চট্টগ্রাম, ১২ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯

মঙ্গল গ্রহে ঘর-সংসার

প্রকাশ: ২ জানুয়ারি, ২০১৯ ১০:৫৪ : পূর্বাহ্ণ

ফজলুর রহমান

সাত মাস মহাকাশে ভ্রমণ করে নাসার যান ‘ইনসাইট’। অবশেষে ২৭ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করেছে । মঙ্গলে পৌঁছাতে ইনসাইটকে ৩০ কোটি ১২ লাখ ২৩ হাজার ৯৮১ মাইল অতিক্রম করতে হয়েছে। এসময় মহাকাশে এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬ হাজার ২০০ মাইল।

অবতরণ পরবর্তী একটি সংবাদ সম্মেলনে নাসার পরিচালক জিম ব্রাইডেনস্টাইন বলেন, ‘মানব ইতিহাসে অষ্টম বারের মতো মঙ্গলে সফলভাবে অবতরণ করেছি আমরা। মঙ্গল গ্রহের ভেতরকার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করবে ইনসাইট। এরপর সেসব তথ্য আমাদের জানাবে। কারণ, মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা।’

তবে কেবল নভোচারী প্রেরণ নয়, মানুষ নাকি নিকট ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে বসবাস শুরু করবে। এতে মঙ্গল গ্রহ হবে নাকি দ্বিতীয় পৃথিবী।

মঙ্গল কি রকম?
সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ হচ্ছে মঙ্গল গ্রহ। পৃথিবী থেকে অনেকটা লাল দেখানোর কারণে এর অপর নাম হচ্ছে লাল গ্রহ। এরও পৃথিবীর মত ভূ-ত্বক রয়েছে। ভূ-ত্বকে রয়েছে চাঁদের মত অসংখ্য খাদ, আর পৃথিবীর মত আগ্নেয়গিরি, মরুভূমি এবং মেরুদেশীয় বরফ। সৌর জগতের সর্ববৃহৎ পাহাড় এই গ্রহে অবস্থিত। সর্ববৃহৎ গভীর গিরিখাতটিও এই গ্রহে । মঙ্গলের ঘূর্ণন কাল এবং ঋতু পরিবর্তনও অনেকটা পৃথিবীর মত। মঙ্গলে আছে একটি বিরাট মরুভূমি, নেই পর্যাপ্ত পানির সোর্স। এর মেরু এলাকায় কিছু পানির বরফ রয়েছে। মঙ্গলের বায়ুমন্ডল অনেক পাতলা, তাই এতে গরম ধরে রাখার মতো ক্ষমতা নেই। সম্পূর্ণ ফ্রিজিং কোল্ড পরিবেশ। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। গড় তাপমাত্রা -৫৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস । এর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা -১৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বায়ুমন্ডলে অক্সিজেনের বিরাট কমতি রয়েছে।

বায়ুমন্ডলের কেবল ০.১৪% অক্সিজেন রয়েছে, যেখানে পৃথিবীতে ২১% অক্সিজেন রয়েছে। মঙ্গলে স্পেশাল স্পেস স্যুট পরিধান করে বসবাস করার পরেও রেডিয়েশন থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক অংশে বেড়ে যাবে। বলা হয়ে থাকে, মঙ্গলে মাত্র কয়েকদিন কাটানো আর কোন নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে ১০ বছরের বেশি সময় কাটানোর সমান রেডিয়েশনে আক্রান্ত হতে পারে।

পৃথিবীর মহাকর্ষের তুলনায় মঙ্গলের মহাকর্ষ তিনভাগের একভাগ। পৃথিবীতে যে পরিমাণ সূর্যের আলো আসে, মঙ্গলে যায় তার অর্ধেক। কিন্তু পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মি এবং তেজস্ক্রিয়তা আসে। শুধু তাই নয়, মঙ্গলের মাটি পৃথিবীর মাটির মতো নয়। মঙ্গলের মাটিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে পারক্লোরেট রাসায়নিক যা, মানুষের জন্য বিষাক্ত। সেখানে তরল পানিও নেই। বেশিরভাগই বরফ। সেখানে বায়ুমন্ডলের চাপ কম বলে ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেই পানি ফুটে যায়।
প্রায়ই ধুলোময় এবং দূরবর্তী অঞ্চলের এই মঙ্গল গ্রহ। এটি ইতিমধ্যেই মানুষের বসবাসের পরবর্তী গ্রহ হিসেবে চিহ্নিত। তবে মঙ্গল গ্রহের এখন যে পরিবেশ তা বসবাসের উপযোগী নয়। পৃথিবীর সাথে মঙ্গল গ্রহের যোগাযোগের সময়ের ব্যবধান ২০ মিনিট। পৃথিবী থেকে তিন কোটি ৪০ লাখ মাইল দূরে লাল রঙের এই গ্রহটিতে সর্বোচ্চ গতির নভোযানে করে পৌঁছাতে কমপক্ষে সাত মাস সময় লাগে। এখানে স্পেসস্যুট বা মহাকাশযাত্রায় ব্যবহারের উপযোগী বিশেষ ধরনের পোশাক ছাড়া বাঁচা যায় না। বিষাক্ত মার্টিন বায়ুমন্ডল শেষ করে দিবে। মঙ্গল গ্রহের বায়ু মন্ডল এর ৯৬ ভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড, তাই একজন মানুষ যখন মঙ্গলে পা রাখবেন তখন তাকে সবসময় স্যুট পরিধান করতে হবে, অন্যথায় সে অক্সিজেন এর অভাবে মারা যাবে। এছাড়াও পৃথিবীতে কোনও বাক্তির ওজন ৪৫ কেজি হলে মঙ্গলে তার ওজন হবে ১৭ কেজি।

মঙ্গলে কতদিন বাঁচবে মানুষ?
মার্কিন গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, মঙ্গল গ্রহের প্রতিকূল পরিবেশ ও সেখানে তৈরি করা অবকাঠামো বিবেচনায় নিলেও মাত্র ৬৮ দিন পর থেকেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পড়তে হবে মানুষকে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির-এর পাঁচজন গবেষক নেদারল্যান্ডসের মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মার্স ওয়ান গৃহীত একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে দেখেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, মঙ্গল গ্রহে যে আবাসস্থল গড়ে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে, তাতে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে একপর্যায়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করতে আরও নতুন নতুন প্রযুক্তির দরকার হবে।

মঙ্গলযাত্রা
‘নাসা’ এবং ‘স্পেসেক্স’ এই দুইটি সংস্থা মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার যান তৈরিতে কাজ করছে। নাসা তাদের নতুন বাজেটে দেখায়, তারা ২৫ বছরের মধ্যে কয়েকজন মহাকাশচারীদের নিয়ে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাবে। স্পেস এক্সের মালিক ইরন মার্ক্স বলেন, তারা এমন একটি স্পেস মঙ্গল গ্রহে পাঠাতে চলেছেন যেখানে ১০০ জন মানুষ থাকবে। এই যানটি ২০২৫ থেকে ২০২৯ এর মধ্যেই নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এর ফলে ২০৩০ এই মানুষ মঙ্গল গ্রহে যেতে সক্ষম হবে আর শুধু মানুষ সেখানে যাবেই না তারা সেখানে বসবাসও শুরু করবে। লাখ লাখ মানুষের আতœনির্ভর কলোনি তৈরির কাজও শুরু করবে তারা।

স্পেস এক্সের মালিক আরো জানান, একটি রকেটে পৃথিবী থেকে মহাকাশে একটি পুরো স্পেস শিপকে পাঠানো হবে। মহাকাশে পৌঁছানোর পরে এই রকেট বুস্টারটি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে। অর্থাৎ রকেট বুস্টারটি যে স্থান থেকে লঞ্চ করা হবে সেই স্থানেই ফিরে আসবে এবং সে রকেট বুস্টারে একটি বড় মাপের ফুয়েল ট্যাঙ্ক যুক্ত করে দেয়া হবে। তারপরে রকেট বুস্টারটি আবারো মহাকাশে যাত্রা করবে এবং ফুয়েল ট্যাঙ্কটি স্পেস শিপটির সাথে যুক্ত করে দিবে। যার ফলে পর্যাপ্ত ইন্ধন স্পেস শিপে পৌঁছে যাবে এবং চার মাসের মধ্যেই স্পেস শিপটি মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাবে।

এই স্পেস শিপটিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা সম্ভব এর ফলে এটিকে বারবার ব্যবহার করা সম্ভব। তাই এই স্পেস শিপটি মঙ্গল গ্রহে আসা যাওয়ার কাজে বারবার ব্যবহার করা যাবে। পর্যাপ্ত জ্বালানির কারণে এই স্পেস শিপটি ১০০ জন মানুষ এবং তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস বহন করতে পারবে। এটি সফল হলে ২০৩০ সালে মানুষ মঙ্গল গ্রহে যাচ্ছে!

মঙ্গলকে কিভাবে বসবাসের উপযোগী হবে?
মঙ্গলে বসতি বানাতে অনেক সমস্যার সমাধান করতে হবে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পানি এবং অক্সিজেনের প্রয়োজন অপরিহার্য। তবে মঙ্গল গ্রহে যথেষ্ট পানি রয়েছে। মঙ্গল গ্রহের নর্থ ও সাউথ পুলে বরফ জমে রয়েছে। অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহের একদম ওপরে এবং একদম নিচের মাঝখানের অংশে বরফ জমে রয়েছে। যা গলিয়ে মানুষের প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাবে। তাছাড়াও বিজ্ঞানীদের ধারণা মঙ্গল গ্রহের মাটির নিচেও প্রয়োজনীয় পানি রয়েছে। ঠিক এই কারণেই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বিকল্প হিসেবে মঙ্গল গ্রহকে বসবাসের স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে।

গবেষকদের মতে, মঙ্গলকে বাস উপযোগী বানাতে চারটি বিশেষ পরিবর্তন আনতে হবে, প্রথমত, এর তাপমাত্রা বাড়াতে হবে, যাতে ঠান্ডয় জমে না যায়। দ্বিতীয়ত, বায়ুমন্ডলের চাপ বাড়াতে হবে, যাতে লিকুইড পানি সেখানে ধরে রাখা যায়। তৃতীয়ত, বায়ু পরিস্কার করতে হবে এবং অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে হবে, যাতে খোলা বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া সম্ভব হয় এবং চতুর্থত, ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করতে হবে যাতে সোলার রেডিয়েশন বা ডীপ স্পেস রেডিয়েশন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

মঙ্গল গ্রহের জলবায়ু মোটেও পৃথিবীর জলবায়ুর মত না। মঙ্গল গ্রহের বায়ুমন্ডল খুবই পাতলা হওয়ার কারণে সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে শুরু করে উল্কাপিন্ড খুব সহজেই মঙ্গল গ্রহে এসে পড়ে। বিজ্ঞানীরা এর প্রতিকারও বের করেছে। মানুষ মঙ্গল গ্রহের মাটির নিচে বসতি বানাবে। অথবা মঙ্গল গ্রহ থেকে পাওয়া আয়রন এবং সিলিকা দিয়ে ছাদের নির্মাণ করবে। যা ক্ষতিকারক রশ্মি ও বহিরাগত সমস্যা থেকে মুক্তি দিবে।

মানুষ আরো যে সমস্যাটির সম্মুখীন হবে তা হল মধ্যাকর্ষণ। মঙ্গল গ্রহের মধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর তুলনায় বাষট্টি শতাংশ কম। যদি কোন মহাকাশচারী মহাকাশে থাকে থাকে তবে প্রতি মাসে তার দুই শতাংশ হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। তাহলে সেই মতে মঙ্গল গ্রহে মানুষ থাকলে তাদের হাড় সব ভেঙ্গে তারা পঙ্গু হয়ে বসে থাকবে। বিজ্ঞানীরা এরও একটি সমাধান বের করেছে। যদি মঙ্গলের সব বাড়ি ঘরকে অনবরত ঘোরানো যায় তবে গ্রাভিটির মতই অনিভুতির সৃষ্টি হবে আর এইটা করা সেন্টিফিউজ এর সাহায্যেই সম্ভব হবে। অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহে হয়ত বিজ্ঞানীরা সেন্টিফিউজ সিটি তৈরি করবে। তবে সেন্টিফিউজ সিটি থেকে মানুষ ওপরে তাকালে দেখবে আকাশ ঘুরছে আর এর ফলে মানুষের অনেক সমস্যার তৈরি হবে যেমন তারা বমি করা শুরু করবে। এই কারণেই সিটির ওপরে তৈরি হবে ছাদ এবং তার ফলে আকাশ ঘুরছে এটা আর দেখা যাবে না।

এসব সমস্যা ছাড়াও মানুষের খাবারের সমস্যা আসবে। পানি ও অক্সিজেন থাকার পরেও মানুষের খাদ্য তৈরির জন্য প্রয়োজন হবে সূর্যের আলোর। আর এই আলো পাওয়ার জন্য মানুষকে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে। কারণ তাপমাত্রার বড় হেরফের। এক্ষেত্রে মানুষকে গরমের সময় সোলার প্যানেল এর সাহায্যে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে রাখতে হবে এবং শীতকালে কৃত্রিম আলো দিয়ে ফুল ও ফলকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

বিজ্ঞানীরা কল্পনা করেন, পূর্বে মিলিয়ন বছর আগে কোন এক সময় মঙ্গলের তাপমাত্রা স্বাভাবিক ছিল, মানে মানুষের বসবাসের উপযোগী, কিন্তু কোন এক কারণে মঙ্গলের বায়ুমন্ডল নষ্ট হয়ে যায় এবং যেহেতু বায়ুমন্ডল অনেক পাতলা তাই গ্রিন হাউজ ইফেক্ট হয় না, ফলে এর তাপমাত্রা ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে।

মঙ্গল গ্রহে বোমাবর্ষণ করলে তা বসবাসের উপযোগী!
গবেষকদের মতে, টেকনোলজির ব্যাবহারে মঙ্গল গ্রহ বসবাস এর উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। তাঁদের মতে, মঙ্গল গ্রহের মেরু অঞ্চলে এই বোমাবর্ষণ গ্রহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিবে। এটি ধীরে ধীরে অর্জন করা সম্ভব যদি সেখানে গ্রীন হাউজ গ্যাস ছাড়া হয় বা নিউ ক্লিয়ার বোমাবর্ষণ করা হয়। ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ শক্তি নিউ ক্লিয়ার বোমাবর্ষণ এর ফলে নির্গত হয় যা খুব তাড়াতাড়ি গ্রহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিবে।
নাসা জানিয়েছে, মহাকাশে বিশেষ করে সৌর জগতে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমরাও বিশ্বাসী। তবে পরমাণু বোমার নিজস্ব কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। পেনসিলভেনিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ডিরেক্টর মাইকেল মন বলেন, পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ করলে তার নিজস্ব সমস্যা তৈরি হতে পারে। মঙ্গলের আবহাওয়া গরম হওয়ার বদলে ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে। কারণ বিস্ফোরণের পরে সেখানকার আকাশ ধুলো ও ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। ফলে সূর্যের আলো মাটি পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। সেজন্য গরম হওয়ার চেয়ে আরও বেশি ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে লাল গ্রহ। যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’।

মঙ্গল গ্রহের অনুশীলন পৃথিবীর বুকে
মঙ্গল গ্রহে বসবাসের অনুশীলনে একদল অভিযাত্রী জনমানবশূন্য পরিবেশে এক বছর কাটিয়েছেন। ছয় জনের এই দলটি হাওয়াই দ্বীপে বিশেষভাবে তৈরি এক গবেষণাগারে ২৯শে অগাষ্ট, ২০১৫ থেকে বসবাস করতে থাকেন।এই পুরো একটি বছর তারা মুক্ত বাতাস, তাজা খাবার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা উপভোগ করতে পারেননি।মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার অর্থায়নে এই পরীক্ষামূলক গবেষণার সমন্বয় করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণায় অংশ নেয়া ছয় জনের মধ্যে ছিলেন একজন ফরাসি অ্যাস্ট্রো-বায়োালজিস্ট, জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী এবং চারজন আমেরিকান, একজন পাইলট, একজন আর্কিটেক্ট, একজন সাংবাদিক এবং একজন মৃত্তিকাবিজ্ঞানী।

এই পুরো বছর ধরে এই দলটিকে বেঁচে থাকতে হয়েছে সীমিত সম্পদের ওপর। তারা বসবাস করতো বিশেষভাবে তৈরি একটি ডোমের মধ্যে। বাইরে যেতে হলে স্পেস স্যুট পরে যেতে হতো। তাদের বিছানা ছিল ছোট। খাবারের মধ্যে ছিল পনীরের গুড়ো এবং টিনে ভরা টুনা মাছ।

ফ্রান্সের অ্যাস্ট্রো-বায়োালজিস্ট সিপেরিয়ে ভার্সো বলছেন, এই অভিজ্ঞতার পর মনে হয়েছে, মঙ্গলগ্রহের মানুষের অভিযানের সম্ভাবনা এখন অনেক উজ্জ্বল। এই কাজে যেসব কারিগরি বা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা তৈরি হয় সেটাও দূর করা যাবে বলে আমার মনে হয়।

মঙ্গল গ্রহের খাবার
মঙ্গল গ্রহে পৃথিবীর মতোই হরেক রকমের খাবার পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে যদি মঙ্গলগ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন সম্ভব হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে সেখানেই খাবার উৎপাদনের কোনো ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ পৃথিবী থেকে বারবার রকেটের মাধ্যমে সেখানে খাবার পাঠানোটা অতিরিক্ত খরচের ব্যাপার।ঙ্গল গ্রহে পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। এই পানি ব্যবহার করেই কৃষিকাজ করা হতে পারে। কিন্তু খাবার উৎপাদনে পানি ছাড়াও আরও অনেক উপাদান দরকার হয়।

কিছু গবেষণায় বলা হয়, প্রাথমিকভাবে জীবাণু থেকে তৈরি করা হতে পারে খাবার। অল্প এলাকায় পানির ওপর চাষ করা সবজির গ্রিনহাউজ এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ ব্যবহার করা হতে পারে। যে পদ্ধতিতে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে সবজি চাষের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, সেই পদ্ধতিই মঙ্গলেও ব্যবহার করা হতে পারে।

প্রচন্ড ঠান্ডা, অন্ধকার আর বিরূপ এই আবহাওয়ায় মানুষের পাশাপাশি পৃথিবীর গাছপালারও টিকে থাকতে সমস্যা হবে। পৃথিবীতে লাখ লাখ বছর ধরে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে গাছপালা। সেগুলোকে মঙ্গলে পাঠানো হলে তাদের বাঁচা কঠিন হয়ে পড়বে। গবেষকরা আশা করছেন, মঙ্গলে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন বিশেষ গাছ তারা তৈরি করতে পারেন সিন্থেটিক বায়োলজি পদ্ধতি ব্যবহার করে। জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্যে আগামী দশকের মাধ্যমেই এমন গাছপালা তৈরি হতে পারে। কম তাপমাত্রায় এবং কম সূর্যালোকে বেঁচে থাকতে হবে তাদেরকে। এছাড়া মঙ্গলের মাটি বিষমুক্ত করতে জীবাণুও কাজে লাগাতে হবে।

মঙ্গল গ্রহে অক্সিজেন চাষ:
গবেষকেরা বলছেন, চার থেকে ছয় বছরের মধ্যেই মঙ্গলে তৈরি হবে অক্সিজেন। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার গবেষকেরা এমন একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন। তাঁরা মঙ্গলের বুকে রোবোটিকস মিশন পরিচালনা করবেন। ২০২০ সালে মঙ্গলে রোবটের সাহায্যে অক্সিজেন তৈরির কাজ শুরু করতে চান তাঁরা।

পৃথিবীর বাইরে কোথাও সেখানকার সহজলভ্য উপাদান কাজে লাগিয়ে জীবন ধারণের উপযোগী পানি ও অক্সিজেন তৈরির এটা প্রথম প্রকল্প। তাঁরা এই গবেষণা প্রকল্পের নাম দিয়েছেন ‘ইন-সিচু রিসোর্স ইউটিলাইজেশন বা ইসরু। গবেষকেরা জানিয়েছেন, ইসরুর উদ্দেশ্য হচ্ছে মহাকাশ অভিযানের সময় যাতে খরচ, পরিশ্রম ও ওজন কমানো যায়, তার জন্য সেখানকার উপাদান কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা তৈরি করে নেওয়া। এ ধরনের উদ্যোগের ফলে অদূর ভবিষ্যতে মহাকাশ যাত্রায় সুফল পাবেন নভোচারীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের হাউসটনের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ইনস্টিটিউটের গবেষক পল স্পুডিস বলেছেন, পৃথিবী থেকে পানি, বাতাস এবং অন্যান্য উপকরণ বয়ে নেওয়া মানে অতিরিক্ত ভার বহন করা। এসব উপাদানের বদলে যদি বাড়তি কম্পিউটার কিংবা অন্যান্য গবেষণার উপাদান পাঠানো সম্ভব হয়, তবে মিশন বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই গবেষণার প্রয়োজনীয় উপকরণ বেশি করে পাঠানোর জন্য ইসরুর মতো প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা এমন রোবট পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন, যা সেখানকার পৃষ্ঠে গর্ত করবে এবং পানি তৈরির প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে তাতে তাপ দেবে। তাপের ফলে যে বাষ্প তৈরি হবে তা শীতলীকরণ করে তৈরি হবে পানের উপযোগী পানি। ২০২০ সালে মঙ্গলে পরিচালিত হবে এ ধরনের একটি রোবোটিকস মিশন। মঙ্গলের বায়ুমন্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করে তা বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেনে রূপান্তর করবে এই মিশনে পাঠানো একটি যন্ত্র।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকার সত্ত্বেও যদি গ্রহটিকে উষ্ণ করা হয় তবে তা বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠবে। আসলে সবকিছুই সম্ভব বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আওতায়। সময় সব জবাব দিচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে আমরা সময়ের সাথে কেবল তাল মিলিয়ে যাচ্ছি।
লেখক:

লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।