চট্টগ্রাম, , শনিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৯

সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজবে ভোটের মাঠে শান্তিভঙ্গের শঙ্কা

প্রকাশ: ২০১৮-১২-১১ ২৩:৩১:৫১ || আপডেট: ২০১৮-১২-১১ ২৩:৩১:৫৮

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই স্যোশাল মিডিয়ার গুজবে ভোটের মাঠের শান্তিভঙ্গের শঙ্কা বাড়ছে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)-সহ সংশ্লিষ্ট মহল। তাদের আশঙ্কা—সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহারে নির্বাচনে সহিংসতা ঘটায়। নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্টের প্রধান কারণ ‘গুজব’ হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।

তাদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করাও এবারের নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব নিয়ন্ত্রণে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অন্তত তিন দফায় বৈঠক করেছে ইসি। একইসঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে ইসি প্রতিনিয়ত হালনাগাদ তথ্য নিচ্ছে। এরপরও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে না পেরেই ইসির একটি নিজস্ব টিম করে সোশ্যাল মিডিয়ার গতিবিধি মনিটর করছে। সবার সমন্বয়ে এই টিম সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন পোস্ট, স্টাট্যাস, ইউটিউব কনটেন্ট, অনলাইনভিত্তিক ওয়েবপোর্টাল ইন্টারনেটভিত্তিক যাবতীয় কর্মকাণ্ড মনিটর করবে কমিশন।

জানা গেছে, দেশে-বিদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার গুজবে নানা অঘটনের অভিজ্ঞতায় নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সব ধরনের সোশ্যাল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল ইসি। এজন্য তফসিল ঘোষণার বেশ আগেই বিটিআরসিসহ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করে অভিমত নেয়। তবে, ওই বৈঠকে অংশীজনের কাছ থেকে সামাজিক যোগোযোগমাধ্যম বন্ধের বিপক্ষে অভিমত আসে। তারা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কখনোই পুরোপুরি বন্ধ সম্ভব নয়। এছাড়া অংশীজনেরা জানান, সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করতে গেলে উল্টো প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে হিতে-বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যে কারণে অংশীজনের পরামর্শসহ সার্বিক বিবেচনায় কমিশন বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা নেয় ইসি।

দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর ঘটনার প্রেক্ষাপটেই মূলত কমিশনে উদ্বেগের কারণ বলে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তারা জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। অতীতের কিছু ঘটনার বর্ণনা করে কমিশন সচিবালয়ের আইটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ‘বাংলাদেশে বসে কেউ প্রপাগান্ডা ছড়ালে স্বল্প সময়ের মধ্যে তা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বিদেশে বসে কেউ গুজব ছড়ালে তা দমন করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা অনলাইনে সক্রিয়, তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে ইসি। যে কারণে অতীতে বিদেশে বসে যেসব আইডি দিয়ে সুযোগসন্ধানীরা নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে, সেই আইডিগুলোর দিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ওইসব ব্যক্তির পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করে দেশে বসবাসকারীদের পরিবারকে সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনের আগেও ফেসবুক ও সাইবার স্পেস ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর আশঙ্কা করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তাদের আশঙ্কা একটি চক্র অনলাইনে মিথ্যা তথ্য ও গুজব রটাতে পারে। এ বিষয়ে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে সাইবার অপরাধকে বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাইবার স্পেসে আপত্তিকর কিছু দেখলে মানুষ যেন সঙ্গে সঙ্গে তা পুলিশের নজরে আনে, সে জন্য জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো হচ্ছে।’

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ আরও কয়েকটি গ্রহণযোগ্য সোশ্যাল সাইট ব্যবহার করে থাকে। এর বাইরে ইন্টারনেটভিত্তিক নিউজ সাইট থেকেই তথ্য ও খবর আদান-প্রদান হয়। এক্ষেত্রে এসব স্যোশাল মিডিয়ার মধ্যে যেগুলো ফেক, সেগুলো থেকেই গুজবের আশঙ্কা বেশি। এছাড়া যেসব অনলাইন নিউজ পোর্টাল অনেকটা নামসর্বস্ব ও ঠিকানাবিহীন, সেগুলো থেকেই গুজব ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।’

প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছরে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল রামুর বৌদ্ধবসতি এলাকায় তাণ্ডবের ঘটনা। তখন বেশ কিছু বৌদ্ধমন্দির ও বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। লুটপাট করা হয়েছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ফেসবুকের গুজবের সূত্র ধরে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এর আগে, ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে।

গুজবের সর্বশেষ বড় উদাহরণ ছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়। ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন পোস্টে গুজব ছড়ানো হয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও ছাত্রী ধর্ষণের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রেনিউর ল্যাব-এর প্রধান নির্বাহী আরিফ নিজামী বলেন, ‘ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে নির্বাচন নিয়ে অনেক অ্যাক্টিভিটি দেখা যাচ্ছে। দলগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে নানা নামে পেজ তৈরি হয়েছে। সরকার, নির্বাচন কমিশনকেও বেশ তৎপর দেখা যাচ্ছে। তবে নির্বাচনের আগে ও পরপর আরও বেশি প্রপাগান্ডা বা উসকানিমূলক পোস্ট আসতে পারে। যেটা নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট হতে পারে। প্রপাগান্ডা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনের দিন ফেসবুক বন্ধ করার ঘোষণা আসতে পারে বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। বেসরকারি উদ্যোগে নিজের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচনে ফেক নিউজ ও ডিজিটাল প্রপাগান্ডা বন্ধে কিছু কাজ করছেন বলেও জানান এই প্রযুক্তিবিদ।

ইসির সিস্টেম এনালিস্ট ফারজানা আখতার  বলেন, ‘কমিশনের নির্দেশে তাদের একটি টিম স্যোশাল মিডিয়া নিয়মিত মনিটর অব্যাহত রেখেছে। তবে, এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক কোনও কিছু তাদের নজরে আসেনি।’ এই কর্মকর্তার মতে, ‘এ ধরনের কোনও কিছু ঘটার আশঙ্কা ভোটের দিন বা তার আগে-পরে হয়ে থাকে। ফলে এখন তারা যেভাবে মনিটর করছে, ভোটের কাছাকাছি সময় এলে এটা আরও জোরদার হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘স্যোশাল মিডিয়ায় প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে নির্বাচনের শান্তি বিনষ্টের আশঙ্কা থেকেই এটি মনিটরিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যারা স্যোশাল মিডিয়া নিয়মিত মনিটর করে, সরকারের সেসব সংস্থাকে আমরা দায়িত্ব দিয়েছি। পাশাপাশি নিজেরাও মনিটর করছি। তবে, অন্যদের মতো আমাদের সেই ধরনের যন্ত্রপাতি নেই। সরকারের সংস্থাগুলোর উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রপাতি রয়েছে। এগুলো ব্যবহার করে তারা মনিটর করে কোনও সমস্যা পেলে আমাদের জানাবে। যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে গোলযোগ সৃষ্টি বা নির্বাচন ভণ্ডুলের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এক প্রশ্নের সময় নির্বাচন কমিশন সচিব বলেন, ‘গুজব কখন কীভাবে ছড়াবে, সেটা তো বলার সুযোগ নেই। গুজব যেকোনও সময়ে ছড়াতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা নির্বাচনটি সম্পন্ন করতে না পারবো, ততক্ষণই এই ধরনের প্রপাগান্ডার আশঙ্কা আমাদের থেকেই যাবে। এজন্য আমরা ২৪ ঘণ্টাই এটি মনিটর করছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা নির্বাচনকেন্দ্রিক গুজবে ব্যবস্থাও নিয়েছে। সম্প্রতি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মকারীদের অবসরভাতা বাবদ সরকারের বড় অঙ্কের একটি বরাদ্দকে অখ্যাত ওয়েবপোর্টাল ‘পোলিং অফিসারদের মাথা কেনা’ উল্লেখ করে খবর প্রচার করে। পরে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় ওই সংবাদকে গুজব হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে। এছাড়া ফেসবুকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অপপ্রচার ও গুজব রটানোর অভিযোগে গত সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গ্রেফতারকৃতরা সবাই ফেক আইডি ব্যবহার করে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছিল। এসব অপপ্রচার জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি ছড়াতে জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্যও পোস্ট করে আসছিল।- বাংলা ট্রিবিউন