনের অপরাধে আরাকান রাজার নির্দেশে সৈন্যরা ফাদার ফার্নান্দেজকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এসময় তার চোখ উপড়ে ফেলা হয়। দিয়াং-এ ৬০০ খ্রিস্টবিশ্বাসীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

মজেস কস্তা বলেন, ‘রক্তের বিনিময়ে রক্ত নয়, সেসময়ের মিশনারীরা মানবতা ও সেবাকে উর্দ্ধে তুলে ধরেন। খ্রিস্টবিশ্বাসীদের আগমণের প্রায় ৮০ বছর পর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম চালু হয়, যা এখনও অব্যাহত আছে।’

চট্টগ্রাম আর্চডায়োসিস বর্তমানে ১৬টি স্কুল, ১২৫টি গ্রামীণ প্রাইমারি স্কুল, ১৭টি শিক্ষা ছাত্রাবাস এবং ১৩টি চিকিৎসালয় পরিচালনা করছে। পুরো বাংলাদেশে চার্চ প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৭৪টি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৩৫ হাজার ৭১১ জন বলে তিনি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৮টি ডায়োসিস বা ধর্মপ্রদেশ এবং ২টি আর্চডায়োসিস বা মেট্রোপলিটন ধর্মপ্রদেশ আছে। বাংলাদেশের ৯টি প্রশাসনিক জেলা নিয়ে চট্টগ্রাম আর্চডায়োসিস গঠিত। এগুলো হচ্ছে- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং চাঁদপুর।

চট্টগ্রামে খ্রিস্টভক্ত আছেন ৩৩ হাজার। সারাদেশে খ্রিস্টবিশ্বাসী আছেন ৩ লাখ ৮০ হাজার।

সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম আর্চডায়োসিসের ভিকার জেনারেল ফাদার গর্ডেন ডায়েস, জুডিশিয়াল ভিকার ফাদার লেনার্ড রিবারু এবং ঢাকার মেজর সেমিনারির অধ্যাপক ফাদার টেরেন্স রড্রিক্সও উপস্থিত ছিলেন।