চট্টগ্রাম, , শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

উড়াল দিচ্ছে অক্সিজেন

প্রকাশ: ২০১৮-১২-১২ ১১:১৭:০১ || আপডেট: ২০১৮-১২-১২ ১৫:৪০:৫০

ফজলুর রহমান

কার্টিস বাউট নামের এক কানাডীয় তরুণ। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া এলাকায় নিজের ভাইয়ের বাগানে বানালেন একটা তাঁবু। তিন মিটার বাই তিন মিটার সাইজের তাঁবু। ওই তাঁবুটা আবার একেবারে বায়ুরোধক। ভেতরে বেশকিছু গাছপালা। সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবারদাবার। কার্টিস শুধু দেখতে চেয়েছিলেন ওই তাঁবুতে তিনি কয়দিন টিকতে পারেন। তাঁর নিঃশ্বাসে বের হওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডটাকে আদৌ অক্সিজেন বানাতে পারছে কি না গাছগুলো।


তবে তিন দিন তো দূরে থাক, ১৫ ঘণ্টাও টিকতে পারলেন না কার্টিস। তার আগেই অক্সিজেনের অভাবে অল্পের জন্য মরার হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। আসলে তাঁবু খাটালেও গাছের অক্সিজেন তৈরির জন্য যে পরিমাণ সূর্যালোক ও বাতাসের অন্যান্য উপাদানের প্রয়োজন ছিল। আর সেসব মিলছিল না তাঁবুর ভেতর। কার্টিস অবশ্য অন্য একটি দিকে নিজেকে সফল বলে দাবি করছেন। তাঁর মতে, তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কী করে গ্রিনহাউস দূষণের কারণে পৃথিবীর অক্সিজেনের মাত্রা কমে আসতে পারে, বেড়ে যেতে পারে তাপমাত্রা।


অক্সিজেন বা অম্লজান একটি রাসায়নিক মৌল। সম্প্রতি অক্সিজেন নিয়ে একটি গবেষণায় ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে । গবেষণা মতে, দ্রুত পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে আমাদের শ্বাসের বাতাস অক্সিজেন। যাচ্ছে মহাকাশে। কিন্তু অক্সিজেন উধাও হওয়ার হার এত দ্রুত যে রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীরা।


নাসার বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেন, ধারণা অনুযায়ী পৃথিবীর বায়ুমন্ডল উত্তরোত্তর পাতলা হয়ে এলেও, বাতাসের অক্সিজেন প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুত হারে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে মহাকাশে। অথচ সেই হারে কমছে না গাছপালাদের সালোকসংশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইড। অক্সিজেনের মতো অত দ্রুত হারে পৃথিবীতে কমে যাচ্ছে না বাতাসের নাইট্রোজেন ও মিথেন। যা বেঁচে থাকার জন্য খুব কাজে লাগে অণুজীবদের। বিজ্ঞানীদের অনুমান, বহু কোটি বছর আগে এমন দশাই হয়েছিল আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ‘লালগ্রহ’ মঙ্গলের।


উদ্বেগ বাড়ছে বলেই ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে বিজ্ঞানীদের, কেন প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত হারে উধাও হয়ে যাচ্ছে শ্বাসের বাতাস, এর কারণ জানতে। সেই লক্ষ্যেই নরওয়ের উত্তর উপকূল থেকে পাঠানো হয়েছে ‘ভিশন্স-২’ সাউন্ডিং রকেট। তবে শুধু রকেট ছুড়েই কাজ শেষ করেননি বিজ্ঞানীরা, মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে নাসার গর্ডার্ড স্পেস সেন্টারের একদল গবেষকও পৌঁছে গেছে নরওয়ের উত্তর উপকূলে। কিভাবে বাতাসের অক্সিজেন, আমাদের শ্বাসের বাতাস মহাকাশে দ্রুত উধাও হয়ে যাচ্ছে, এর ওপর নজর রাখতে।


গবেষকদলের সদস্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাটমস্ফেরিক সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিমাদ্রি সেনগুপ্ত ভারতের দৈনিক আনন্দবাজার-কে এ সম্পর্কে বলেন, ‘অরোরা বোরিয়ালিসের সৌন্দর্য দেখতে আসিনি আমরা। পৃথিবীর বায়ুমন্ডল পাতলা হয়ে যাওয়া, শ্বাসের বাতাস অক্সিজেনের মহাকাশে দ্রুত চলে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা আছে অরোরা বোরিয়ালিসের। আমরা সেটাই দেখতে এসেছি।’
পৃথিবীর বায়ুমন্ডল যে উত্তরোত্তর পাতলা হয়ে আসবে এমন সম্ভাবনার কথা ১৯০৪ সালেই বলেছিলেন জেমস জিনস। তাঁর ‘দ্য ডাইনামিক্যাল থিয়োরি অফ গ্যাসেস’ তাত্ত্বিক ভাবে জানিয়েছিল, পৃথিবীর বায়ুমন্ডল এক দিন আমাদের ছেড়ে মহাকাশে হারিয়ে যাবে। সেই দিন পৃথিবীর আর কোনও বায়ুমন্ডল থাকবে না। ফলে, বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান উপকরণটি আর পাবে না এই নীলাভ গ্রহের জীবজগৎ। তবে সেটা হতে সময় লাগবে আরও অন্তত ১০০ কোটি বছর।


কিন্তু নাসার বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বায়ুমন্ডলের উত্তরোত্তর পাতলা হয়ে যাওয়ার ঘটনাটা অত ধীরে ঘটছে না। নরওয়ের উত্তর উপকূলে নাসার ‘ভিশন্স-২’ মিশনের প্রধান বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ডগ রাউল্যান্ড আনন্দবাজারের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে ই-মেলে লিখেছেন, ‘প্রতি দিন পৃথিবীর কয়েকশো টন বায়ুমণ্ডল আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে মহাকাশে। তার ফলে, খুব দ্রুত হারে তার ওজন হারিয়ে ফেলছে আমাদের এই গ্রহ। পৃথিবী দ্রুত হালকা হয়ে যাচ্ছে।’


হিমাদ্রির কথায়, ‘অক্সিজেন পরমাণুর যে পরিমাণ শক্তি রয়েছে, তার অন্তত ১০০ গুণ শক্তি প্রয়োজন বাতাসের অক্সিজেনকে পুরোপুরি পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মহাকাশে চলে যেতে হলে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুত হারে পৃথিবী ছেড়ে চলে য়াচ্ছে অক্সিজেন। গত শতাব্দীর ছয় বা সাতের দশকেও অক্সিজেনের এই দ্রুত প্রস্থানের আঁচ মেলেনি। আমরা আরও অবাক হয়ে গিয়েছি, হাইড্রোজেন পরমাণু বা আয়নের চেয়ে অক্সিজেন পরমাণু বা আয়ন দ্রুত হারে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মহাকাশে চলে যাচ্ছে দেখে। এটা তো হওয়ার কথা নয়। কারণ, হাইড্রোজেন পরমাণুর চেয়ে ১৬ গুণ ভারী অক্সিজেন পরমাণু। তা হলে হালকা হাইড্রোজেন পরমাণুর চেয়ে কেন দ্রুত হারে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যাচ্ছে অক্সিজেন, এখনও তার কোনও গ্রহণযোগ্য কারণ খুঁজে পাইনি আমরা।’


আমরা নিশ্বাসের সময় বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করি এবং এ অক্সিজেন ফুসফুসে প্রবেশ করে ব্যাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোষের অভ্যন্তরস্থ রক্তের সংস্পর্শে আসে এবং রক্তের হিমোগ্লোবিনের সাথে বিক্রিয়া করে অক্সি-হিমোগ্লোবিন তৈরি করে যা বিভিন্ন ধমনী ও উপ-ধমনী দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশের জৈব কোষের সংস্পর্শে এসে দহন ক্রিয়া সংঘটিত করে। এ দহণ ক্রিয়ার ফলে দেহাভ্যন্তরে তাপ উপন্ন হয় এবং ঐ তাপ প্রাণী দেহের উষ্ণতা বজায় রাখে। শরীরে শক্তি উৎপন্ন করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন করে যা প্রশ্বাসের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। গাছপালা কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সাহায্যে নিজেদের খাদ্য তৈরি করে এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন ত্যাগ করে যা প্রাণীকূল শ্বাসের সাথে গ্রহণ করে।


সুতরাং, আমরা আছি একটা চক্রের মধ্যে। একটা অলিখিত বাউন্ডারি আমাদের মেনে চলতেই হবে। এতেই জীবন বাঁচবে, গ্রহটাও টিকবে। নয়তো জীবনচক্রটাই লন্ডভন্ড হবে। কারণ, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণই আশা।

লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।