চট্টগ্রাম, ১২ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯

বিএনপির বড় ভুল জামায়াতকে সঙ্গে রাখা, ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রকাশ: ২ জানুয়ারি, ২০১৯ ৯:৩৮ : অপরাহ্ণ

বিএনপিপন্থী বলে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ভিসি ও একজন অধ্যাপক বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি যাতে আর না থাকে। বিএনপি সবচেয়ে বড় ভুল করেছে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা। দলটির নেতা-কর্মীরা মনে করেন, রাজনৈতিকভাবেই বিএনপি’র কৌশলে ভুল ছিল।

ঐক্যফ্রন্টে থাকা নিয়েও বিএনপিতে এখন ধোঁয়াশা পরিস্থিতি। এরপরও হতাশা থেকে বের হবার উপায় খুঁজছে দলটি৷ ‘ভুল’ শোধরাতে চায় বিএনপি।

জামায়াত বিষয়ে বিএনপিকে আলোচনা করার তাগিদ দিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দিন আহমেদ৷ তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত যেন না থাকে, বছর দুই আগে আমিই বলেছিলাম৷ দে হ্যাভ নো রাইট টু স্টে উইথ আস৷”

তবে জামায়াতের তরুণ প্রজন্মের কোনো দোষ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি৷ এসব বিষয়ে বসে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি৷

‘‘আমি চাই যে, ওরা মিটিংয়ে বসুক৷ একাধিকবার বসুক৷ নির্বাচনের সময়ে যে দুর্বলতা প্রকাশিত হয়েছে, তা আলোচনা করুক৷ উত্তরণ ঘটানোর উপায় বের করুক,” বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য৷

তিনি যোগ করেন,‘‘জামায়াত সম্পর্কে এখনো তেমন কোনো বিষয় থাকে, লেট দেম টেক ডিসিশন৷ জামায়াতের জন্য বিএনপি এত বড় একটা দল, ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না৷”

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদুজ্জামান বলেন, ‘‘বিএনপি আমার মতে সবচেয়ে বড় ভুল করেছে জামায়াতের সঙ্গে জোট করে৷ অন্যদের সুযোগ করে দিয়েছে৷”

নেতা-কর্মীদের হতাশা

৪০ বছর বয়সী দেবাশীষ থাকেন রাজধানীর মালিবাগ এলাকায়৷ মৌচাক মোড়ের একটি চায়ের দোকানেই তার আড্ডা৷ বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের কাপে প্রায়ই ঝড় তোলেন দেশের রাজনীতি নিয়ে তর্কাতর্কি করে৷ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির ভবিষ্যৎ খুব একটা উজ্জ্বল দেখছেন না দেবাশীষ৷ ‘‘বিএনপির ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো বলে মনে হচ্ছে না”, বলেন তিনি৷

বিএনপির নেতা-কর্মীদের হতাশ হবার কারণ আছে বলে মনে করেন দেবাশীষ৷ ‘‘এরই মধ্যে ১২ বছর তারা ক্ষমতায় নেই৷ তার সঙ্গে যোগ হলো আরো পাঁচ বছর৷ একটা প্রজন্ম তো ধানের শীষ প্রতীকই চিনবে না,” সরল হিসাব দিলেন এই মিডিয়াকর্মী৷

দেবাশীষের এই শঙ্কাকে অযৌক্তিক না বললেও, পুরো আশাহত নন বিএনপি কর্মী নাসির উদ্দিন৷ তিনি বসেছিলেন বিএনপির পল্টন অফিসের নিচে বহু পুরোনো ছবি বাঁধাইয়ের একটি দোকানে৷ দোকানটিতে বাঁধাই করা ছবিগুলোর মধ্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও দণ্ডপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছবিই বেশি৷

‘‘মাঠে সক্রিয় না হলেও ফেসবুকে তো দেখি, আমাদের নেতা-কর্মীদের মনোবল এখনো শক্ত,” বলেন তিনি৷

নাসির যোগ করেন, ‘‘রাজনীতি এক-দুই দিনের না৷ রাজনীতি লম্বা সময়ের৷ অনেক সময় দেখা যায়, বিশ বছরও ক্ষমতায় আছে কোনো সরকার৷ তারপরও হতাশ হয়নি বলেই অন্য দল টিকে থাকে৷ আওয়ামী লীগও ২১ বছর ক্ষমতায় ছিল না৷ তারা তো ‘অফ’ হয়ে যায়নি৷”

তবে নাসিরের সঙ্গে পুরোপুরি সুর মেলাতে পারছেন না নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির পরিবহণ শ্রমিক দলের নেতা জাহাঙ্গীর আলম৷ ‘‘মাঠ পর্যায়ে নেতা-কর্মীরা কিছুটা হলেও ভেঙে পড়েছে,” বলেন জাহাঙ্গীর৷ ‘‘কারণ, আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি৷ বিএনপির মতো এত বড় দল পেয়েছে মাত্র ৫/৭টা জয়৷ এটি নেতা-কর্মীদের হতাশ করেছে৷”

ব্যর্থ কৌশল

রাজনীতির মাঠে আলোচনা– বিএনপি কেন ব্যর্থ হলো? তাদের নেতাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সরকার তাদের অবস্থা দুর্বল করেছে৷ কিন্তু বিএনপির নীতিনির্ধারণেও দুর্বলতা ছিল বলে মনে করেন জাহাঙ্গীর আলম৷

তিনি বলেন, ‘‘আমরা যারা জেলা পর্যায়ে আছি, থানা, ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মী আছি, তাদের কথা হলো, যাদের এবার নমিনেশন দেয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই এবার নতুন মুখ৷ অথবা দলের বাইরের৷ আমি মনে করি এটা নির্বাচনের জন্য খারাপ দিক৷”

তিনি মনে করেন, নির্বাচনে বিএনপি’র নেতৃত্ব ছিল ঐক্যফ্রন্টের হাতে, যার ‘অপব্যবহার’ হয়েছে৷ ‘‘নেতৃত্ব পুরোপুরি ঐক্যফ্রন্টের হাতেই ছিল৷ এখানে কিছুটা অপব্যবহার হয়েছে কিনা তা আমি জানি না, তবে আমার ধারণা, হয়েছে,” বলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিবহণ শ্রমিক দলের এই যুগ্ম সম্পাদক৷

কেমন অপব্যবহার? প্রশ্ন করা হলে জাহাঙ্গীর বলেন, মাঠ পর্যায়কে দুর্বল করে রাখা হয়েছে৷ ‘‘অপব্যবহার হয়েছে নমিনেশনের ব্যাপারে৷ যেমন, আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ এর-ব্যাপারে বলতে পারি৷ মুফতি মনির হোসেন কাসেম নামে একজনকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে৷ তিনি আদৌ নির্বাচনের মাঠেই ছিলেন না৷ নির্বাচনে তিনি ৬৭ হাজারের মতো ভোট পেয়েছেন৷ সেখানে তিন তিন বার নির্বাচিত শামীম ওসমান ভোট পেয়েছেন প্রায় চার লাখের কাছাকাছি৷ উনি (কাশেম) প্রচার-প্রচারণা না করেও যে ভোট পেয়েছেন… তিনি আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো নেতা-কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি৷”

কৌশল ব্যর্থ হয়েছে এমনটি মনে করেন, বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও৷ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের পুরোনো সব কৌশল ব্যর্থ হয়েছে৷ এটাই বাস্তবতা৷ সেই নতুন চিন্তার মধ্যে এই প্রজন্মকে গুরুত্ব দিতে হবে৷ নেতা-কর্মীদের চেয়েও তাদের মতামত বেশি গুরুত্ব দিতে হবে৷ এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা তৈরি হবে৷”

ঐক্যফ্রন্টে থাকা নিয়ে ধোঁয়াশা

বিএনপির সাধারণ কর্মীরা ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে না চাইলেও, ঐক্যফ্রন্টে বিএনপির অবস্থান নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ দেখা গেছে কারো কারো মধ্যে৷ এমনকি এর ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছেন না বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতারাও৷

আলাল বলেন, ‘‘ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ এই মুহূর্তে বলা মুশকিল৷” তিনি যোগ করেন, ‘‘আমরা যারা একত্রিত হয়েছিলাম একটা পরিবর্তনের লক্ষ্যে, তা আপ্তবাক্য ছিল না, তা আমাদের ইশতেহারের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে৷ সেখানে আমরা কিছু গুণগত পরিবর্তনের কথা বলেছি৷ সেগুলোকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে৷”

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও কথা বললেন মোটা দাগে৷ ‘‘গণতন্ত্রের ঘাটতি, ফ্যাসিবাদের উত্থান, তা মোকাবেলা করার জন্য ঐক্য আরো বাড়তে থাকবে,” বলেন রিজভী৷ ‘‘মানুষের ঐক্য আরো বেশি দৃঢ় হবে, প্রসারিত হবে, এখন যে ঐক্য আছে, তার সঙ্গে হয়তো যোগ দেবে৷”

নেতৃত্বের সংকট?

সাধারণ নেতা-কর্মীরা একটা বিষয় স্পষ্ট করেই বললেন যে, বিএনপির পক্ষে নেতৃত্বের সংকট দেখা গেছে নির্বাচনে৷ হতাশা প্রকাশ করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘‘খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া আর কোনো ভালো সিদ্ধান্ত আসবে বলে মনে হচ্ছে না৷ তার শূন্যস্থানে দলের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷”

বিএনপির নেতৃত্বের সংকটের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আলাল এর জন্য দোষারোপ করেন সরকারি দলের নেতৃত্বকে৷ ‘‘প্রধানমন্ত্রীই অনেক পরিকল্পনা করে বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দি করে রেখেছেন,” অভিযোগ করেন বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব৷ ‘‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া যেমন সূর্যের আলো, বিএনপিতেও তিনি আলোদানকারী শক্তি৷ খালেদা জিয়াকে যখন আমাদের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো, তখনই আমি ব্যক্তিগতভাবে বুঝেছি যে, এই নির্বাচনটা আমাদেরকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে নিকৃষ্ট পর্যায়ে নিয়ে যাবে৷”

করণীয় নির্ধারণ করা হচ্ছে

নির্বাচনে এতটা ব্যাকফুটে চলে যাবার পর এখন বিএনপি’র নীতিনির্ধারণী পর্যায় বসেছে তাদের করণীয় ঠিক করতে৷ তবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেন রিজভী৷ ‘‘আমরা আগের অবস্থানেই আছি৷ আমরা যে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করছি, গণতন্ত্রকে হরণ করে ফ্যাসিবাদমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করছি৷ আমাদের লড়াই অব্যাহত আছে,” বলেন তিনি৷

তবে আলাল মনে করেন, কৌশল ব্যর্থ হবার কারণ বের করার জন্য বিস্তর গবেষণা করতে হবে বিএনপিকে৷ ‘‘বিএনপির বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে৷ এই পরিস্থিতি তৈরির প্রেক্ষাপট হলো কেন? স্বৈরাচারী সরকার আরো স্বৈরাচারী হবার সুযোগ পেলো কেন? সে জায়গায় আমাদের লুপহোল বা ঘাটতি বের করতে হবে,” বলেন আলাল৷

তিনি মনে করেন, সংগঠনের মধ্যে রাজনৈতিক চরিত্রের লোকদের কাজে লাগাতে হবে৷ ‘‘সংগঠনের মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক চরিত্রের লোকগুলোকে দিয়ে সংগঠনকে আবার পুনর্বিন্যাস করা, তারপর ধীরে ধীরে এগোতে হবে,” মনে করেন বিএনপির এই নেতা৷ তিনি যোগ করেন, ‘‘ছোট্ট একটা আলাদা প্লাটফর্ম করতে হবে দলের মধ্যেই৷ তারা এসব নিযেই কাজ করবে৷ তারা বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দেবে৷ নীতিনির্ধারণী পর্যায় যদি সেটা গ্রহণ করে তো ভালো, না হলে কোনো পরিবর্তন আমি দেখছি না৷’- ডিডব্লিউ